যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করিবার যন্ত্রখানি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জন্য। জীবাণুমুক্ত করিবার সেই কোটি টাকার অটোক্লেভ যন্ত্র পুরোপুরি লোপাট করিয়া দিয়াছে দরদাতা প্রতিষ্ঠানটি। যন্ত্রের পরিবর্তে তাহারা শূন্য বাক্স পাঠাইয়া দিয়াছে। তছরূপ করিতে চেষ্টা করিয়াছে কোটিখানেক টাকা মাত্র। কোটি টাকার দুর্নীতি ‘মাত্র’ই বটে! আমরা ইহাতে লজ্জা পাইব কি? আমাদের অর্থমন্ত্রীই তো মাত্র দশ মাস পূর্বে হলমার্কের বিপুল অর্থ কেলেঙ্কারি সম্পর্কে বলিয়াছিলেন—চার হাজার কোটি টাকা? এ আর এমন কি অর্থ?
অর্থপূর্ণ ইঙ্গিতই দিয়াছিলেন অর্থমন্ত্রী সেইসময়। তিনি ভালো করিয়াই জানেন, দেশের লুটেরা ব্যবস্থাপনায় অর্থ-সম্পদ লুটপাটের অভিনব উদ্ভাবনই হইল আসল প্রতিভার পরিচায়ক। ঐসকল আবিষ্কর্তাই প্রকৃত চৌকষ ব্যক্তি। শাস্ত্রও স্বাক্ষ্য দেয়—চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি...। ধরা না পড়িয়া যদি সম্ভব হয় অর্থ তছরূপের, তবে তুমিই বীর। তুমিই তখন সম্রাট, কারণ শাস্ত্র ইহাও বলে—এই বসুন্ধরা বীরভোগ্যাদের।
এই লুটেরা মানসিকতার পেছনে প্রভাবক হিসাবে যাহা যাহা রহিয়াছে, তাহা আমাদের তস্করবৃত্তি, চৌর্যবৃত্তিতে উত্সাহিত করে নিরন্তর। যেহেতু লুটেরা ব্যবস্থাপনা আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রেই অশনি জীবাণু হইয়া প্রবলভাবে পরাক্রমশীল, সুতরাং দুর্নীতির সহিত যুক্ত থাকে পুরো ব্যবস্থাপনার সিংহঅংশ। সিস্টেমের যাহা যাহা ‘নিয়ম’ রহিয়াছে, তাহার ভিতর হইতে ‘ছিদ্র’ বাহির করিয়া দুর্নীতি-অনিয়ম করিবার ষোলকলায় যুক্ত থাকে প্রশাসনের শীর্ষমস্তক হইতে পদাঙ্গুলি পর্যন্ত। তাহা না হইলে সম্ভব হয় না কাল্পনিক পুষ্করিণী কাটিবার দরপত্র একবার এবং পরবর্তীতে তাহা ভরাটের জন্য আরেকবার দরপত্র আদায় করিবার মতো আদর্শ লুটপাটের ব্যবস্থাখানি বাস্তবের জমিনে চাষ করা।
তাহাছাড়া সিস্টেমের ‘বজ্র আঁঁটুনি’ ব্যবস্থাপনার ভিতর হইতেই ‘ফস্কা গেরো’ আবিষ্কার করিতে আমরা ‘সদাজাগ্রত’ থাকি। এবং আবিষ্কারের পর তাহার ‘সদ্ব্যবহার’ করিতে আমাদের ‘ধূর্ত’ ধীশক্তির তুলনা এই জগতে সম্ভবত আর কোথাও পাওয়া যাইবে না। সুতরাং জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যন্ত্রের পরিবর্তে শূন্য বাক্স সরবরাহের মতো ঘটনা ঘটিতেই থাকিবে আমাদের লুটেরা সিস্টেমের ভিতরে। সেই সিস্টেমের অংশ হিসাবেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হইবে। পরিস্থিতি বুঝিয়া সেই কমিটি পক্ষপাতদুষ্ট কিংবা ‘সুযোগের অভাবে সত্’ জাতীয় অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন প্রদান করিবে। এই সকল বিষয়ের কিয়দংশ সংবাদমাধ্যমে হয়তো প্রকাশিত হইবে, কিংবা বাসি সংবাদ হিসাবে বাদ পড়িবে—কিন্তু আমাদের লুটেরা মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হইবে না।
ইহার পাশাপাশি আরো এক ধরনের দৃশ্য দেখিয়া-শুনিয়া আমাদের ‘সাধারণ বোধ’ খেপিয়া যায় বটে। কয়েক বত্সর পূর্বে পত্রিকান্তরে আমরা দেখিয়াছি কয়েক হাজার টাকার কৃষিঋণ পরিশোধ করিতে না পারিবার অপরাধে অশীতিপর এক বৃদ্ধকে কোমরে দড়ি পরাইয়া লইয়া যাইবার দৃশ্য। পটুয়াখালীর এক কৃষক কৃষিঋণ খেলাপী হইবার কারণে কোমরে দড়ি উঠিবার ভয়ে গলায় দড়ি দিয়া আত্মহত্যাই করিয়া বসেন। তাহাদের খেলাপী টাকার পরিমাণ হাজার অঙ্কের ঊর্ধ্বে লাখে উঠে নাই। ইহা বোধ হয় ছিঁচকে খেলাপী, তাই ছিঁচকে চোরের মতোই তাহারা ‘মহাপাতক’। সুতরাং আমাদের সিস্টেম এইসকল নিরীহ কৃষক গরিবগুর্বোদের অনতিক্রম্য এই অপরাধের সাজা প্রদান করিতে সিদ্ধহস্ত হইবে—ইহাতে অবাক হইবার কী আছে? অথচ পুকুরচুরি করিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘বীর’ হওয়া যায়। ‘ক্ষমতাবান’রা নানা প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি-অনিয়মকে তাহাদের স্বভাবসিদ্ধ নিয়মে পরিণত করিয়া কালো অর্থসম্পদের পাহাড় বিনির্মাণ করিতে ব্যগ্র ও ব্যস্ত। আর লুটেরা রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা ব্যস্ত থাকে তাহাদের কালো অর্থ সাদা করিবার ‘নিয়ম ও সুযোগ’ বহাল রাখিতে। সুতরাং কাহারো ‘সম্পদশালী’ হইবার বাসনা থাকিলে এইসকল অন্যায় অনিয়মের পথই তাহার সম্মুখে সর্বাগ্রে উদ্ভাসিত হয়। আর তাহা পরিহার করিবার সদিচ্ছা কাহারো ভিতরে জাগিয়া থাকিলে তাহা নির্বাপিত হইতে খুব বেশি সময় লাগে না। সেই ‘নির্বাপিত সুনীতি’র আমলা, ব্যবসায়ী, নূতন উদ্যোক্তা হইতে শুরু করিয়া সরকারি বেসরকারি চাকুরিজীবী ‘ক্ষমতাবানেরা’ই এখন সিস্টেমের রক্ষক।
ইহা গভীর পরিতাপের। এই ‘লুটেরা মানসিকতা’ নামের ভয়ঙ্কর সংক্রামক জীবাণুকে প্রতিহত করা ব্যতীত আর কোনো পথ নাই। অন্যথায় জাতি হিসাবে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নপূরণ বিলম্বিত হইবে শুধু।
