আলোকপাত

গ্রামীণ ব্যাংক :একটি পর্যালোচনা

আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৩, ২২:১৫
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস “গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যত্ : আমার শংকা” শিরোনামে গত ৩১.০৫.১২ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকে যে লেখাটি লিখেছিলেন তা পাঠ করে শঙ্কিত হয়েছিলাম। হদয়স্পর্শী লেখাটি আমার বক্ষবিন্দুতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। এক বছর পর গত ২০ জুন ২০১৩ তাঁর আরো একটি লেখা দৈনিক ইত্তেফাকসহ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বুঝতে পারছি না গ্রামীণ ব্যাংকটি নিয়ে সরকারের কী উদ্দেশ্য এবং ব্যাংকটির পরিণতিই বা কী হবে। এই ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় কেন নেয়া হবে, কেনই বা ভেঙে টুকরো টুকরো করা হবে তার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা সরকারের পক্ষ থেকে এখনও স্পষ্ট নয়। আমরা ধারণা করতে পারি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ বা গ্রামীণ ব্যাংক ভেঙে লুটতরাজের পাঁয়তারা করতে সরকার এ রকম সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। মনে নানা প্রশ্ন জাগে, কেন ড. ইউনূস বিশ্বের কাছে এত জনপ্রিয় হলেন, কেন গ্রামীণ ব্যাংক বিশ্ববাসীর কাছে এত বড় মডেল হলো, কেনই বা নোবেল পুরস্কারের মতো বিশাল একটি অর্জন বাংলাদেশের জন্য বহন করতে গেলেন ড. ইউনূস? ৮৫৬ টাকার ব্যাংক ছেড়ে দিলে ড. ইউনূসের কী এমন ক্ষতি হবে, ক্ষতি হলে ৮৪ লক্ষ গরিব মহিলা শেয়ার মালিকদের হবে, এই দেশের হবে। গ্রামীণ জনপদের ভাগ্য-দুর্ভাগ্য নিয়ে কার এত মাথাব্যথা? যেহেতু সরকার মানেই মাথা, সেহেতু সরকারের একটু ব্যথা থাকা দরকার বলেই মনে করি। যখনই কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাথা তুলে দাঁড়ায় তখনই সরকারের নজর পড়ে, বলা যায় কু-নজর পড়ে। কিন্তু আমরা দেখেছি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই বার বার নিলামে ওঠে। ড. ইউনূসের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল গ্রামীণ ব্যাংক এখন বর্তমান সরকারের (কু)নজরে পড়েছে। আমরা দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে যতটুকু জানি, সরকার দেউলিয়ার পথে। পর্যাপ্ত ব্যাংক ঋণ না পেয়ে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে অথচ সরকার প্রতিনিয়ত ঋণ নিচ্ছে। হয়তো এই দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে গ্রামীণ ব্যাংকটি এখন বড় প্রয়োজন। ৮৫৬ টাকা এখন কত হাজার কোটি টাকা তা তো সকলের জানা। যে অনিয়মটি নিয়ম হয়ে গেছে সেটা হলো ‘দলে থাকা’। আপনি যদি আমার দলে থাকেন আর আমি যদি ক্ষমতায় থাকি, আপনার সাত খুন মাফ। শুধু এই একটি মাত্র নিয়মে ’৭৫ পরবর্তী সরকারগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে। এটা বললাম এ কারণে যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস হয়তো কোনো দলে ভিড়তে পারেননি। তাই তাঁর উপর এত ক্ষোভ আর অপবাদ। সরকারি দলের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিগণ যে ভাষায় তাঁকে আক্রমণ করে কথা বলেন তাতে অবাক হতে হয়। নোবেল পুরস্কার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন যা জাতির জন্য লজ্জাজনক। গ্রামীণ ব্যাংককে সরকারি ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের আদলে নিয়ে এসে এতে সরকারের ৫১ শতাংশ বা তার অধিক মালিকানা রাখা এবং গ্রামীণ ব্যাংককে ভেঙে ১৯টি বা তার অধিক ক্ষুদ্র গ্রামীণ ব্যাংকে রূপান্তরিত করার মতো সিদ্ধান্তগুলো সরকারের জন্য জনবিমুখতার পরিচয় বহন করে। সরকারের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ড. ইউনূস বলেছেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংককে গ্রামীণ ব্যাংকের আইন মত চলতে দিন। কমিশনের প্রস্তাব অনুসারে আইন পরিবর্তন করলে এটা একটা জাতীয় বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসবে। কমিশন যে ক’টি বিকল্প প্রস্তাব করেছে তার প্রতিটিই ব্যাংকের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।’ আমরা বিশ্বাস করতে চাই নিশ্চয়ই সরকার এই বিপর্যয় ডেকে আনবে না। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সকলকে আহ্বান জানিয়েছিলেন সরকারকে পরামর্শ দিতে। সরকারের কিসের এত ঠেকা পরামর্শ গ্রহণ করার? তবু যদি দয়া হয় (আমরা ভোটার তো!) সেই আস্থা নিয়ে বলতে চাই, সরকার যেন গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে কোনও হস্তক্ষেপ না করে। যেহেতু গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় সরকারের তেমন পৃষ্ঠপোষকতা বা সহায়তা নেই সেহেতু ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই দায়িত্ব দিতে বলি। তিনি কীভাবে ব্যাংকটি পরিচালনা করবেন (নিজে সংশ্লি¬ষ্ট থেকেও করতে পারেন আবার না থেকেও পারেন) সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তাতে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে বলেই বিশ্বাস। গ্রামীণ ব্যাংক খেটে খাওয়া মানুষের মাটির ব্যাংক — এটা ভাঙলে গচ্ছিত অর্থ উধাও হয়ে যাবে সন্দেহ নেই। লেখক: কবি ও শিশু সাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন