ভেজালের আগ্রাসন ও নিরাপদ খাদ্য আইন

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৩, ২০:৫৯
খাদ্যে ভেজালের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে গত সোমবার নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর নীতিগত অনুমোদন দিয়াছে মন্ত্রিসভা। ১৯৫৯ সালের ‘দ্য পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স’ রহিত করিয়া প্রণীত এই আইনে খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশানোর অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৪ বত্সরের জেল ও ১০ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হইয়াছে। সেই সাথে রহিয়াছে ২০ ধরনের অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে সাজা এবং জরিমানার বিধানও। শুধু তাহাই নহে, বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত এই আইনের মূল লক্ষ্য হইল, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার আওতায় পরিচালিত খাদ্যে ভেজাল রোধ ও নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত সকল কার্যক্রম একই ছাতার নিচে আনিয়া যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ইহার জন্য ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য প্রতিষ্ঠান’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন এবং খাদ্যমন্ত্রীকে প্রধান করিয়া ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠনেরও বিধান রাখা হইয়াছে প্রস্তাবিত আইনে। আপাতদৃষ্টে আইনটি যে সুচিন্তিত, সময়োপযোগী এবং যথেষ্ট কঠোর তাহাতে সন্দেহ নাই। মৌসুমী ফল, শাকসবজি, মাছ-মাংস ও দুধ হইতে শুরু করিয়া বেশিরভাগ খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও প্রাণঘাতী রাসায়নিক মিশানোর ঘটনায় জনগণ যখন আতঙ্কে দিশাহারা এবং তাহা নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যর্থতা ও সমন্বয়হীনতা যখন প্রকটভাবে দৃশ্যমান, ঠিক সেই মুহূর্তে সরকারের এই উদ্যোগ যে কিছুটা হইলেও স্বস্তির বার্তাবহ তাহা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন এবং ওজনদার কমিটি গঠন করিয়া যে এই ধরনের আগ্রাসন থামানো সম্ভব নহে—তাহার উদাহরণও ভূরি ভূরি। মূল সমস্যা যে শুধু আইন বা আইনের অভাবজনিত নহে—তাহা বুঝিবার জন্য বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন নাই। খাদ্য লইয়া যে প্রাণঘাতী তত্পরতা চলিতেছে তাহার লাগাম টানিয়া ধরিবার জন্য প্রচলিত বিভিন্ন আইনের পাশাপাশি আছে হাইকোর্টের একাধিক রুলও। হাইকোর্ট ২০১২ সালের ১৫ জুলাই খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়াছিলেন। ইহার আগে, ২০১০ সালের ১৬ আগষ্ট, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম অব্যাহত রাখারও নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। কঠোর আইনের ভালো দিক অবশ্যই আছে। তবে মুদ্রার অন্য পিঠটিও উপেক্ষণীয় নহে। সরিষার মধ্যেই যদি ভূত থাকে সেই ভূত তাড়াইবে কে? ভেজালবিরোধী সরকারি কার্যক্রমে নানা দুর্বলতা ও ব্যাপক সমন্বয়হীনতা সত্ত্বেও ভ্রাম্যমাণ আদালতও বসিয়া নাই। তাহাদের অভিযানের যেইটুকু খবর সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়, তাহা এককথায় লোমহর্ষক। যেইখানেই হাত দেওয়া হইতেছে সেইখানেই মেয়াদোত্তীর্ণ, ভেজাল ও বিপজ্জনক রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্যপণ্যের ছড়াছড়ি। রাজধানীর প্রসিদ্ধ চেইনশপ হইতে শুরু করিয়া বড়ো বড়ো বাজার অবধি সর্বত্রই একই চিত্র। এমনকী সমপ্রতি ঢাকডোল পিটাইয়া যেইসব বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হইয়াছিল তাহাদের অবস্থাও ভিন্ন নহে। মাঝেমধ্যেই ফরমালিন মিশ্রিত শত শত কেজি মৌসমী ও অন্যান্য ফল ধ্বংসও করা হইতেছে, আদায় করা হইতেছে জরিমানা। কিন্তু এই আত্মঘাতী প্রবণতা থামিবার কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। বরং দেশের সর্বত্রই প্রায় প্রকাশ্যেই চলিতেছে ভেজাল ও বিপজ্জনক রাসায়নিক মিশ্রণের এই সর্বগ্রাসী তত্পরতা। আগে আড়তে মিশানো হইত, এখন আমের বাগান কিংবা কলার খামার হইতেই শুরু হয় এই প্রক্রিয়া। সেই সাথে লাগামহীনভাবে বাড়িয়া চলিয়াছে ফরমালিনের আমদানি। সঙ্গত কারণেই এই প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, ভোক্তাসাধারণ ইহা মুখ বুঁজিয়া সহ্য করিতেছেন কেন? কেন তাহারা জানিয়া-শুনিয়া বিষযুক্ত ফল খাইতেছেন? ইহার উত্তরে কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, মৌসুমী ফল না খাইয়া উপায়ই বা কী? প্রশ্ন যেইখানে বাঁচা-মরার সেইখানে এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। নাগরিক হিসাবে ভোক্তাসাধারণেরও অবশ্যপালনীয় কিছু দায়িত্ব রহিয়াছে। প্রশাসন যখন যথাযথভাবে তাহাদের দায়িত্ব পালন করে না, ঠিকমতো প্রয়োগ হয় না আইনের এবং এই সুযোগকে কাজে লাগাইয়া বিবেকহীন কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন জনজীবন বিপন্ন করিয়া তোলে তখন অবশ্যই জনগণকে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে বৈকি। অহিংস পন্থায় ঐক্যবদ্ধভাবে বিষযুক্ত ফল ও ভেজাল খাদ্যসামগ্রী বর্জনই হইতে পারে ইহার প্রথম পদক্ষেপ। আমরা প্রথমাবধি সেই আহ্বানই জানাইয়া আসিতেছি। জনগণ সচেতন, সক্রিয় ও সোচ্চার না হইলে আখেরে কোনো আইনই কাজে আসিবে বলিয়া মনে হয় না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন