আমাদের দেশে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা কি দিন দিন দ্রুত হ্রাস পাইতেছে। নচেত্ সব ক্ষেত্রেই কাণ্ডজ্ঞান বিবর্জিত এত কাণ্ডকারখানা চলিতেছে কিরূপে? আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস আর এই গ্যাস লইয়া কর্তৃপক্ষ এবং গ্যাস ব্যবহারকারী উভয়েই যে সকল তেলেসমাতি দেখাইতেছে তাহাতে সকলের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পায় বৈ কী! গত শনিবার পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, গ্যাস বিতরণ লাইনগুলি হইতে বেপরোয়াভাবে অবৈধ লাইন নেওয়ার মহোত্সব শুরু হইয়াছে। কেরানিগঞ্জসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে এইরূপ সংযোগ নেওয়া অবৈধ এবং অপরাধ। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও কেহই উহার পরোয়া করিতেছে না। কথায় বলে ‘প্রয়োজন কোন আইন মানে না’ আর এই আপ্তবাক্যেরই যথাযথ প্রয়োগ আমরা দেখিতে পাইতেছি সর্বত্র। এই আপ্তবাক্যটির যথার্থ স্বীকার করিয়া লইয়াও বলা চলে যে, মানুষের প্রয়োজন মিটাইবার জন্য কর্তৃপক্ষের দিক হইতে সুপরিকল্পনা, সুষ্ঠু কর্মপ্রয়াস এবং সততা একান্তই প্রয়োজন। আমাদের দেশে যে যায় লঙ্কায় সেই রাবণ বনিয়া যায়। তাই গ্যাস বিতরণ, তদারকী ইত্যাদি বিষয়ে যে কর্তৃপক্ষের উপর দায়িত্ব অর্পিত হইয়াছে সেই কর্তৃপক্ষই যখন এ জাতীয় অন্যায় ও অবৈধ সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে বিপুল বিত্ত-বৈভব অর্জনের নেশায় মাতিয়া ওঠে তখন আর যাহাই হউক কার্যক্ষেত্রে নিয়ম-শৃংখলা এবং ন্যায়নীতিবোধ থাকে না এবং টেকেও না। সবকিছুই তখন লণ্ডভণ্ড হইবার জোগাড় হয়। দেশে বর্তমানে গ্যাস বিতরণ ক্ষেত্রে ঠিক এই অবস্থাটিই হইয়াছে। গ্যাসের এইরূপ অপব্যবহার যে দেশ ও জাতির সহিত বেঈমানীরই নামান্তর এই বোধ বা চেতনা আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকদের মাথায় কিছুতেই কাজ করে না। তাহাদের দুষ্কৃতির ফলে কাফ্ফারা দিতে হয় দেশের সর্বসাধারণকে।
প্রকাশিত খবরটিতে বলা হইয়াছে যে, যেনতেন প্রকারে নিম্নমানের অবৈধ লাইন বসাইয়া গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা এবং বিদ্যমান লাইনে অননুমোদিত কমপ্রেসর ও বিশেষ ধরনের রেগুলেটর স্থাপনের কারণে গ্যাসের বিতরণ লাইনগুলি বিপজ্জনক হইয়া উঠিয়াছে। এই সকল লাইনে যে কোন সময়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়া মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইতে পারে। মোদ্দাকথা, অননুমোদিত এই সব লাইন স্থাপনের ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা মানদণ্ড বজায় রাখা হইতেছে না। বহু বত্সর ধরিয়াই দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জননিরাপত্তার বিষয়টিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনপূর্বক ভবন, লঞ্চ, যানবাহন, ব্রীজ, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণ করিয়া কত নিরীহ মানুষের জীবন কাড়িয়া লওয়া হইয়াছে উহার কোন হিসাব নাই। সম্প্রতি রানা প্লাজার ঘটনাটি যে বিষাদান্তক পরিস্থিতির সৃষ্টি করিয়াছে উহাতেও বিভিন্ন ক্ষেত্রের মালিক ও কর্তৃপক্ষের আদৌ সম্বিত্ ফিরিবে এমনটা ভরসা হয় না। এই এক রানা প্লাজাই আজ দেশের গার্মেন্টস শিল্পের ভবিষ্যেক অনিশ্চিত করিয়া তুলিয়াছে। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও আমাদের সংশ্লিষ্ট মহলের উদগ্র লোভ-লালসার হোমানলে জননিরাপত্তা মায় দেশের সকল সম্ভাবনাই আজ ভস্মীভূত হইবার উপক্রম!
গ্যাস ক্ষেত্রে এই ধরনের নিম্নমানের লাইন স্থাপন ও অবৈধ সংযোগ প্রদানের কারণে হঠাত্ হঠাত্ অচিন্তনীয় দুর্ঘটনা ঘটিয়া যাওয়া অসম্ভব নহে এবং তেমনটি ঘটিলে উহা যে কি ভয়াবহ রূপ লইতে পারে তাহা বোধকরি আমরা কেহই ঠাওর করিতেই পারিতেছি না। কেবল অসভ্য বর্বর ও মগের মুল্লকেই বোধকরি এই জাতীয় অপরিণামদর্শী কাণ্ডকারখানা এতো সহজে ঘটিতে পারে। কিন্তু আমাদের লোভী, হিংস্র এবং নিছক ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিক হীন মানসিকতা সর্বত্রই যেভাবে প্রকট হইয়া উঠিয়াছে তাহাতে এই সমাজ ও রাষ্ট্রকে সভ্য বলা আদৌ সঙ্গত কিনা উহাও গবেষণার বিষয় বৈ নহে! নিয়ম ও শৃংখলার যাহারা পরোয়া করে না এবং কেবলই নিজের ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করাকেই যাহারা দেশসেবা মনে করে তাহারা পাষন্ড ছাড়া আর কী!
