৩ জুলাই ভোর— ১৭৫৭। রাজধানী মুর্শিদাবাদের জাফরাগঞ্জ প্রাসাদ। নাঙা তলোয়ার হাতে উপস্থিত মহান নবাব আলিবর্দি খাঁর ভৃত্য মহম্মদী বেগ। ঘাতকের মৌন অনুমতিতে নফল নামাজরত তরুণ নবাব সিরাজ। বহির্ভাগে বেজে উঠল বাংলার বিভীষণ তিন দিন আগে ক্লাইভের হাত ধরে মসনদে আসীন মীরজাফরের পুত্র মীরনের বাঁশি। নামাজের মধ্যেই নিভে গেল বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন দীপশিখা। প্রাসাদ উদ্যানের পক্ষীকুল আর্তনাদের স্বরে ঘৃণা ছড়াতে ছড়াতে ডানা ঝাপটায়ে উড়ে গেল দূর-দূরান্তে।
শাণিত তলোয়ার হাতে মহম্মদী বেগকে দেখে আঁতকে উঠেন নবাব। ‘মহম্মদী বেগ তুমি! ... তা আমাকে সামান্য গরীবের মতোও বেঁচে থাকতে দেবে না?’ গলাটা খানিক পরিষ্কার করে ভয়ার্তকণ্ঠে মহম্মদী বেগের উত্তর— ‘না, তারা তা দেবে না।’ নবাবের স্বগতোক্তি—‘ তা হোসেনকুলি খাঁর মৃত্যুর বদলা হোক।’
পাপিষ্ঠ হোসেনকুলি খাঁ। পুণ্যের আঁধার মাতৃকলঙ্কের মহাপাতক রাজকর্মচারী হোসেনকুলি। জগতের একটি ঘটনাকেই জীবনের পাপকার্য বলে উল্লেখ করায় তরুণ নবাবের প্রকৃতি সহজেই অনুমেয়। সন্তান আপন জননীর পবিত্রতাহরণকারীর খুনের আদেশকেই মনে করল মহাপাপ। হায়! দেশীয় ও ইংরেজ বেনিয়াদের ইতিহাস লেখকগণ, সিরাজের প্রকৃতিকে অত্যাচারী নিষ্ঠুর শয়তানের অবতার বর্ণনা করতে একটি বারের জন্যও তোমরা হলে না বিবেক তাড়িত।
ক্লাইভ মীরজাফর জগেশঠদের দেমাকে কি খুব বেধেছিল তেইশ বছরের নবাবকে কুর্নিশ করতে? এই ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তকারীরাই না পঞ্চমুখে বলে বেড়াতেন আলীবর্দি খাঁ সকল শ্রেণি-সম্প্রদায়ের প্রজাহিতৈষী মহান শাসক। মহীয়সী সরফ-উন-নিসা যাঁর একমাত্র বেগম। যিনি ইংরেজ বেনিয়াসহ সকলেরই মা। হেরেমহীন যাঁদের জীবন। অথচ এঁরাই নবাবের একপাতার জীবনের ললাটে এঁকে দিলে জগতের সমস্ত কলঙ্ক আর নিন্দার তিলক।
২৩ জুন— পলাশির প্রান্তর। কী ঘটেছিল সেদিন পলাশিতে? বাংলার আকাশে সেদিন জমেছিল কালো কালো মেঘ। উল্লাসে ডানা মেলেছিল ক্লাইভ আর মীরজাফরদের মতো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শনির শকুন। শুরু হয়েছিল গোলামির শৃঙ্খল। খুলে গিয়েছিল একটি ক্রূর জাতির প্রায় একটি মহাদেশ পদানত করবার দ্বার। সূচিত হয়েছিল জাতীয় জাগরণের দুশো বছরের লড়াই।
ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের বিজয়ের চেয়ে লড়াই করে পরাজয়বরণ অশেষ গৌরবের। তবু আরেকটি লড়াইয়ের জন্য সিরাজকে চিরকালের অভিনন্দন। মায়ের কলঙ্কলেপনকারী একমাত্র হোসেনকুলি খাঁ-ই নয়; জগতের সকল হোসেনকুলিও যদি তাঁর হাতে খুন হয় তবু তিনি অভিবাদনযোগ্য। সিরাজ পৃথিবীর সর্বকালের সকল মায়ের যোগ্য সন্তান। মাকে মহিমাময় করে রাখবার চেয়ে এ জগতে সন্তানের জন্য আর কি বড়! সিরাজ জীবনের সর্বক্ষণের অনুগামী লুত্ফা— তরুণী বেগম লুত্ফাউন্নেছা। ২৩ জুন থেকে মসনদহারা পথহারা দীপ্তিহীন নবাবের জীবনের সংকটময় দশ দিন। শিশুকন্যাটিও যেখানে ভ্রূক্ষেপহীন। সংসারের কঠিন পরীক্ষায় এভাবেই আপন স্বরূপে আবির্ভূত হয় নারী।
বাঙালির স্মৃতির পাতা থেকে কিছুতেই মুছে যেতে চায় না ক্লাইভ মীরজাফর মীরনদের অভিশপ্ত মৃত্যুর বীভত্সতা। নিজ নিজ স্বার্থে স্রষ্টার আসনকাঁপা পাপকে আড়াল করতে নরপিশাচদের কল্পিত সব কাহিনী। নিবিড় পঠনে এই ঘৃণ্য ইতিহাসেরই দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসেন তারুণ্যদীপ্ত এক উজ্জ্বল মুখ— নবাব সিরাজউদ্দৌলা। দুই পাশে দুই বীর সেনাপতি মীরমদন আর মোহনলাল— বাঙালি মানসের গৌরবের প্রত্যাবর্তন।
লেখক : কবি
