নদী ভাঙন ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৩, ২২:১৮
নদীমাতৃক ভাটির দেশে ভরাবর্ষায় নদনদীসমূহ প্রমত্তা হইয়া উঠিলে তাহার পাড় ভাঙিবে। ইহাই প্রকৃতির নিয়ম। বর্ষা আসিয়াছে, ফি বত্সরের ন্যায় আমাদের শীতের শীর্ণ নদী দিগন্ত ছাপাইয়া যথার্থ স্রোতস্বিনী হইয়া উঠিতেছে। আর তাহার অভিঘাত তীব্রতর হইতেছে নদীর কূলবর্তী জনপদগুলিতে। পত্রিকার পাতায় প্রায় দিনই আমরা দেখিতে পাইতেছি, দেশজুড়িয়া নদী ভাঙনের ভয়াবহরূপ। ইহা অনস্বীকার্য যে, নদীর ভাঙা-গড়ার নিয়মের ভিতর দিয়া আমাদের ভূপ্রকৃতিই প্রতিনিয়ত বদলাইতে থাকে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় সোয়া দুই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নদীতীরে ভাঙন চলিতেছে। ইহার বিপরীতে কিছু চর জাগিয়া উঠিতেছে বটে, তবে তাহা অপ্রতুল। বিগত তিন যুগে এইদেশের দুই কোটি মানুষ নদীভাঙনের শিকার হইয়াছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের আট জেলায় গত তিন দশকে প্রায় এক কোটি লোক নদীভাঙনের শিকার হইয়া ভূমিহীন ও সর্বস্বান্ত হয়েছে। দেশে প্রায় কোটির উপরে স্থায়ী ভূমিহীন পরিবার রহিয়াছে, তাহার মূল কারণ এই নদী ভাঙন। ফি বত্সর আমাদের আর্থিক ক্ষতিও নেহাত্ হেলাফেলার নহে। তাহার পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকা! শুধু জনপদ নহে, সংখ্যাতীত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা আক্ষরিক অর্থেই নদীগর্ভে বিলীন ইহবার প্রহর গুনিতেছে। ইতোপূর্বে বিলীন হইবার সংখ্যাও নেহাত্ অপ্রতুল নহে। গত কয়েকমাস ধরিয়া আমরা পত্রিকান্তরে দেখিয়াছি অসংখ্য নদী ভাঙনের সচিত্র সংবাদ। বিলীন হইয়াছে জনগুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য স্থাপনাও। পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের দোকান, বাঁধ ও জমি নদীতে বিলীন হইয়াছে। পাবনার বেড়া উপজেলার রূপপুর ইউনিয়নের কাজিরহাট ফেরিঘাট হইতে দক্ষিণে মাশুমদিয়া ইউনিয়নের নতিবপুর পর্যন্ত ফসলী জমি এবং শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হইয়াছে নদীগর্ভে। হুমকির মুখে রহিয়াছে কাজিরহাট ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট, একটি পাকা মসজিদসহ অসংখ্য স্থাপনা। ফরিদপুর সদর ও চরভদ্রাসন উপজেলায় পদ্মার ভাঙনে ফসলি জমি ও রাস্তা বিলীন হইয়াছে। বলেশ্বর নদের ভাঙনের কবলে পড়িয়াছে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বড়মাছুয়া স্টিমারঘাট। নড়াইলে মধুমতির ভাঙনের কবলে স্কুল-বাজার প্রভৃতি জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রশ্ন হইল, নদী-ভাঙন কেন সামপ্রতিককালে ভয়াবহ হইয়া উঠিতেছে অতিমাত্রায়? তাহার উত্তর অন্বেষণে আমরা দেখিতে পাই অসংখ্য কারণ। আমাদের ৪০ শতাংশ ভূমিই নদীবাহিত পলিদ্বারা সৃষ্ট। বলা যায়, আমাদের এই ব-দ্বীপ ভূখণ্ড একটি জলবেষ্টিত ভূ-ভাগ, যাহার ভিতর দিয়া এশিয়ার তিনটি বৃহত্তম নদী নানা শাখা-প্রশাখা লইয়া বঙ্গোপসাগরে লীন হইয়াছে। প্রতি বত্সর গড়ে প্রায় এগারো শত বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি বাংলাদেশের ভিতর দিয়া প্রবাহিত হয়। আমাদের ভূমি পলিবাহিত বদ্বীপ বলিয়াই তুলনামূলক ভঙ্গুর। তাহা ছাড়া নদীর পাড়ের নিম্নাংশে অবস্থিত নরম পলি মাটি ঢেউয়ের ধাক্কায় ধাক্কায় গলিয়া যাইবার কারণে নিচের দিকটা ক্রমশ ফাঁপা হইতে থাকে এবং উপরের শক্ত মাটি প্রথমে ধসিয়া যায়, পরে তাহা ভাঙিয়া পড়ে। প্রাকৃতিক কারণ লইয়াও আমাদের উদ্বেগ বাড়িতেছে। কেননা, সমপ্রতি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনাবৃষ্টি অথবা অতিবৃষ্টির হার বাড়িয়াছে অস্বাভাবিক মাত্রায়। হিমালয়ের বরফও দ্রুততার সহিত গলিয়া যাইতেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার বৃদ্ধিও ঘটিতেছে বিপজ্জনক হারে। ফলে প্রকট হইতেছে ভাঙন, বন্যা ও জলাবদ্ধতা। তাহা ছাড়া নদীর ভিতরে আড়িবাঁধ তৈরি, অপরিকল্পিত গ্রোয়েন ও বাঁধ নির্মাণ, নদীর উেস বাঁধ দিয়া পানি আটকাইয়া রাখা এবং হঠাত্ তাহা ছাড়িয়া দেওয়া, কৃত্রিম উপায়ে নদীর গতিপথ তৈরি এবং অপ্রয়োজনীয় স্লুইসগেট নির্মাণ— এইসকল কারণেও আমাদের দেশে নদীভাঙন দিনদিন ভয়াবহ হইয়া উঠিতেছে। মন্থর অথচ তীব্র গরলের মতো নদী ভাঙন আমাদের জাতীয় জীবনে অমোচনীয় দুর্যোগ ও দুর্ভোগে পরিণত হইয়াছে। আবার তাহা হইতে পুরোপুরি নিষ্কৃতি পাইবার মতো সামর্থ্য ও অর্থ আমাদের নাই। সুতরাং এইক্ষণে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে হইবে সেই সকল জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায়, যেইগুলি নদীগর্ভে বিলীন হইবার ঝুঁকিতে থাকিলে ব্যাহত হইবে গণমানুষের অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক স্বার্থ। সেই বিবেচনায় আমাদের সীমিত সামর্থ্যের ভিতরে ভাঙন কবলিত রাস্তা, বাঁধ, ফেরিঘাট, লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা জরুরি ভিত্তিতে রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। তাহার সহিত নদী ভাঙন রোধে বিদ্যমান উন্নয়ন কাজেও ন্যূনতম অনিয়ম অব্যবস্থাপনা অপনয়ন করিতে হইবে কঠোরহস্তে। এই সকল বিষয় অবহেলা প্রদর্শন করিবার কোনো অবকাশ নাই।