জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ও একটি আহ্বান

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০১৩, ২১:৩১
বিগত বছরগুলোতে অনেক বিনিদ্র রাত কাটিয়েছি জনসংখ্যার বর্ধিত চাপের কারণে। হাজারো মানুষ, পর্যাপ্ত খাবার নেই, বাসস্থান নেই, চাকরি নেই, চিকিত্সার ব্যবস্থা নেই। রাস্তা-ঘাটের স্বল্পতা, যানজট, হত্যা, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ, লুটপাট, দখল-বেদখল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-শিক্ষা উপকরণ-শিক্ষার সুযোগের অভাব। হাজারো সমস্যায় জর্জরিত মানুষগুলো দলে দলে শহরমুখী হচ্ছে। চাপ বাড়ছে নগরগুলোতে। জীবনের ন্যূনতম চাহিদাটুকু মেটাতে অন্যায়ের পথ বেছে নিচ্ছে। নাই, নাই আর নাই। এ অবস্থা থেকে সৃষ্ট গণহতাশার কারণে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছে মানুষ। সব মিলিয়ে একটি অরাজক অবস্থা বিরাজ করছে সারাদেশ জুড়ে। আমার মতো আপনারা সবাই এ সকল সমস্যার সন্মুখীন হয়েছেন, এসব নিয়ে আপনারাও হাজারো বার আমার মতো চিন্তা করেছেন, সমাধানের উপায় বের করার চেষ্টাও করেছেন—একথা আমি হলফ করে বলতে পারি। কিন্তু আমাদের ব্যক্তি উদ্যোগ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে নানাবিধ কারণে। সমস্যাটি যেহেতু রাষ্ট্রিক, সামাজিক এবং বিস্তৃত আকারের, এর সমাধানও করতে হবে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক উদ্যোগে—সম্মিলিতভাবে। আমরা সবাই বাঁচতে চাই, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই। কিন্তু এটা কি কোন একক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব? সমাজ বা রাষ্ট্রে ক্ষত রেখে ব্যক্তি শান্তিতে বা নিরাপদে থাকতে পারে না। আর সেই ক্ষত যদি ক্যান্সারের আকার ধারণ করে তাহলে ব্যক্তি, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। আমাদের দেশটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র আয়তনের। মাত্র ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১৪,৯৭,৭২,৩৬৪ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতকরা ১.৩৭ জন। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,০১৫ জন লোক বাস করে। যেখানে প্রতি বর্গমিটারে ভারত ও পাকিস্তানে যথাক্রমে ৩৭২ এবং ১৮৫ জন বাস করে। এই দেশে স্বাভাবিকভাবে আট কোটি লোক বাস করার কথা। কিন্তু আমাদেরই অবহেলার কারণে দেশের জনসংখ্যার পরিমাণটি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে আশির দশক পর্যন্ত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও বর্তমানে তা ঝিমিয়ে পড়েছে। যদিও বাস্তবে আশির দশকের তুলনায় অধিক পরিমাণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বেসরকারি সংস্থা এই ক্ষেত্রে কাজ করছে। ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যয়িত অর্থ ও জনবলের তুলনায় কম ফল (Output) পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তেজি ঘোড়াটি দ্রুতগতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে। কোনভাবেই লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। এমনিতর অবস্থায় সময় এসেছে নতুনভাবে চিন্তা করার। আমরা কি আমাদের জনসংখ্যা বর্তমান হারে বাড়িয়ে যাব? না-কি এর রাশ টেনে ধরে স্থিতিশীল অবস্থায় রাখবো? অথবা আমাদের জনসংখ্যা হ্রাস করে কাম্য পর্যায়ে নামিয়ে আনব? আমার ব্যক্তিগত মত হলো, আমাদের বিদ্যমান জনসংখ্যাকে হ্রাস করে আট কোটিতে নামিয়ে আনতে হবে। আমরা যদি তা করতে সক্ষম হই তাহলে দেশের বিদ্যমান সম্পদ ও সুযোগের ব্যবহার করে অনায়াসেই একটি উন্নত সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত হতে পারব। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে—এটি কিভাবে সম্ভব? আসুন আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবি। তাত্ত্বিক আলোচনায় না গিয়ে অত্যন্ত সহজভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা যাক। আমাদের দেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ষোল কোটি। আমরা যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে এক সন্তান নীতি গ্রহণ করি তাহলে প্রতিটি পরিবারে একটি সন্তানের বেশি হবে না। ফলে ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর পর দম্পতিটি মৃত্যুবরণ করলে পরিবারটিতে দুই জনের বদলে একজন সদস্য থাকবে। আজকে যদি সিদ্ধান্তটি (এক সন্তান নীতি) গ্রহণ করতে পারি, আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর পর আমাদের জনসংখ্যা আপনা থেকেই অর্ধেকে নেমে আসবে। তবে মনে রাখতে হবে দেশের একজন প্রজনন সক্ষম ব্যক্তিকে পরিকল্পনার বাইরে রেখে জনসংখ্যা হ্রাস করা সম্ভব নয়। সমৃদ্ধ ও উন্নয়ন তখন আর খুঁজে আনতে হবে না। তাত্ত্বিক ও কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরে করা যাবে। জনসংখ্যা হ্রাস করার কাজটি এত সহজ নয়। এজন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলে নানাবিধ বাধা-বিপত্তি আসবে। একাধিক প্রশ্ন আসবে। এ সবের উত্তরও থাকতে হবে। ধর্ম, সামাজিক মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতাসহ অনেক কিছুর দোহাই দিয়ে, জোর করে বাধা দিবে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এসব বাধা যুক্তি দিয়ে, প্রেরণার মাধ্যমে উত্রাতে হবে। সেজন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। আমাদের প্রাণপ্রিয় দেশটি আজ জনসংখ্যার ভারে ন্যুজ, বিপর্যপ্ত। আসুন জনসংখ্যা হ্রাসকরণের মাধ্যমে আসন্ন ভয়াবহ বিপদ থেকে দেশকে রক্ষা করি—সমৃদ্ধ ও উন্নত করি আমাদের বহু কষ্টে, বহু ত্যাগে অর্জিত এই জনপদকে। লেখক :গবেষক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন