শিক্ষার যখন ব্যাপক প্রসার ঘটিয়া চলিয়াছে, কাগজে-কলমে শেখার দিনকে পশ্চাতে ফেলিয়া যখন ডিজিটালাইজেশনের আয়োজন চলিতেছে পুরাদমে, তখনও এমন অনেক গ্রাম আছে যেখানে কোনো পাঠশালাই গড়িয়া উঠে নাই। এইরকমটি ভাবিতে বিস্ময়বোধ হইলেও বাস্তবে উহা বিরল নহে। দৈনিক ইত্তেফাকের খবর; বাহির হইয়াছে গত রবিবার, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার পঁচিশটি গ্রামে এখনও কোনো প্রাইমারি স্কুল গড়িয়া উঠে নাই। পত্রিকার পাতায় এই ধরনের সংবাদ অবশ্য ইহাই প্রথম নহে। গ্রামে স্কুল নাই, থাকিলেও ঘর নাই কিংবা ভবন একখানা ছিল, ভাঙিয়া গিয়াছে, ছাদ উড়িয়া গিয়াছে, ছেলেমেয়েরা ক্লাস করে খোলা আকাশের নিচে। দেখিবার-শুনিবারও যেন কেহ নাই।
যেসব গ্রামে ভাঙাচুরা হইলেও প্রাইমারি স্কুল একখানা আছে, সেইখানে বড় সান্ত্বনার বিষয় এই যে, নাই মামার চাইতে কানা মামা ভাল। পক্ষান্তরে যেসব গ্রামে এখনও পর্যন্ত একখানা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, সে তো সুদূর অতীতের নিস্তরঙ্গ পল্লীর সহিত তুলনীয়। অবশ্য এইখানে কিছু কথা আছে। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়া সব গ্রাম কিন্তু সমান নহে। এমন অনেক বড় গ্রাম আছে, যেখানে একাধিক প্রাইমারি স্কুল রহিয়াছে। একাধিক স্কুলের প্রয়োজনও আছে সেখানে। আবার এইরকম ছোট গ্রামও আছে, যেখানে স্কুল চলিতে পারে না। সেইসব গ্রামের ছেলেমেয়েরা অনায়াসেই পাশের গ্রামের স্কুলে যাইতে পারে। এই নিয়া তাহাদের কোনো খেদ নাই, থাকিবার কথা নহে। কাজেই সংখ্যা গণনা করিয়া কয়টি গ্রামে স্কুল নাই, তাহার চাইতে প্রশ্ন হইল কত বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে কি নাই!
বাংলাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধিত হইলেও এখনও এমন অনেক দুর্গম এলাকা আছে, যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া তেমন একটা লাগে নাই। সেইসব পশ্চাত্পদ অঞ্চলে কয়েক বর্গকিলোমিটারের মধ্যেও কোনো স্কুল না থাকা বিচিত্র নহে। এইরূপ ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হইতে যে বঞ্চিতই রহিয়া যাইতেছে, সে বলাই বাহুল্য। লেখাপড়ার সুযোগ বঞ্চিত এই শিশু-কিশোরদের জন্য অবশ্যই স্কুল স্থাপন করিতে হইবে। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করিতে বিশ্ব জুড়িয়া উদ্যোগ-আয়োজনের কোনো খামতি নাই। বাংলাদেশ সরকারও এই ক্ষেত্রে কম তত্পর নহে। সঙ্গে আছে বহু এনজিও। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতা সংস্থার সহায়তায় নানা ধরনের শিক্ষা কর্মসূচি চালু রহিয়াছে। আনন্দ স্কুল নামেও একটা কর্মসূচি আছে। কোনো কোনো বৃহত্ এনজিও নিজেরাও নিজস্ব নিয়মে প্রাইমারি বা প্রাক প্রাইমারি স্কুল চালাইতেছে। এতদসত্ত্বেও দেশের কোনো এলাকায় কোনো প্রাইমারি স্কুল নাই এমন চিত্র সত্যই দুর্ভাগ্যজনক। স্কুলবিহীন সমস্ত এলাকা শনাক্ত করিয়া স্থানীয় এনজিওসমূহ স্কুল স্থাপনের কার্যকর উদ্যোগ লইতে পারে। তদুপরি এই ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি যেমন- ইউপি মেম্বার, চেয়ারম্যানগণ উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করিতে পারেন। মোটকথা, নিজেদের অভাব-অভিযোগ নিজেদের উদ্যোগেই মোচন করিতে হইবে। নিজেরা আগাইয়া না আসিলে দূর হইতে অন্যরা আসিয়া যাচিয়া সমস্যার সমাধান করিয়া দিবে না।
