আজ জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৩, ২১:৪২
“রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুমধাম/ ভক্তরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম/রথ ভাবে আমি দেব পথ ভাবে আমি/ মূর্তি ভাবে আমি দেব হাসেন অন্তর্যামী\” আজ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা উত্সব পালিত হচ্ছে। জগন্নাথরূপী পরমব্রহ্মার সামনে হূদয়ের সমস্ত আকুতি নিয়ে পরম ভক্তিতে মাথা নত করছে ভক্তবৃন্দ। জগন্নাথদেবের কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এক নতুন বিশ্বাসে অবিচল হয়ে ওঠে ভক্তের প্রাণ-মন। অতীতের পাপ-পঙ্কিলতার দূর হয়ে নতুনদিনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে মন। জগন্নাথদেব জ্যৈষ্ঠী পূর্ণিমাতে এই ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ওই দিনই জগন্নাথদেবের জন্মদিন। তারই আজ্ঞানুসারে ওই জ্যৈষ্ঠী পূর্ণিমার দিনে তার মঙ্গল অধিবাস পুরঃসর মহাস্নানবিধানানুসারে মহাসমারোহে দিব্য স্নানবেদীর ওপর জগন্নাথদেবের মহাভিষেক পূর্ণ স্নানসেবা সম্পাদন হয়। ইন্দ্রদ্যুম্ন মহারাজ এই বিধানেই জগন্নাথদেবের জন্মতিথি প্রত্যেক জ্যৈষ্ঠী পূর্ণিমায় মহাস্নান যাত্রামহোত্সব করতেন। অথর্ববেদ, ব্রহ্মপুরাণ, নারদপুরাণ, স্কন্ধপুরাণ, কুর্শপুরাণ, পদ্মপুরাণ, ভবিষ্যপুরাণীয়, পুরুষোত্তমমাহাত্ম্য, নীলাদ্রিমহোদয়, উত্কলখণ্ড প্রভৃতি শাস্ত্রগ্রন্থে জগন্নাথদেব ও শ্রীক্ষেত্রের মাহাত্ম্য বিবরণাদিসহ জগন্নাথদেবের প্রাকট্য কাহিনী রয়েছে। জগন্নাথদেবের প্রাকট্য সম্বন্ধে কিংবদন্তি ও শাস্ত্রীয় উক্তি, উভয় বিবরণ পাওয়া যায়। উত্কল ভাষায় রচিত ‘দেউল- তোলা’ নামক উড়িষ্যায় বহুল প্রচারিত একটি কবিতা গ্রন্থ হতে জগন্নাথদেবের প্রাকট্যের ইতিহাস প্রচারিত হয়েছে। ব্রহ্মার প্রথম পরার্ধে চতুর্ব্যুহ-ভগবান নীলমাধবমূর্তিরূপে শঙ্খক্ষেত্র-নীলাচলে পতিত-নীচকে কৃপাবিতরণার্থ অবতীর্ণ হন। উড়িষ্যার অনেক বৈষ্ণব ভক্তকবি জগন্নাথদেবকে বুদ্ধের মূর্তি বা অবতার বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস— কৃষ্ণই বুদ্ধরূপে জগন্নাথদেব হিসেবে অধিষ্ঠিত। জগন্নাথ দাসের ‘দারুব্রহ্ম’ ও অচ্যুতানন্দ দাসের রূপান্তর ‘শূন্য সংহিতা’—য় এই তত্ত্ব স্থান পেয়েছে। শুধু তাই নয়, ঈশ্বর দাস ও অচ্যুতানন্দ জগন্নাথদেবকে বুদ্ধের এবং চৈতন্যদেবকেও বুদ্ধ বলে বর্ণনা করেছেন। অনেকে মনে করেন যে, জগন্নাথদেবের মূর্তি বুদ্ধদেবেরই রূপান্তর। আবার অনেকে মনে করেন যে, জগন্নাথদেব কোনো অনার্য জাতির দেবতা। বিবর্তনের ধারায় হিন্দুদেবতা বিষ্ণু এবং সব শেষে জগন্নাথদেব হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এর পেছনে যুক্তিও রয়েছে— স্কন্দপুরাণে উত্কলখণ্ডে এবং পুরষোত্তমখণ্ডে শবরপতি বিশ্বাসুর ছিলেন নীলগিরি পর্বতে নীলমাধবের পূজারী এবং উপাসক। পরে নীলমাধব সেখান থেকে অন্তর্হিত হয়ে কাঠের তৈরি জগন্নাথদেবের মূর্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। শবরপতি বিশ্বাসুর অনার্য জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বলেই জগন্নাথদেবকে অনার্যদের দেবতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন বৌদ্ধ ত্রিরত্নের মধ্যে সংঘ নারীরূপে বুদ্ধের ও ধর্মের মাঝখানে অবস্থান করায় জগন্নাথদেবের মূর্তি ত্রিরত্নের রূপান্তর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জগন্নাথদেব আদিম অবস্থায় বৌদ্ধ দেবতা ছিলেন অথবা অনার্য দেবতা ছিলেন অথবা শাক্ত দেবতা ভৈরব ছিলেন, সে তত্ত্ব নিছক অনুমানের ব্যাপার। জগন্নাথদেবের মূর্তি বৌদ্ধ দেবতা হলে তিনটি মূর্তির স্বরূপ কী? তিনটি মূর্তি ত্রিরত্ন হলে এঁদের মধ্যে নারীমূর্তি সুভদ্রা এলেন কীভাবে? বুদ্ধদেবের অস্থি বা অন্য কোনো স্মৃতিচিহ্ন জগন্নাথদেবের মূর্তির মধ্যে লুকায়িত আছে কিনা তাও নির্ণয় করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে এ কথা সত্য যে, সূর্য, বিষ্ণুর প্রভাব জগন্নাথদেবের ওপর রয়েছে। কেউ কেউ আবার জগন্নাথদেবকে জৈন দেবতা বলে মনে করেন। তিনি হয়তো আদি তীর্থংকর ঋষভদেব। জগন্নাথদেব ২৩তম তীর্থংকর মহাবীর বা ২৪তম তীর্থংকর পার্শ্বনাথ এ রকমও মনে করা হয়। কালা পাথরের একটি টুকরোকে ‘কলিঙ্গ জিন’ বলা হত। এ থেকেই নাকি নীলমাধবের সূত্রপাত। এমনকি তার বিভিন্ন উত্সবের সঙ্গে জৈন ধর্মের সম্পর্ক আছে। আবার শৈবধর্মের লোক বিশ্বাস করেন শুরুতে জগন্নাথদেব ছিলেন শিব। পরে সেই শিব বিষ্ণুতে রূপান্তরিত হন। জগন্নাথদেব প্রথমে ছিলেন শবর দেবতা। তারপর চতুর্ভুজ নীলমাধব। তারপর হলেন জৈনদেব। ক্রমে বৌদ্ধ, শৈব ও বৈষ্ণবদের উপাস্য। সেই যুগে উড়িষ্যা সাম্রাজ্যের শাসকদের যেমন ধর্মবিশ্বাস জগন্নাথদেবেরও সেই অনুসারে রূপান্তর। এক দেবতা থেকে যেই তিনি অন্য দেবরূপে অর্চিত হচ্ছেন তখনই পূর্ব- পূজার কিছু ছাপ স্বাভাবিকভাবেই এসে যাচ্ছে তার নতুন পূজা পদ্ধতিতে। সে কারণেই জগন্নাথদেবের পূজা পদ্ধতিতে সমস্ত ধর্মের ধর্মবিশ্বাসের মিলন ঘটেছে। কেউ এমন দাবি করতে পারে না যে, জগন্নাথদেব শুধু আমাদের সম্প্রদায়ের দেবতা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে যত দেব-দেবী রয়েছেন তাদের মধ্যে জগন্নাথদেবকেই একমাত্র সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রতীক বলে মনে করা হয়। কীভাবে এ সমন্বয় ঘটল? জগন্নাথদেব, বলভদ্র, সুভদ্রার আকৃতিবিহীন গোলাকৃতি মস্তক এবং জগন্নাথদেব ও বলভদ্রের খুঁটি সদৃশ হাত এসবই বৌদ্ধ ধর্ম থেকে জন্ম নিয়েছে বলে অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা। ভগবান বিষ্ণুর দশাবতারের অন্যতম বুদ্ধদেবকে জগন্নাথদেবের প্রতিরূপ বলে মনে করা হয়। লেখক :সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন