অবশেষে জনমনের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ও শঙ্কা-আশঙ্কা সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত করিয়া গাজীপুরের সিটি কর্পোরেশন মেয়র নির্বাচন সুষ্ঠু ও গোলযোগবিহীনভাবেই অনুষ্ঠিত হইয়াছে। নির্বাচনে সামান্য যে সহিংসতা ঘটিয়াছে পরিস্থিতির চাপ-তাপ ও উত্তেজনার কথা মাথায় রাখিয়া বিবেচনা করিলে উহা আদতে ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না। এই নির্বাচন নানান কারণেই অতীব গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। প্রথমত: কয়েকদিন পূর্বে দেশের ৪টি প্রধান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোটের ভরাডুবি এবং দ্বিতীয়ত: উহারই আলোকে গাজীপুরের মেয়র নির্বাচনে সরকারি পক্ষে কারচুপির আশঙ্কায় বিরোধী পক্ষের ব্যাপক প্রস্তুতি ইত্যাদি কারণেই এই নির্বাচনটিকে কেন্দ্র করিয়া সারা দেশেই ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা, শঙ্কা-আশঙ্কা বিরাজমান ছিল। অতএব, ভালোয় ভালোয় এইসব শঙ্কা-আশঙ্কা দূরীভূত হওয়ায় জনমনে একদিকে যেমন স্বস্তি ফিরিয়া আসিয়াছে, অন্যদিকে তেমনি আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিহীন সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া যে সম্ভব এই ধারণাটিও এই নির্বাচনের সাফল্যের মাধ্যমে অনেকের নিকট প্রতিভাত হইয়াছে। সরকার বিরোধীরা নির্বাচনী এইসব সাফল্যের উপর ভর করিয়া আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে তত্পর হয়, নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটিকে সমুন্নত রাখিয়া আন্দোলন চালাইয়া যাইতেই মনস্থির করে, উহার জন্যই এখন সকলের প্রতীক্ষা!
পর পর পাঁচটি মেয়র পদে ক্ষমতাসীন জোটের পরাজয়কে তাহারা কিরূপে মূল্যায়ন করিতেছে উহা এখনও বোঝা না গেলেও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যথার্থই ইহাকে বর্তমান সরকারের জন্য এক জোরালো সতর্ক বার্তা হিসাবে চিহ্নিত বা শনাক্ত করিয়াছেন। গাজীপুর এতোকাল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দুর্গ হিসাবে পরিচিত হইলেও এইবার ঐ দুর্গের পতন দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নিকট নূতন চিন্তার খোরাক জোগাইয়াছে বৈকি! এইসব মেয়র নির্বাচনের প্রেক্ষিতে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছে আর উহা এই যে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়া দেশ বুঝিবা আস্তিক ও নাস্তিক এই দুই ভাগে ভাগ হইয়া গিয়াছে। অর্থাত্, নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে এই বিভাজনকে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গেই ভোটারদের নিকট তুলিয়া ধরা সম্ভব হইয়াছে, ফলে নির্বাচনে উহার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়িতে দেখা গিয়াছে। এইরূপ বিভাজনের আদৌ কোন সত্যতা না থাকিলেও বিষয়টিকে নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারঙ্গমতা প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইয়াছে উহার প্রচারকারীরা। ফলে নির্বাচন বুঝিবা প্রার্থীদের জন্য অনেকটা সহজতর হইয়া উঠিয়াছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও যে ইহার প্রভাব পড়িবে উহা এক প্রকার সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায় নিশ্চয়ই। স্থানীয় ইস্যুর চাইতেও সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড ও ব্যর্থতার বিষয়গুলিই যেন এইসব নির্বাচনে ভোটারদের নিকট অধিক গুরুত্ব পাইয়াছে।
তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে কিন্তু জনগণের মনে সন্দেহ ও শঙ্কা থাকিয়াই যাইতেছে। বিরোধী দলগুলির জন্য এই মেয়র নির্বাচন কোন ফাঁদ কিনা উহাও ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণ করিয়া দেখা হইতেছে। আবার প্রধান বিরোধী দলকে প্রয়োজনে বাদ রাখিয়াই নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিন্তাও যে কাহারও কাহারও মাথায় নাই উহাও জোর দিয়া বলা যাইতেছে না। মোদ্দাকথা প্রধান বিরোধী দল ব্যতিরেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের শক্তি যেমন সক্রিয় রহিয়াছে, তেমনি আবার উহার বিপরীত ধারার শক্তিও কম সক্রিয় নাই নিশ্চয়ই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এইসব মেয়র নির্বাচনকে আগামী সংসদ নির্বাচন ত্রুটিমুক্ত রাখা বা উহার ছিদ্রাদি বন্ধ করার কলা-কৌশল রপ্ত করার সুযোগ হিসাবেও কোন কোন মহল কাজে লাগাইতে সচেষ্ট হইবে।
গাজীপুরের নির্বাচনে জয়-পরাজয় যেইভাবেই নির্ধারিত হউক না কেন, দেশের অন্যতম পতিত প্রধান সামরিক শাসক কাম রাজনীতিকের জন্য এই নির্বাচন দুর্যোগময় পরিস্থিতি ডাকিয়া আনিয়াছে। তাহার সব দলেই আছি, আবার কোন দলেই নাই এবং শেষতক ক্ষমতাসীনদের প্রার্থীর পক্ষে থাকার ঘোষণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য হাসির খোরাক জোগাইয়াছে মাত্র। নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, ইহাতে তাহার আম-ছালা দুইই হারাইবার জোগাড় হইয়াছে। তবে তিনি যাহাদের ক্রীড়নক রূপে কাজ করেন তাহারা এক্ষণে কোরামিন বা ফরমালিন প্রয়োগে তাহাকে কিয়ত্কাল তাজা রাখিতে সচেষ্ট হইবেন ইহাতে আর ভুল কী!
