ব্রিটেনের কাছ থেকে আমেরিকার স্বাধীনতার লড়াই, যা আমেরিকান বিপ্লব নামে পরিচিত, শুরু হয় ব্রিটিশ বাহিনী ও উপনিবেশের স্থানীয় সশস্ত্র বাসিন্দাদের মধ্যে একটি ছোট খণ্ডযুদ্ধের মাধ্যমে। এই খণ্ডযুদ্ধটি হয় ১৭৭৫ সালের ১৯ এপ্রিলে।
উপনিবেশের বিপ্লবী স্থানীয় বাসিন্দারা পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে যেসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করেছিল তাদের কাছ থেকে সেসব জব্দ করতে ব্রিটিশরা ম্যাসাচুসেটেসর বস্টন থেকে যাত্রা শুরু করে। পথিমধ্যে লেক্সিংটনে তারা একদল ‘মিনিটম্যানের’ মুখোমুখি হয়। এদেরকে ‘মিনিটম্যান’ বলা হতো, কারণ তারা এক মিনিটের মধ্যে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে পারতো। মিনিটম্যানরা নীরবে প্রতিবাদ জানাতে চেয়েছিল এবং তাদের নেতার নির্দেশ ছিল যে, কেউ তাদেরকে প্রথমে আক্রমণ না করলে তারা যেন গুলি না চালায়। ব্রিটিশরা তাদেরকে ছত্রভঙ্গ হওয়ার জন্য বলে এবং তারা তা মেনে নেয়। যখন তারা সরে যাচ্ছিল তখন কেউ একজন গুলি ছোঁড়ে। এ সময় ব্রিটিশ বাহিনী বন্দুক ও ব্যায়োনেট দিয়ে মিনিটম্যানদের ওপর হামলা চালায়।
রাস্তার অন্যান্য স্থানেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এবং এর ভেতর দিয়েই উজ্জ্বল লাল উর্দি পরা ব্রিটিশ সৈন্যরা বস্টনে ফিরে আসে। ২৫০ জনের বেশি ‘লাল উর্দিধারী’ হতাহত হয়, আর আমেরিকানরা হারায় ৯৩ মিনিটম্যানকে।
বস্টনের আশপাশে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে থাকে। এর মধ্যে উপনিবেশের প্রতিনিধিরা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে ফিলাডেলফিয়ায় ছুটে যান। অধিকাংশই ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। তারা উপনিবেশের মিলিশিয়াদেরকে কন্টিনেন্টাল আর্মিতে রূপান্তর করতে সম্মত হন এবং ভার্জিনিয়ার জর্জ ওয়াশিংটনকে কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে মনোনীত করেন। একই সময় দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস একটি শান্তি প্রস্তাবনা গ্রহণ করে রাজা তৃতীয় জর্জকে আরো সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানান। কিন্তু রাজা এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে ২৩ আগস্ট ঘোষণা করেন যে, আমেরিকান উপনিবেশগুলো বিদ্রোহে লিপ্ত।
পরবর্তী মাসগুলোতে স্বাধীনতার ডাক আরো জোরদার হলো। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক টমাস পেইন বিচ্ছিন্নতাবাদের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে সাহায্য করেন। কমন সেন্স নামের একটি পুস্তিকাতে তিনি উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজতন্ত্রের ধারণার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি আমেরিকার জন্য দু’টি বিকল্প উপস্থাপন করেন: স্বৈরাচারী রাজা ও প্রাচীন শাসন ব্যবস্থার অধীনে অব্যাহত অধস্তনতা, অথবা স্বাধীন, স্বনির্ভর প্রজাতন্ত্রে স্বাধীনতা ও সুখ উপভোগ করা।
দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস ভার্জিনিয়ার টমাস জেফারসনের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। এর ওপর দায়িত্ব বর্তায় রাজার বিরুদ্ধে উপনিবেশগুলোর ক্ষোভ এবং আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করে একটি নথি তৈরি করা। স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই। সেই থেকে ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা কেবল একটি নতুন জাতির জন্মের ঘোষণায় নয়। মানুষের স্বাধীনতার দর্শনও এর দ্বারা সূচিত হয়, যা সারাবিশ্বে একটি গতিশীল শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ফরাসি ও ব্রিটিশ রাজনৈতিক ধারণা থেকে, বিশেষ করে জন লকের সেকেন্ড ট্রিটিজ অন গভর্নমেন্ট থেকে এই দর্শন এসেছে, যাতে বলা হয় রাজনৈতিক অধিকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকার এবং সর্বজনীন।
স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই আমেরিকানরা স্বাধীন হয়ে যায়নি। ব্রিটিশ বাহিনী কন্টিনেন্টাল বাহিনীকে নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করে। তারা পেনসিলভ্যানিয়ার ব্রান্ডিউইনে আমেরিকানদের পরাজিত করে। তারা ফিলাডেলফিয়া দখল করে নেয় এবং কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসকে পালাতে বাধ্য করে। আমেরিকান বাহিনী নিউ ইয়র্কের সারাটোগা এবং নিউ জার্সির ট্রেন্টন ও প্রিন্সটনে বিজয়ী হয়। তারপরও জর্জ ওয়াশিংটন অতি প্রয়োজনীয় লোকবল ও রসদ সংগ্রহে ক্রমাগত লড়াই করে যান।
বড় ধরনের সাহায্য আসে ১৭৭৮ সালে যখন ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। ফরাসি সরকার সমর্থন দেয় ভূ-রাজনৈতিক কারণে, আদর্শগত কারণে নয়। ফ্রান্স তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটেনের শক্তি দুর্বল করার জন্য এই সমর্থন প্রদান করে।
ম্যাসাচুসেটেসর লেক্সিংটনে শুরু হওয়া লড়াই কন্টিনেন্টাল জুড়ে আট বছর ধরে চলে। যুদ্ধ সংঘটিত হয় উত্তরে কানাডার মন্ট্রিল থেকে শুরু করে দক্ষিণে জর্জিয়ার সাভানাহ পর্যন্ত। ১৭৮১ সালে ভার্জিনিয়ার ইয়র্কটাউনে বিপুল সংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য আত্মসমর্থন করে। কিন্তু এরপরও আরো দুই বছর ধরে যুদ্ধ চলে। অবশেষে ১৭৮৩ সালের ১৫ এপ্রিল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আমেরিকান বিপ্লবের তাত্পর্য ছড়িয়ে গেছে উত্তর আমেরিকা ছেড়ে আরো দূরে। এটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ইউরোপের রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের এবং সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বে প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা শক্তিশালী হয়েছে। টডেস কসিস্কো, ফ্রেডরিক ভন স্টেউবেন এবং মার্কুইস ডি লাফায়েটসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিকে এই বিপ্লব কাছে টেনেছে, যারা এতে অংশগ্রহণ করেছেন এবং আশা করেছেন যে, এই উদারনৈতিক ধারণা নিজ নিজ দেশে বাস্তবায়ন করবেন।
প্যারিস চুক্তি ১৩টি সাবেক আমেরিকান উপনিবেশের, বর্তমানে অঙ্গরাজ্যের, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তির স্বীকৃতি দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণার ২৩৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে প্রাপ্ত
