মিসরে আবার বেহাত হইল জনগণের বিদ্রোহ

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৩, ২০:৫৯
আগেরবারের মত এইবারও গণতন্ত্রপন্থি মিসরীয়দের অগণতান্ত্রিক শাসনবিরোধী বিদ্রোহটি বেহাত হইয়া গেল। স্বৈরাচারী হুসনি মোবারকের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণতান্ত্রিক বিদ্রোহটি হাতাইয়া লইয়াছিল তাহারা, যাহারা নিজেদের গণতন্ত্রের অভিভাবক বলিয়া মনে করেন। এইবার ধর্মীয় উগ্রবাদী মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসির সরকারের বিরুদ্ধে গড়িয়া তোলা বিদ্রোহটি গণতন্ত্রের তথাকথিত অভিভাবকশক্তি গলাধঃকরণ করিয়া ফেলিয়াছে। একেবারে বলিয়া-কহিয়া সকল পক্ষের চক্ষের সামনে দিয়া মিসরের ক্ষমতা হস্তগত করিয়া লইয়াছে তাহারা। সরকারের তরফ হইতে একের পর এক অগণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিকতা বিরোধী কার্যক্রম গ্রহণ, ধর্মীয় উগ্রবাদভিত্তিক দলীয় মতাদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্য দ্বারা তাড়িত হইয়া রাষ্ট্রক্ষমতার নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহারের পরিণতিতে ক্ষমতাসীন ধর্মীয় উগ্রবাদীদের সহিত গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির বিভেদ গুরুতর হইতে শুরু করে গত নভেম্বর মাস হইতে। এই বিভেদ গত কয়েকদিনে চরমে উঠে। সুপ্রাচীন সভ্যতার অধিকারী মিসরে গণতন্ত্র, উদারনীতিকতা আসিবে, নাকি ধর্মীয় উগ্রবাদ স্থায়ী হইয়া যাইবে তাহার একটা রাজনৈতিক ফয়সালা হইয়া যাইবার সম্ভাবনা দেখা দিয়াছিল এইবার। কিন্তু অভিভাবকশক্তির হস্তক্ষেপে সেই সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটিল। গত কয়েকদিন ধরিয়াই ওই শক্তি বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ‘‘নিশ্চুপ থাকা সম্ভব নহে’’ বলিয়া জানাইয়া আসিতেছিল। বিদ্যমান পরিস্থিতির দিকে কেবলমাত্র ‘‘চাহিয়া’’ না থাকার কথাও বলা হইতেছিল। আগেরবারের অভিজ্ঞতা হইতে মিসরীয় গণতন্ত্রীরা তেমন কিছু শিক্ষা লইয়াছে বলিয়া মনে হয় না। কেননা এইবারও পশ্চাতের শক্তিমানদের এহেন কথাবার্তার বিরোধিতা করিয়া গণতন্ত্রীপন্থিরা বলিতে ব্যর্থ হইল যে, গণতন্ত্র অর্জনের লড়াইয়ে অরাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণের ব্যাপারটি অবান্তর। কিছু না বলিতে পারিবার ফল কী দাঁড়াইয়াছে? যাহারা নিজেদের গণতন্ত্রের রক্ষক বলিয়া মনে করে, তাহারা জানাইয়াছে যে, ‘‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব’’, ‘‘ইতিহাসের যথার্থতা রক্ষা’’, সর্বোপরি ‘‘মিসরের স্বার্থে’’ তাহারা রাষ্ট্রক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করিয়াছে। এই সকল দায়িত্ব যদি অরাজনৈতিক শক্তি নিজ হস্তে তুলিয়া লয় তাহা হইলে গণতন্ত্রীরা এতদিন ধরিয়া বিভেদকামী ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কী করিয়াছে? ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোবারকের স্বৈরাচারী শাসনাবসানের পরের ষোলটি মাস মিসরের ক্ষমতা কিন্তু সেই শক্তির নিয়ন্ত্রণেই ছিল। তখন গণতন্ত্রীদের কৌশলে দূরে রাখিয়া মৌলবাদীরা আইনসভার নির্বাচনে অংশ লইয়া রাষ্ট্রক্ষমতার বলয়ে ঢুকিয়া পড়িয়াছিল। তখন হইতেই তাহারা সুপ্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকার বহনকারী বর্তমান মিসরকে বহুত্ববাদী, পরমতসহিষ্ণু, বৈচিত্র্যবান্ধব করিবার পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী, এক মতাদর্শভিত্তিক, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার আধিপত্যভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করিবার নানাবিধ কলা-কৌশল করিতে থাকে। মোহাম্মদ মুরসি রাষ্ট্রপ্রধান হইবার পরে এই বিষয়টি আরও প্রকট হইয়া উঠে। গত নভেম্বরে দলীয় উদ্দেশ্যগুলি হাসিল করিবার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ বাড়াইয়া লইবার বাড়াবাড়ি করিতে যাইয়াই সঙ্কটে পড়িয়া যান মুরসি; শত চেষ্টা-চরিত্র করিয়াও সেই সঙ্কট আর কাটাইয়া উঠিতে পারিলেন না তিনি। বস্তুত নির্বাচনী জয়লাভকেই শাসকের ‘‘বৈধতার’’ একমাত্র স্মারক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিয়া পার পাইতে চাহিয়াছিলেন মুরসি। সম্প্রতি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি সর্বমোট ৫৬ বার ‘‘বৈধতা’’ শব্দটি উচ্চারণ করিয়াছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত শাসকের জুলুমের বিরুদ্ধে জনতা যখন দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠিয়া রাজপথে নামিয়া আসে তখন নির্বাচনী ‘‘বৈধতা’’ জনতার আদালতে পুনর্বার ‘‘বৈধ’’ করিয়া লইতে হয়। বিভেদকামী মুরসি এই ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যর্থ হইয়াছেন। দলীয় মতাদর্শিক বিষয়াদি লইয়া কূটকৌশলের কথা বাদ দিলেও অর্থনীতির ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা মুরসির সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মিসরীয়দের মনকে বিষাইয়া তোলে। কিন্তু শেষমেষ যাহা হইল তাহাতে সত্যিকারের গণতন্ত্র মিসরে আসিবে কী? রাজনীতিতে অরাজনৈতিক শক্তির হস্তক্ষেপের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাতে গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত কিন্তু কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন