প্রায় সাড়ে তিন বছর মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন জয়ী গায়ক বিপুল ভট্টাচার্য। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকালীন সময়ে অনেক গান গেয়েছিলেন। ষাটের দশকের শেষভাগে তিনি বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে গান করেছেন। সেই কিশোর বয়সেই তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে লোকসঙ্গীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তখন থেকেই আমার সঙ্গে তার পরিচয়। তারপর একত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অংশগ্রহণ করি। গান করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করার জন্যে ঘুরে বেড়াই শরণার্থী শিবিরে কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। বিপুল ভট্টাচার্য ছিলেন আমার কাছের মানুষ, ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমরা সুখ-দুঃখের সাথী ছিলাম। আমরা ইতিমধ্যে হারিয়েছি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী সমর দাস, অজিত রায়, সর্দার আলাউদ্দিন, মোকসেদ আলী সাই, বাবুল আকতার, গণি বোখারী, মোশাদ আলী, অমিতাভ সেনগুপ্ত, প্রবাল চৌধুরী, শাহ আলী সরকার, তড়িত্ হোসেন খান, অভিলাষ চন্দ্র শীল, গোপী বল্লব, শেফালী ঘোষ, হরলাল রায়, ওয়াহিদুল হক, তোরাব আলী শাহ, মদনমোহন দাস, হরেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী, দীপক মুখার্জী, অরুণ গোস্বামী, স্বপ্না রায়, মাধুরী আচার্যসহ অনেক শিল্পীকে। আর এবার আমরা হারালাম মুক্তির গানের সেই অবিস্মরণীয় কণ্ঠযোদ্ধা বিপুল ভট্টাচার্যকে। সারা পৃথিবীতে যেখানে বাংলা ভাষাভাষি রয়েছে তাদের কাছে মুক্তির গান শীর্ষক চলচ্চিত্রে তার গাওয়া ‘এই না বাংলাদেশের গান গাইতেরে, দুঃখে আমার পরাণ কান্দেরে।’ গানটি ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। বিপুল ভট্টাচার্য তার গায়কীর মাধ্যমে সবার অন্তর জয় করেছিল। বিপুল, মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার শিল্পী হিসাবে সেদিন আরও গেয়েছিলেন, ‘এই শিকল পরা ছল মোদের, জনতার সংগ্রাম চলবে, বিপ্লবেরই রক্তে রাঙা, মানুষ হ’, মানুষ হ’, আবার তোরা মানুষ হ’, বাংলা মা’র দুর্নিবার আমরা তরুণ দল, জয় বাংলা জয় বাংলা, ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি, এই না বাংলাদেশে, মুজিব বাইয়া যাওরে নির্যাতিত দেশের মাঝে এমনি অনেক উদ্দীপনামূলক গান। মুক্তিযোদ্ধারা মোহাবিষ্ট হয়ে শুনতো সেসব গান। বলতে গেলে মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার ট্রাকই হয়ে উঠেছিল বিপুল চট্টাচার্যের জীবন, ঘরবাড়ি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, শত সমস্যার কথা ভুলে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ ক্যারাভানে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন অনাবিল আনন্দ, এক প্রেরণার জীবন। ট্রাকেই খাওয়া, ট্রাকেই ঘুমানো, কখনও খেয়ে আবার কখনও না খেয়ে মুক্তাঞ্চলে গান গাওয়ার ঝুটঝক্কি কি কম ছিল! বিপুল ভট্টাচার্য কেবল মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার শিল্পী ছিলেন না, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। আমাদের সঙ্গে কত অনুষ্ঠানে সে গান করেছে, সে কথা এখনও মনে পড়ে। মনে পড়ে বিজয়ের কথা, মুক্তির কথা। অবশেষে অপেক্ষার দিন, দুঃখের দিন শেষ হলো। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। মুক্তি পাগল শোষিত মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ফসল স্বাধীনতা। ধনী-গরীব, জাত বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের আনন্দের সঙ্গে বিপুলকেও আনন্দিত হতে দেখেছিলাম। সেই আনন্দে ভনিতা ছিল না, কৃত্রিমতা ছিল না। তারপর জীবনের অনেকটা পথ একসাথে চলেছি গানের তরণী বেয়ে। কখনও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের সঙ্গে, কখনও শিল্পকলায়, বাংলা একাডেমী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় গ্রন্থাগার মিলনায়তন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদে, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের অনুষ্ঠানমালায়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, রবীন্দ্র সরোবরে আবার কখনও ১লা বৈশাখে ঋষিজের প্রভাতী অনুষ্ঠানে। কখনও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একসাথে গান গেয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি সারা বাংলাদেশে। পরিশেষে উল্লেখ করতে চাই, মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার কার্যক্রম থেকেই বেরিয়ে আসে মুক্তির গান শীর্ষক মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল। আর সেই কার্যক্রমের অন্যতম নায়ক, নন্দিত কণ্ঠশিল্পী বিপুল ভট্টাচার্য বিনা চিকিত্সায় বিনা সহায়তায় মারা যেতে পারেন না। তিনি সাড়ে ৩ বছর ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন। তাকে মরণব্যাধির সঙ্গে একাই লড়তে হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে, দায়িত্ব নিয়ে সরকার তার চিকিত্সা করেননি। এই কয় বছরে তাকে দেয়া হয়নি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
লেখক :গণসঙ্গীত শিল্পী
