জিন বিবর্তন প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৩, ২২:০০
বাংলা সাহিত্যের এক নেটিভ ভূতের গল্পের মহানায়ক আজ এই জনপদে পথের ভিখারি হইয়া গিয়াছে। তাহার নাম ‘কলেরা’। খাঁটি দেশীয় ভূতের গল্পের নায়ক ছিল এই রোগটির অণুজীবখানি। বাঙলা হরর গল্পে এই ব্যাকটেরিয়ার অবদান ভুলিবার নয়। আমরা অসংখ্য গল্প পড়িয়াছি, যেইখানে দেখা গিয়াছে গল্পের নায়ক মধ্যরাতের ট্রেন হইতে নির্দিষ্ট গন্তব্যের স্টেশনে নামিয়া হকচকাইয়া গিয়াছেন। চারিদিক শুনসান। মায়াময় চাঁদের আলোয় পথ খুঁজিয়া যখন তিনি অতিথির বাড়ি যাইতেছেন, তখন দেখিতে পাইতেছেন সারা গ্রাম যেন প্রেতপুরীর মতো ঘুমাইয়া আছে! অতিথির বাড়িও নিঝুম। নানা ভৌতিক বিড়ম্বনা শেষে পরের দিন প্রাতে নায়ক জানিতে পারিলেন— গ্রামখানির সব লোক কয়েক সপ্তাহ পূর্বেই মারা গিয়াছে। শুধু গল্পে নয়, বাস্তবেও কলেরা রোগ মহামারীর আকার ধারণ করিয়া গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করিয়াছে এককালে। কিন্তু এ জগতে কাহারো রাজত্ব মহাকালব্যাপী হইতে পারে না। সন্তর্পণে তাহাদের যবনিকা পতন ঘটে। জগতের ভারসাম্য রক্ষার্থে তাহা প্রয়োজনীয়ও বটে। নূতন গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গিয়াছে, এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলে ভয়াবহ কলেরা রোগের জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিয়াছে বাংলাদেশেরই মানুষের জিন। এই অঞ্চলের মানুষ দিনের পর দিন কলেরার বিরুদ্ধে লড়াই করিয়া তাহাকে প্রতিহত করিবার শারীরিক পরিমার্জন সাধন করিয়া লইয়াছে। মানুষের জিন আধুনিক চিকিত্সা পদ্ধতি আবিষ্কারের অপেক্ষা করে নাই। আধুনিককালে ইহাকে মানব দেহের অভ্যন্তরে নাটকীয় বিবর্তন বলা যাইতে পারে। যক্ষ্মা, প্লেগ, গুটিবসন্ত, কলেরা হইতে শুরু করিয়া হাল আমলের এইচআইভি জীবাণু মানুষকে কম নাকানিচুপানি খাওয়ায় নাই। শিল্পসাহিত্য ও রাজনৈতিক ইতিহাসে প্লেগ রোগের জীবাণু কিংবদন্তি হইয়া গিয়াছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ লইয়া আলবেয়ার কাম্যুর ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসের প্রতীকী চিত্রছবি আমাদের ভাবাবেগ বাড়াইয়া দেয়, বিস্মিত করে। যাহা বলিবার তাহা হইল, এই সকল বেশিরভাগ মহাপ্রতাপশালী জীবাণু রাজা মহারাজারা আজ রাজত্ব হারাইয়াছে। এই সত্যের বিপরীতে আরো একটি নিষ্ঠুর সত্য রহিয়াছে। নূতন নূতন জীবাণুর উদ্ভব ঘটিতেছে, যাহাদের ব্যাপারে মানব জিনের কোনো পূর্বাভিজ্ঞতা নাই। অর্থাত্ নূতন নূতন মৃত্যুদূত সৃষ্টি হইতেছে সৃষ্টিতত্ত্বের নিজস্ব নিয়মেই। আধুনিক চিকিত্সা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অস্ত্র লইয়াও আমরা এই সময়ে আসিয়া বিপন্নতার পদধ্বনি শুনিতে পাইতেছি। বর্তমান চিকিত্সা ব্যবস্থায় জীবাণুদের প্রতিহত করিবার বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতার রেখাচিত্র ক্রমশই নিম্নমুখী হইতেছে। ব্যাকটেরিয়া-জনিত মারণ রোগ প্রতিহত করিতে যে ভুবনজয়ী অ্যান্টিবায়োটিক এ জগতে শুধু মানুষের জয়ের নিশানা ঊর্ধ্বে তুলিয়া আসিতেছে এই আধুনিক সময়ে, সেই বিজয় কেতন আজ জীর্ণ হইয়া যাইতেছে। অ্যান্টিবায়োটিক-এর যথেচ্ছ ও নির্বিচার মাত্রাহীন ব্যবহারে ওই সকল জীবাণুর জিনও তাহাদের রক্ষা করিতে বিবর্তিত হইয়া যাইতেছে, হইয়া উঠিতেছে অ্যান্টিবায়োটিক বিরোধী। কোনো পক্ষই চিরকাল বসিয়া বসিয়া শুধু মার খাইবে না, ইহাই সৃষ্টিতত্ত্বের পরম সৌন্দর্য। বলা যায়, এই সত্য সর্বজনীন। অর্থাত্ জগতের সকল প্রাণকুলই প্রতিকূলতা কাটাইয়া উঠিতে তাহার অন্তস্থ জিনগত পরিবর্তন সাধন করিয়া নেয়। প্রকৃতির অন্তর্নিহিত দর্শন আমাদের সেই পরম সত্য প্রতিনিয়তই নানা উপায়ে জানাইয়া দেয় যে, এ জগতে যে যত বড় প্রতাপশালী হউক না কেন, তাহার রাজপাটে একদিন গোধূলি ঘনাইয়া আসিবেই। সুতরাং তোমাকে বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে। এবং যিনি গোকূলে বাড়িছে, তিনিও একদিন শক্তিহীন হইবেন। অর্থাত্—এই দিন দিন নহে, আরো দিন আছে। যাহারা অত্যাচারের শিকার এবং যাহারা শিকারী, সকলেই জন্যই ইহার ভিতরে লুকাইয়া রহিয়াছে গভীর সত্য। এই সত্য দর্শনের জন্য চক্ষুষ্মান হওয়া দরকার আমাদের সকলের।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন