খবরের কাগজের প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে একটি খবর। ‘মাছে ভাতে বাঙালির মাছে ফরমালিন আর ভাতের চালে প্রাণঘাতী ক্যাডমিয়াম!’ বাঙালি মাছ ভাত খেয়েই বাঁচে। সে জায়গায়ও বিষের ছড়াছড়ি। সে খাদ্যও যদি অনিরাপদ হয়ে পড়ে তাহলে দেশের মানুষ কী খাবে? এদেশে নিরাপদ খাবার আদৌ কী আছে? কেবল মাছ ভাত নয় সব খাবারইতো ভেজালে ভরা। তবে মন্ত্রিসভা নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন করায় এ নিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে। আশাজাগানিয়া এ আইনের প্রয়োগ হলে দেশে ভেজাল খাদ্য কমে যাবে। পিওর ফুড অর্ডিনেন্স নামে ১৯৫৯ সালে একটি আইন ছিল যা রহিত করে যুগোপযোগী করে এ আইন করা হচ্ছে। একটি স্বতন্ত্র সংস্থার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যার নাম দেয়া হয়েছে ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’। খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক উপকরণ পাওয়া গেলে ৫ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ২ বছর থেকে ৭ বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি গুরুতর অপরাধ বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডেরও ব্যবস্থা রয়েছে এই আইনে। আরও আগে এমন আইন হওয়া দরকার ছিলো। কেবল আইন প্রণয়ন করলেই হবে না এর যথাযথ প্রয়োগও থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার সুরক্ষা করার দায় রয়েছে সরকারের। আর এ দায় থেকে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির ব্যবস্থা সরকারকে অবশ্যই করতে হবে।
ভেজাল খেয়ে গোটা জাতি আজ রোগাক্রান্ত। অথচ অতি সহজেই এদেশকে ভেজালমুক্ত করা সম্ভব। সরকারের সদিচ্ছা নেই তাই দেশ ভেজাল মুক্ত হচ্ছে না। ভেজাল রোধে কোন সরকারই সচেষ্ট নয়। তাই ভেজাল খাদ্যে ভরে গেছে দেশ। আমরা যা খাচ্ছি তার অধিকাংশই ভেজালে ভরা। খাদ্যে যে ভেজাল দেয়া হয় আর ভেজাল যে রোজই খেয়ে যাচ্ছি তা আজ অবুঝ শিশুরাও অবগত। শিক্ষকদের কাছে শিখে তারা ভেজাল সচেতন হলেও কিই বা করবার আছে তাদের। সেদিন রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রের প্রশ্ন ছিলো এমন- “বাবা কচুতে মাছি, আমে নেই কেন”? বাবার কাছে প্রশ্নটা করলেও উত্তরটা কিন্তু তার ঠিকই জানা। স্কুল ছুটির পর ফুটপাথ ধরে রিক্সার সন্ধানে ছেলে হেঁটে যাচ্ছে বাবার সাথে। পথে ফেরিওয়ালাদের আম আর সবজির নানা দোকান। লোভনীয় হলুদ আমে মাছি ভন্ ভন্ করবার কথা কিন্তু কোথাও মাছি নেই। আজব ব্যাপার হলো পাশের মহিলা সবজি বিক্রেতার কচু শাকে মাছির দৌড়-ঝাঁপ শুরু করেছে। তাই দেখে ঐ শিক্ষার্থী বাবাকে এমন প্রশ্ন করে বসে। সে জানে বিষাক্ত ফর্মালিন আর কার্বাইডের কারণে মাছি নেই আমে। পত্র-পত্রিকা আর টিভি দেখেও সে এসব জেনেছে। তাই পিতার কাছে ছেলের এমন রহস্যজনক প্রশ্ন। আর ঐ শিক্ষার্থীর পিতা ছেলের এমন প্রশ্নে জবাব দিতেও বিব্রত।
ভাবি এসব কি হচ্ছে দেশে। সব শেষ হয়ে যাচ্ছে নাতো? ষষ্ঠ পড়ুয়া ছেলেটার মাথার চুলে চোখ পড়তেই চোখ যেন ছানা বড়া। সাদা চুলে আটকে গেল চোখ। অসংখ্য চুলে পাক ধরেছে। ভাগ্নেটার চোখে মোটা পাওয়ারওয়ালা চশমা। বিছানায় কাতরাচ্ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত চাচা। খাবারে ভেজালের জন্যই এমনটা হচ্ছে। ভেজাল নেই কোথায়? চিকিত্সায় ভেজাল; কথায় ভেজাল; রাজনীতিতে ভেজাল। কোথাও যেন এক দণ্ড শান্তি নেই। এমন হচ্ছে কেন? আমরা খাবার খাচ্ছি; না খাচ্ছি বিষ! চারদিকে ফরমালিনের জয়-জয়কার। মাছে, আমে, জামে, কাঁঠাল, তরকারিতে কোথায় নেই এই জীবন হন্তারক ফরমালিন। তেলে ভেজাল, চালে এমনকি নুনেও ভেজাল। কেউ কেউ তো বলেনই বিষেও নাকি ভেজাল। তাই যা হবার নয় তাই হচ্ছে। কিডনি নষ্ট হচ্ছে; হচ্ছে হাই প্রেসার; ক্যান্সার আর স্ট্রোকে অহরহ মরছে মানুষ। আমাদের অতি আদুরে সন্তানেরা অকালে ঝরে যাচ্ছে এসব অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে। প্রতিটি খাবারে মেশানো হচ্ছে বিষ। আর সেই বিষ খেয়ে আমরা আর বেঁচে নেই। জীবিত থেকেও লাশ হয়ে গেছি। এ যেন জিন্দা লাশ। রোগে-শোকে কয়েকটা দিন বেঁচে থাকা এই আর কি। প্রতিনিয়তইতো বিষ খাচ্ছি।
ভেজাল ঠেকাতেই বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ বিভাগটির কার্যক্রম আশান্বিত হবার মতো নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ভেজাল ও অননুমোদিত খাদ্যসামগ্রী উত্পাদন ও বিক্রির দায়ে বিএসটিআই মাঝে-মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। আদায় করে লাখ লাখ টাকা জরিমানাও। কিন্তু তাদের এ কর্মকাণ্ড অনেকটাই লোক দেখানোর মত। ভেজালের দায়ে অভিযুক্ত বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই জরিমানা পরিশোধের পর সবাইকে ম্যানেজ করে আবারও সেই একই অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা এর জন্য বিএসটিআইকেই দায়ী বলে মনে করেন। নিধিরাম সর্দারের মতো শুধু মামলা দায়ের ও জরিমানা আদায়ের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা। ফলে ভেজালের কারবারীরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাই মাছে মিলছে বিষাক্ত ফরমালিন, ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফেন, প্রোফাইল প্যারা টিটিনিয়াম (পিপিটি) পাউডার, বিস্কুটসহ বেকারি দ্রব্যে রয়েছে বিষ সমতুল্য রং আর মুড়িতে মেশানো হচ্ছে কৃষিকাজে ব্যবহূত ইউরিয়া সার। এর বাইরেও রয়েছে নানা রাসায়নিক সংমিশ্রণের কারসাজি।
সভ্য সমাজে খাদ্য ভেজালের বিষয়টি একেবারে অকল্পনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে এটি নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, কোথায় ভেজাল নেই সেটি নিয়েই এখন গবেষণা করা দরকার। অনেকে ভেজাল খাদ্যের ভয়ে মানসিকভাবে আতঙ্কগ্রস্ত। জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও চলছে ভেজাল। আগেই বলেছি, কোনো সভ্য সমাজে খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি কল্পনাও করা যায় না। আমাদের দেশে ভেজালের যে সর্বগ্রাসী আগ্রাসন তাতে মনে করা যেতেই পারে এ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা সভ্যতার মাপকাঠিতে এদিক থেকে জংলী যুগের চেয়েও পিছিয়ে আছি। কারণ আর যাই হোক জংলী যুগের অধিবাসীরাও ভেজালের মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হওয়ার কথা ভাবতেও পারত না। প্রশ্ন ওঠে দেশে সরকার, পুলিশ প্রশাসন, আইন-আদালত থাকা সত্ত্বেও ভেজালের দৌরাত্ম্য কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না। কেন এই ভেজালকারীদের দাপট? খাদ্যে ভেজালের অপরাধে দেশে কঠিন শাস্তিযোগ্য আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই। এ অবস্থাই ভেজালকারীদের উত্সাহিত করছে। আর এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ভেজালের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আমজনতা, প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট বিভাগের সবাই মিলে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা প্রদর্শনের কোনই সুযোগ নেই। এ অবস্থায় সর্বতোভাবে তত্পর হতে হবে বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। সর্বোপরি গণমাধ্যমসহ ব্যাপক জনসচেতনতাও প্রত্যাশিত। সরকার দ্রুত ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ প্রণয়ন এবং এর প্রয়োগে সচেষ্ট হলে তবেই ভেজাল থেকে মুক্তি মিলবে। আর সেই দিনের প্রত্যাশায় রইলাম আমরা।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা
