আলোকপাত

বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে খাটো করা কারো উচিত নয়

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৩, ২১:৫২
ক’দিন আগে সংসদের একটি কুরুচিপূর্ণ বিতর্ক শুনছিলাম। যেখানে আক্রমণাত্মক বক্তৃতায় এক মহিলা সংসদ সদস্য বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে অযৌক্তিক বানোয়াট মনগড়া বক্তব্য রেখেছেন। তার সব কথা আমার মনে নাই তবে, এটুকু মনে আছে যে, তিনি বলেছেন শেখ মুজিব যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সমস্ত দেশবাসী জানেন, সমস্ত বিশ্ববাসী জানেন যে, বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতিকে যে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন তা পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা ছিল। তিনি কোন দিকনির্দেশনা দিতে বাকি রাখেন নাই। পাকিস্তান রাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের কথা মনে রেখেও তিনি বাঙালিদের যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তা বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি অকুতোভয় সাহসের কথা বলে দেয়। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট বলেছেন, আমি যদি আর কোন নির্দেশনা দিতে না পারি, আমি যদি আর হুকুম নাও দিতে পারি, সে অবস্থায়ও তোমরা পাকিস্তানিদের সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে দেশকে স্বাধীনতার সোপানে নিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু আগেই আঁচ করিতে পেরেছিলেন যে, তিনি বন্দী হতে পারেন, তিনি নিহত হইতে পারেন, সে অবস্থায় যাতে বাঙালি জাতি তাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ এগিয়ে নিতে পারে। সে জন্যই বঙ্গবন্ধু এই কথাগুলো বাঙালিদের পূর্বেই বলে দিয়েছেন। ৭ই মার্চের ভাষণে বাঙালিদের স্বাধীনতা যুদ্ধের যে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন এর নজির পৃথিবীতে আর নেই। ২৫শে মার্চের রাত ১২টায় যখন পাক বাহিনী ঢাকায় বাঙালিদের উপরে আক্রমন করে তখন, ঐ রাতেই একই সময় অর্থাত্ রাত ১২ টায় রাজারবাগ পুলিশ সর্বাত্মক প্রতিরোধ যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করিয়া দেয়। ২৫শে মার্চ রাত ১২ টার পর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা রাজারবাগ পুলিশ পিলখানা ইপিআর চট্টগ্রামসহ সর্বত্র ওয়ারলেসের মাধ্যমে পৌঁছে দেন। অর্থাত্ স্বাধীনতা ঘোষণার আগেই রাজারবাগ পুলিশ বঙ্গবন্ধুর আর কোন নির্দেশনা ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে দেয়। রাজারবাগ পুলিশের সাথে পরবর্তীতে ছাত্র-জনতা, শ্রমিক-জনতা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এক পর্যায়ে কৌশলগত কারণেই মুক্তিবাহিনী সম্মুখযুদ্ধ না করে, গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করার পর ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হবার পর মুক্তিযুদ্ধ ক্রমান্বয়ে বেগবান হয়। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বঙ্গবন্ধুর অনুগামীরা মুক্তিযুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর করে দেশকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। জিয়াউর রহমান ভিন্ন কোন লোক ছিলেন না। তিনিও বঙ্গবন্ধুর অনুগামী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব মেনেই তিনি ২৭ মার্চ বিকেলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার একটি ঘোষণা পাঠ করেন। তিনিও বঙ্গবন্ধুর অন্য অনুগামীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যান। একটা কথা আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয় ৭ই মার্চের ভাষণ থেকে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ২৫শে মার্চ রাত ১২টা থেকে। এর অনেক পরে ২৭শে মার্চ বিকেলে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেন। এটা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের একটি অংশ। জিয়ার ঐ ঘোষণাটি না হলেও ২৫শে মার্চ রাতে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধ ঠিকই বাংলাদেশকে স্বাধীন করে ফেলত। আমাদের মনে রাখা উচিত সমগ্র মুক্তিযুদ্ধটাই পরিচালিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর চেতনায়। অন্যকোন চেতনা এখানে ছিল না, সবার অংশগ্রহণ ছিল। বঙ্গবন্ধুর চেতনায় সাড়ে সাত কোটি বাঙালি সে দিন যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। পাকিস্তানিরা যদি বঙ্গবন্ধুকে মেরেও ফেলত, বঙ্গবন্ধুর ফাঁসি কার্যকর হলেও বঙ্গবন্ধুর চেতনাই মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করত এবং দেশ স্বাধীন হয়ে যেত। পৃথিবীতে অনেক নেতাই নের্তৃত্ব দিয়ে তাদের দেশ স্বাধীন করেছেন, কিন্তু সে তুলনায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল অতুলনীয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ। একটা বিষয়ে আমি আলোচনা করব। বঙ্গবন্ধুর চেতনা শুধু ৭ই মার্চের ভাষণই সৃষ্টি হয় নাই, বঙ্গবন্ধু কয়েক যুগ ধরে বাঙালি জাতির অন্তরে প্রবেশ করেছেন। একদিনে কোনদিন কারো ভাবমূর্তি তৈরি হয় না, তা সম্ভব নয়। একদিনের একটি ঘটনা মানুষ দুই দিন পরে ভুলে যায়। আর যুগ যুগ ধরে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মনে যে স্বাধীনতার চেতনা প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন তা চিরদিন অম্লান থাকবে। বংশানুক্রমে পুরুষানুক্রমে বঙ্গবন্ধুর চেতনা বাঙালির অন্তরে অম্লান থাকবে। তাই আমি বলব বঙ্গবন্ধুর সাথে আপনারা কারো তুলনা করবেন না। একটা কথা মনে রাখবেন বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বাধীনতার মহান নেতা আর জিয়াউর রহমান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। বঙ্গবন্ধুকে যাহারা খাটো করতে চাচ্ছেন তারা সফল হবেন না, তারা ইতিহাসের আস্তাবলে নিপতিত হবেন। বঙ্গবন্ধুর নামেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নামেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। আর সবাই জানেন, বিশ্ববাসীও জানেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সকল প্রেরণার উত্স ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লেখক :ব্যাংকার ও সাবেক ছাত্রনেতা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন