[ নি র্বা চ ন ]

জাতীয় নির্বাচনের কী হবে?

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৩, ২১:৪৩
প্রাচীনকালে গ্রীস ও রোমে ছোট ছোট নগর-রাষ্ট্র (city state) ছিল। ওই সময় অভিজাত শ্রেণিই প্রত্যক্ষভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করত। কিন্তু সেই আমলের প্রত্যক্ষ শাসনব্যবস্থার দিন এখন আর নেই। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এখন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে। এই গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিনিধিত্বমূলক। নির্বাচনের মাধ্যমে এ শাসন প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জনসাধারণের দ্বারা পরিচালিত হয় না। এখনকার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জনগণের সম্মিলিত সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। জনগণের এই সম্মতি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সুতরাং প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোটাধিকারের মাধ্যমেই জনগণ শাসনকার্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। সেজন্য নির্বাচন হলো আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি। Dictionary of Government and Politics-এ বলা হয়েছে, Election means act of electing a representative or representatives. General elections mean choosing of a parliament by all the voters in a country. নির্বাচনই এখন একমাত্র মাধ্যম যা প্রতিনিধি পছন্দের সুযোগ দিয়ে জনগণকে তাদের শাসন পরিচালনার সুযোগ দেয়। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ যোসেফ স্যুমপিটারের মতে, ‘the ballot is stronger than bullets’. বাংলাদেশে নির্বাচন খুবই জনপ্রিয়। প্রতিটি নির্বাচনের সময় সারাদেশে উত্সবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনী প্রচারণা, পছন্দের প্রার্থী ও দলের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনায় মেতে ওঠে এবং নির্বাচনের দিন বিপুল উত্সাহ নিয়ে ভোট দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের নির্বাচনী অভিজ্ঞতাও পুরনো। এদেশের প্রথম স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয় ১৮৭১ সালে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছরে দেশে ১৪টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ২টি রেফারেন্ডাম, ৩টি রাষ্ট্রপতি এবং ৯টি সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন খুব জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে নির্বাচনী কেলেঙ্কারিও কম হয়নি। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন যেমন হয়েছে, তেমনি ভোট কারচুপি, জালিয়াতি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও সহিংস নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও কম নয়। বাংলাদেশে এমন নির্বাচনও হয়েছে যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ‘fixed game’ বা ‘tragedy of democracy’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আবার বাংলাদেশের অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন থেকে ইতিবাচক শিক্ষা নেয়ার বিষয় আছে—এমন স্বীকৃতিও আছে। বাংলাদেশ নির্বাচনী দুর্নীতি প্রতিরোধে উদ্ভাবনশীলতার পরিচয় দিয়েছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে, যা বর্তমান মহাজোট সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করে। এ রকম নির্দলীয় সরকার গঠনের ধারণা পৃথিবীর আর কোনো দেশে ছিল না। এজন্য এ ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের ‘home grown plant’ বলা হতো। বাংলাদেশের ওই উদ্ভাবন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছিল; এবং অনেক দেশে এর প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশ থেকে ধারণা নিয়ে বর্তমানে কয়েকটি দেশে এ ব্যবস্থার অধীনে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সম্পর্কে ভারতীয় পর্যবেক্ষক নিখিল চক্রবর্তী বলেন, ‘it is important that both the policy makers and opinion makers in our country seriously study the Bangladesh experiment to draw necessary lessons for reinforcing our election process under a neutral caretaker government set up’. শান্তিপূর্ণ, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন গণতন্ত্রের অপরিহার্য পূর্বশর্ত। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ভাষায়, ‘Elections, open, free and fair, are the essence of democracy, the inescapable sine qua non’. ভোটে কারচুপি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জাল ভোট প্রদান, মাস্তানি, ক্ষমতার দাপট, কালো টাকার ব্যবহার থেকে নির্বাচনকে মুক্ত রাখতে হয়। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মেরন উইনার বলেছেন, ‘নির্বাচন নিরপেক্ষ না হলে সে নির্বাচনের আসলে কোন মূল্য নেই।’ সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করতে না পারলে সেটা কোনো দেশ বা জাতির জন্য ক্ষত ভিন্ন কিছুই নয়। ২০০২ সালের মার্চ মাসে জিম্বাবুইয়ের নির্বাচন সুষ্ঠু না হবার জন্য সংবাদ মাধ্যমে খবর বের হয়, ‘Mugabe wins, but Zimbabwe losts’. বাংলাদেশে শুরু থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও দলীয় প্রভাবমুক্ত সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এ ব্যবস্থার চেয়ে উত্তম বিকল্প এখন পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীর জয়লাভকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার স্বার্থে তত্ত্বাবধায়কের দাবির প্রতি জনগণের সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছে বিরোধী দল। অপরদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচিত সরকারের অধীনেই যে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব—এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হল, দু’পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে কোনো সুরাহা হচ্ছে না। আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ-সংশয় শুধু দেশবাসীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনা চলছে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করা হচ্ছে বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতেও। ১৮ জুন যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলন ও সহিংসতা বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে ব্যাহত করতে পারে। তাদের আশংকা, নির্বাচনের আগে দেশটি গভীর বিশৃংখলাপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত হবে। বস্তুত, দ্য গার্ডিয়ানের এ আশংকা গোটা দেশবাসীর উত্কণ্ঠারই প্রতিধ্বনি। বিবদমান দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের প্রেক্ষাপটে একটা প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে আর তা হল, জাতীয় নির্বাচন কি আদৌ যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হতে পারবে অথবা সরকার কি প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ভাবছে? সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তা নিরপেক্ষ ও দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে—এ দাবি কোনো মহলেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। প্রধান বিরোধী দল যেখানে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে বর্তমান ব্যবস্থায় অনাস্থা প্রকাশ করছে, সেখানে নির্বাচিত সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে মহাজোটের একগুঁয়েমি মনোভাব নৈতিকভাবেও সমর্থনযোগ্য নয়। আর দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি যে ভালোভাবে নেয়নি, সিটি নির্বাচনে সরকারি দলের পরাজয়ের কারণগুলোর মধ্যে এই বিষয়টিও অন্যতম। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারি দলের নিরপেক্ষতা প্রমাণিত হয়েছে—এ কথা সত্য। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফাত্ তারা নিশ্চয় বোঝেন। সরকারের নির্বাচনী নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের (স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনী ফলাফল দিয়ে সরকার বদল হয় না) ঝুঁকি নেয়া যায়, কিন্তু রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য পূরণ অর্থাত্ সরকার গঠনের মাধ্যমে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার ঝুঁকি যে নেয়া যায় না, সেটা বিরোধী দল বোঝে না—এটা ভাবলে ভুল হবে। ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে, জনমতকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা কখনও ভালো হয় না। খ্যাতনামা পশ্চিমা লেখক ড্যান স্ট্রিকল্যান্ডের কথায়, ‘Opinion of the people is the indicator of what can be done and can not be done’. প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য হবে না। আর একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ, গণতন্ত্র ও রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না। এই ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের পক্ষে দীর্ঘকাল রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। সুতরাং যেকোনো বিচারে সরকার পক্ষকে নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার হয়তো ভাবছে, সাংবিধানিক বৈধতাই বড় কথা। কিন্তু সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকছে কিনা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গণতন্ত্র চর্চা করা যাচ্ছে কিনা, সেটাই বিবেচনার মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত। তবে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, রাজনীতি গত কয়েকদিন ধরে এক জায়গায় থমকে আছে—সামনেও এগোচ্ছে না, আবার পেছাচ্ছেও না। সম্ভবত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন উভয় জোটই মেয়াদের শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে। হয়তো আওয়ামী লীগ দেখতে চায়, আন্দোলন করে বিএনপি শেষ পর্যন্ত কতদূর যেতে পারে। আন্দোলনের চাপ সামলাতে পারলে সরকার একতরফা নির্বাচনের ঝুঁকি নেবে। আর সামলাতে না পারলে একেবারে মেয়াদের শেষ ভাগে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু এখনই আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করতে চাইছেন না সরকারের নীতিনির্ধারকরা। কারণ এতে সরকারি দলেরই কৌশলগত পরাজয় ঘটবে। তাতে করে নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে, যা সরকার এই মুহূর্তে চাইছে না। আর বিএনপির অবস্থান হল, সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনের ফলাফল পক্ষে গেছে। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে জিতলেও লাভ, হারলেও লাভ। আবার, জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হলে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই এখন আর তাড়াহুড়া নয়। মেয়াদের শেষভাগে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। তার আগে জনগণকে চটানোর মতো কর্মসূচিও দেবে না দলটি। পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে আলোচনার জন্য দলটি আর কোনো প্রস্তাব দেবে বলেও মনে হয় না। এ পরিস্থিতি দু’দলের জন্যই অনেকটা স্নায়ুযুদ্ধের মতো। একটি দল ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে এবং অপর দলটি ক্ষমতায় যেতে চাইছে। কিন্তু কী প্রক্রিয়ায় পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে নেবেন, সম্ভবত তা নিয়েই এখন স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। যে কারণে অচলাবস্থা সহজে দূর হচ্ছে না। এরকম করতে করতে একসময় শেষ রাউন্ডের ঘণ্টা বাজলে নিজেদের সুবিধামত আর কোনো উপায় না পেলে বাধ্য হয়ে তারা আলোচনা বা সংলাপে বসবে বলে মনে হচ্ছে। যখন উভয় দলই দেখবে যে, তারা কেউই নিরাপদ নন, তখন তাদের বোধোদয় হতে পারে। দেশের রাজনীতি এ সমীকরণে চললে দেশবাসী হয়তো ভবিষ্যতে সংকট উত্তরণে শান্তিপূর্ণ পথ দেখতে পাবে। শেষ করার আগে দেশের রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে আব্রাহাম লিংকনের একটি বক্তব্য তুলে ধরে শেষ করছি। তিনি বলেছিলেন, ‘You can fool all the people some of the time, and some of the people all the time, but you cannot fool all the people all the time’. লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন