সরবরাহকৃত পানি ও খাদ্য লইয়া গার্মেন্টস শ্রমিকদের অস্বস্তি ও উদ্বেগ যখন বাড়িয়া চলিয়াছে, ঠিক সেই মুহূর্তে কালিয়াকৈরের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় রাত্রির নাশতা খাইয়া পাঁচশত শ্রমিক অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছেন। স্থানীয় একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিত্সক ইহার জন্য খাদ্যে বিষক্রিয়াকে দায়ী করিয়াছেন। ভুক্তভোগীরা জানাইয়াছেন যে, টিফিন হিসাবে তাহাদেরকে যেই ডিম ও কেক সরবরাহ করা হইয়াছিল তাহা ছিল দুর্গন্ধযুক্ত। বাসি ও পচা খাবার দেওয়ার অভিযোগে শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিলে গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করিয়া তাহাদের শান্ত করেন। উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে আশুলিয়া ও গাজীপুরের একাধিক কারখানায় টিফিন খাওয়ার পর শত শত শ্রমিক অসুস্থ হইয়া পড়ার ঘটনা ঘটিয়াছে। তাহার রেশ কাটিতে না কাটিতেই শুধু পানি পান করিয়াই অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছেন অসংখ্য শ্রমিক। শুধু তাহাই নহে, অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তিও ঘটিয়া চলিয়াছে। ফলে পোশাক শিল্পে কর্মরত বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের উপর যেমন ইহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে, তেমনি চলিতেছে নানা জল্পনা-কল্পনাও। অন্তর্ঘাতের আশঙ্কাই শুধু ব্যক্ত করা হইতেছে না, সেই সাথে খোঁজা হইতেছে এই ধরনের গণঅসুস্থতার মনস্তাত্ত্বিক কারণও। তবে সর্বশেষ কালিয়াকৈরে যাহা ঘটিয়া গিয়াছে তাহা হইতে ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণটি অনুধাবন করা কঠিন নহে।
গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিকদের টিফিন বা খাদ্য সরবরাহের উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। ইহাতে স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের আর্থিক চাপ যেমন কিছুটা লাঘব হয়, তেমনি সাশ্রয় হয় কর্মসময়েরও। পাশাপাশি, কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষে নিয়মিত শত শত শ্রমিকের জন্য খাদ্য সরবরাহ করা যে প্রায় অসম্ভব—তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। ফলে ঠিকাদারদের উপর নির্ভর করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। ঠিকাদারদের বিষয়ে বিশদ বলিবার প্রয়োজন নাই। এই একটি বিষয়ে দেশবাসীর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার এমনিতেই যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তদুপরি, পোশাক শিল্পে ঝুট ব্যবসা আর খাদ্যের ঠিকাদারি লইয়া কী হয়—তাহাও কম-বেশি সকলেই জানেন। সর্বাপেক্ষা বড় সমস্যাটি হইল অর্থনৈতিক। জিনিসপত্রের দাম যেইভাবে বাড়িয়া চলিয়াছে তাহাতে বরাদ্দকৃত অর্থে মানসম্পন্ন খাবার সরবরাহ করা আদৌ সম্ভব কিনা সেই প্রশ্ন তো আছেই। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বিপুল পরিমাণ খাবার পরিবহন ও পরিবেশনের বিষয়টিও উপেক্ষা করিবার মতো নহে। এই সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখিয়া টিফিন বা খাদ্য সরবরাহের ব্যাপারে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই সমীচীন হইবে বলিয়া আমরা মনে করি। স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির কোনো বিকল্প নাই। এই ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই বিশেষ নজর দিতে হইবে।
বাসি, পচা ও ভেজাল খাদ্য মওজুদ, বিপণন ও সরবরাহ করা গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। কারণ ইহার সহিত মানুষের বাঁচামরার প্রশ্ন জড়িত। উন্নত বিশ্বের দেশগুলিতে খাদ্য লইয়া কোনো ধরনের জালিয়াতি বা গাফিলতির কথা ভাবাই যায় না। কালিয়াকৈরের মতো ঘটনা সেইসব দেশে ঘটিলে ভোক্তারাই দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাইতেন। আদায় করিয়া ছাড়িতেন বড় অংকের ক্ষতিপূরণ। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। কেন ভিন্ন—তাহাও ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুত সকল সমস্যার মূলে রহিয়াছে আমাদের দুঃসহ দারিদ্র্য। আর ইহার সর্বোত্তম সমাধান হইল— জীবনমানের উন্নয়ন। সেই লক্ষ্য অর্জন করিতে হইলে যেই ধরনের অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সমৃদ্ধি প্রয়োজন তাহাও আমাদের আয়ত্তে নাই। অতএব, ধৈর্য ধারণ করিতে হইবে। গ্রাম হইতে আগত মানুষগুলিকে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করিয়া তুলিতে হইবে নগরজীবনে। সর্বোপরি বাড়াইতে হইবে শিক্ষা, সচেতনতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি।
