আটাশ বছর বয়সী লোলা ওয়াং সাংহাইয়ের একজন মার্কেটিং অফিসার। পূর্ব চীনের শ্যানডং প্রদেশে বসবাসরত মা-বাবাকে ওয়াং বছরে দু’বার দেখতে যান নববর্ষ উদযাপনের ছুটিতে ও অক্টোবরের জাতীয় ছুটিতে। ওয়াং বলেন, আমার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ব্যস্ততা এবং দূরত্বের কারণে আমি তাদের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখতে পারছি না। সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। ওয়াংয়ের মত অনেক তরুণই এমন উভয় সংকটের মধ্যে রয়েছে যেখানে এক সন্তান নীতি এবং ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার প্রথা হুমকির মুখে। চীনে নতুন নেতৃত্বের জন্য ক্রমবর্ধমান বয়োজ্যেষ্ঠদের নিয়ে একটি উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গত সপ্তাহে চীনে একটি নতুন আইন করা হয়েছে, যেখানে প্রত্যেক সন্তানকে তাদের ৬০-ঊর্ধ্ব মা-বাবাকে নিয়মিত দেখতে যাওয়া এবং তাদের আর্থিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ওয়াং বলেন, চীনের অনেক বয়োজ্যেষ্ঠরই এমন অভিযোগ রয়েছে যে, তাদের সন্তানেরা তাদের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখে না।
২০১১ সালে চীনে ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক লোকের সংখ্যা ছিল ১৮ কোট ৫০ লাখ। ২০১৫ সালে তা ২২ কোটি ১০ লাখে পরিণত হবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের এক-তৃতীয়াংশ লোক বয়স্ক হিসেবে চিহ্নিত হবে। সন্তানদের কাছে বয়স্কদের অবহেলিত হওয়ার খবর ইদানিং বেড়েছে। একারণে গতবছরের ডিসেম্বরে বয়স্ক অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ আইন সংশোধন করা হয়েছে। জিয়াংসু প্রদেশের একটি স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রতি একটি ভয়াবহ তথ্যচিত্র তূলে ধরেছে। এক কৃষক তার ১০০ বছর বয়সী মাকে শূকরের ঘরে রেখেছিল। কৃষক চেন সৌতিয়ান বলেন, তার মা শূকরের সাথে থাকতে পছন্দ করেন। কল্যাণমূলক সমাজে বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বয়স্ক মা-বাবারা সাধারণত তাদের সন্তানদের উপর নির্ভরশীল হয়। চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্কুল অফ ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী চীনের এক-পঞ্চমাংশের অধিক লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যদিও চীনা সমাজে এখন পর্যন্ত বয়স্কদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা-ভক্তির প্রচলন রয়েছে। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেকটাই আজ হারতে বসেছে। ঐতিহ্যবাহী একান্নবর্তী পরিবার প্রথা বিভিন্ন কারণে আজ বিলুপ্তির পথে। এজন্য সরকারের ধীর কার্যক্রমই অনেকাংশে দায়ী বলে মন্তব্য করেন হংকং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমারজিং মার্কেটস ইনস্টিটিউটের পরিচালক আলবার্ট পার্ক। নতুন আইন অনুযায়ী ছেলে-মেয়েরা তাদের মা-বাবার প্রতি দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারবে না। এক্ষেত্রে তাদের দেখাশোনা বা যোগাযোগ করতে না পারলেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক ভাতা দিতে হবে। বয়স্করা তাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা মামলা করতে পারবেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সন্তানদের জরিমানা হতে পারে। তবে এই আইন বাস্তবায়ন বা জোরদার করা কঠিন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বেইজিং ইংকি ল’ ফার্মের ডিং ইউয়্যান। উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার জিয়াংসু প্রদেশের বাসিন্দা ৭৭ বছর বয়সী উস্কি তার মেয়ের বিরুদ্ধে তাকে অবহেলার জন্য মামলা করেন। নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর এটিই হচ্ছে প্রথম মামলা। তার সন্তানকে দু’মাস অন্তর একবার করে মাকে দেখতে যাওয়া এবং আর্থিকভাবে সহায়তার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
এই আইন নিয়ে কিছু বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই আইন যে সকল ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া বা কাজের জন্য দূরে থাকে তাদের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। ৫০ বছর বয়সী চেং জিগাং বলেন, এই আইনের ফলে মা-বাবা এবং সন্তানদের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। তার একমাত্র মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন। তার ইচ্ছা তার মেয়ে সাংহাই বা বেইজিংয়ের মত বড় শহরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হবে। জিগাং বলেন, আমি চাই না আমার মেয়ে আমার কারণে শারীরিক ও মানসিক চাপে থাকুক। আমার চেয়ে আমার মেয়ের ভবিষ্যত্ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটিমাত্র সন্তানের মঙ্গলের জন্য আমি সব করতে পারি।
