জনকল্যাণ যেন রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উপায় হয়ে না যায়

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৩, ২২:০১
দড়ি কিনতে এসেছেন এক ব্যক্তি। দড়ি বিক্রেতা তাকে দড়ি কেনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। দড়ি কেনার উদ্দেশ্য কেন জানতে চাইছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে দড়ি বিক্রেতা জানান যে কিছুদিন আগে এক ক্রেতা তার দোকান থেকে দড়ি কিনে নিয়ে যান এবং কিছুদিন পর অভিযোগ নিয়ে হাজির হন এই বলে যে তার বিক্রিত দড়িতে শুকাতে দেয়া কাপড় চুরি হয়ে গেছে। ক্রেতা ব্যক্তি বিক্রেতাকে নিশ্চিত করলেন যে তিনি কাপড় শুকানোর উদ্দেশ্যে দড়ি কিনছেন না। এরপরও যখন বিক্রেতা দড়ি কেনার উদ্দেশ্য জানার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করলেন, ক্রেতা খানিকটা রাগান্বিত হয়েই বললেন, ‘ইচ্ছে হলে আমি দড়ি গলায় দিয়ে মরবো, তাতে কার বাপের কি? আপনি দড়ি বিক্রেতা দড়ি বিক্রি করেন’। এবার দড়ি বিক্রেতা সদয় হেসে বললেন, ‘তা আগে বলবেন তো। আপনি নিশ্চিন্তে দড়ি কিনতে পারেন। কারণ আপনি মারা গেলে আমার কাছে কোনো অভিযোগ আসবে না।’ এটি একটি রুশ কৌতুক। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ঐ দড়ি বিক্রেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। উক্ত দড়ি বিক্রেতার যেমন ক্রেতার মৃত্যু নিয়েও কোন ভাবনা নেই বরং তার কাছে অভিযোগ না আসলে সব ঠিক, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর জনগণের কল্যাণ-অকল্যাণ নিয়ে মাথাব্যথা নেই বরং নিজ দল সমালোচিত না হলেই স্বার্থসিদ্ধি। এবার আসি আমাদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ‘জনকল্যাণমূলক’ ভূমিকা নিয়ে। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে দা-কুমড়া সম্পর্ক তা আবর্তিত হচ্ছে মূলত পরস্পরের দলীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে— জনকল্যাণের উদ্দেশ্য যেন সেখানে সুুদূরপরাহত। পদ্মা সেতু জটিলতা নিরসনে বিশ্বব্যাংক ফিরে এলে পুরো জাতি যখন উত্ফুল্ল, বিএনপিকে মুখভার মনে হচ্ছিল। দিনাজপুরের জনসমাবেশে তো বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মাথা খেয়ে বলেই বসেছিলেন, ‘নাকে খত দিয়ে, কান ধরে উঠ-বস করে ও বিশ্বব্যাংকের শর্ত মেনে নিয়ে সরকার বিশ্বব্যাংককে ফেরত এনেছে’। সরকারের সাফল্যকে স্বীকার না করে তাকে এ ধরনের অশিষ্ট বাক্যবাণে বিদ্ধ করার অর্থ হলো বেগম খালেদা জিয়া বিশ্বব্যাংকের ফিরে আসাতে খুশি হতে পারেননি। কারণ সেতু প্রকল্প ঠিকঠাক চালু করতে সরকার ব্যর্থ হলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে একে একে সব ঋণদাতা সংস্থা মুখ ফিরিয়ে নিল। বিএনপির চশমার নিচে বাংলাদেশের নয়, পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের সেতু হিসেবে ধরা দিয়েছে। আমরা কি লক্ষ্য করেছি, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে যতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিল(এখনো উঠছে), পদ্মা সেতু প্রশ্নে বিশ্বব্যাংক পিছু হটে গেলে এই প্রধান বিরোধীদল ততটাই উদাসীন ছিল। এমন কি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি দূরে থাক, এ বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করতেও কৃপণতা দেখিয়েছে। এর কারণ পূর্বেই উল্লেখ করেছি। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তথা গণতন্ত্রের ধারাকে অব্যাহত রাখতে সংসদ অধিবেশনে সরকার দল ও বিরোধীদল উভয়ের নিয়মিত উপস্থিতির বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারের যাত্রাকাল থেকেই প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নানা ছুতায় সংসদ বর্জন করে আসছিল। এতদিন পর হঠাত্ দলটি সংসদমুখী হয়ে পড়েছে। তবে কি বিএনপির বোধোদয় হয়েছে? দেশ ও দশের স্বার্থে সংসদীয় পন্থাকে অনুসরণ করছে? এসব কিছুই নয়-আমাদের সবার জানা কথা, সংসদ সদস্যপদ যাতে খোয়াতে না হয় সেজন্য ন্যূনতম উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হাজিরা খাতায় কেবল সই দিতে এসেছে। দীর্ঘদিন পর বিএনপির সংসদ প্রত্যাবর্তনকে কি মোটের উপর জনকল্যাণের সাথে সম্পৃক্ত ভাবার অবকাশ আছে? উত্তর হলো, না। উপরন্তু সংসদে অকথ্য ও অশ্রাব্য ভাষায় গলাবাজি করে সংসদ ভবনকে মাছের হাটে পরিণত করা হয়েছে। এরশাদ সাহেবের টিপাইমুখ অভিমুখে লংমার্চের প্রয়াসকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই জাতীয় পার্টিকে আলোচনার ফোকাল পয়েন্টে নিয়ে আসার এবং দলের প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধির মেকানিজম হিসেবে দেখেছেন। মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীও ফারাক্কা প্রশ্নে লংমার্চে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। জনপ্রিয়তা বা জনসমর্থন প্রাপ্তির জন্য নয়, বরং জননেতা হিসেবে দেশ ও জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই জনকল্যাণে মনোযোগী ছিলেন। দুই প্রজন্মের দুই নেতার লংমার্চের উদ্দেশ্যে কি ফারাক! আর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রসঙ্গ টানাই বাহুল্য। সেগুলো ধর্মকেন্দ্রিক জনকল্যাণের বুলি আওড়ে দেদারসে রাজনীতি করে যাচ্ছে। আমাদের জনপ্রতিনিধিরাও ‘জনকল্যাণমূলক রাজনীতি’র ধারাবাহিকতা বেশ ভালোভাবেই রক্ষা করে চলে। মেয়াদের প্রায় পুরোটা জুড়ে মানুষের সেবায়, এলাকার উন্নয়নে কোন ভ্রূক্ষেপ থাকে না এঁদের। ঠিক নির্বাচনের আগে আগে রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করে যেন উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেয়। আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে জনকল্যাণই সর্বাগ্রে। বাঙালির দুর্ভাগ্য বা কর্মফল যা-ই হোক- জনকল্যাণ রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দেশে জনকল্যাণ কি থেমে আছে, থেমে নেই। রাষ্ট্র যেহেতু আছে, জনগণ যেহেতু আছে, আছে সরকার ব্যবস্থা, কোন না কোন জনকল্যাণের কাজ চলছে হরদম। কিন্তু কোন্ কল্যাণমূলক কাজটি উপেক্ষা করে কোনটি বাস্তবায়ন করতে হবে, কোন্ ইস্যুটি নিয়ে নীরব থেকে কোন্ ইস্যু নিয়ে রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও করতে হবে—এই বিষয়টি যখন নির্ধারিত হয় দলীয় স্বার্থ ও ক্ষমতা লাভের বিবেচনায় তখন সে ব্রতগুলো প্রকৃত কল্যাণের বিষয় হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে জনগণের মর্মপীড়ার বিষয়বস্তু। লেখক :সাবেক ছাত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]