সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ বা ক্লাস্টারভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর বিষয়ে একমত হইয়াছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উপাচার্যবৃন্দ। নূতন এই পদ্ধতি অনুযায়ী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা একই সাথে নেওয়া হইবে। তবে অনুষদভিত্তিক পৃথক পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকিবে। পাশাপাশি, সকল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি, সকল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদালয়ের জন্য একটি এবং সকল প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি করিয়া ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইবে। গত রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় দীর্ঘ প্রত্যাশিত ও বাস্তবসম্মত এই সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়। লক্ষণীয় যে, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও শিক্ষা সচিব ছাড়াও ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উপস্থিত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলিয়াছেন যে, শিক্ষার্থীদের ভর্তি বিড়ম্বনা, ভর্তির জন্য বাড়তি অর্থব্যয় এবং কোচিং সেন্টারগুলির অবাঞ্ছিত প্রভাব হ্রাসের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছে। ধাপে ধাপে এই পদ্ধতি কার্যকর করা হইবে বলিয়া তিনি জানান। সরকারের এই উদ্যোগটি যে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ লাঘবে সহায়ক হইবে—তাহা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। আমরা ইহাকে স্বাগত জানাই।
ভর্তি লইয়া প্রতি বত্সর সদ্য এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কী অপরিসীম ভোগান্তি পোহাইতে হয়—তাহা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যদের পক্ষে অনুধাবন করা কিছুটা কঠিন বৈকি। শিক্ষার্থী শুধু নহে, ঘুম হারাম হইয়া যায় অভিভাবকদেরও। উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার শুরু হয় এইচএসসি পরীক্ষার পরপরই। মূল কারণ তীব্র প্রতিযোগিতা। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই লক্ষ্য থাকে পাবলিক মেডিক্যাল, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কিংবা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ। কিন্তু সেইসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তিচ্ছু উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর তুলনায় আসনসংখ্যা অনেক কম। ফলে শুরু হয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ফরম সংগ্রহের দৌড়ঝাঁপ, কোচিং ইত্যাদি। কিন্তু যথেচ্ছ অর্থ এবং শ্রম ব্যয় করিয়াও স্বস্তি মেলে না। কারণ একটি ভর্তি পরীক্ষা দিয়াই নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়া শিক্ষার্থীদের ছুটিতে হয় অন্য পরীক্ষার জন্য। একই সময়ে বা কাছাকাছি সময়ে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে তাহাদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। তদুপরি, হরতাল ও পরিবহন ধর্মঘটের মতো অনভিপ্রেত পরিস্থিতির আশঙ্কা তো থাকেই। ফলে অনেক কাঠখড় পোড়াইয়াও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না অনেকের পক্ষে। আবার অন্য ধরনের সমস্যাও আছে। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া একজন শিক্ষার্থী একাধিক ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পায় এবং ভর্তিও হয়। পরে সিট খালি হয় ঠিকই কিন্তু ইহার খেসারত দিতে হয় বহু যোগ্য শিক্ষার্থীকে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও। অপচয় হয় সময় ও অর্থের।
সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিতে দীর্ঘদিন যাবত্ সফলভাবে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তিপদ্ধতি প্রচলিত আছে। অতএব, সদিচ্ছা থাকিলে আরও আগেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহে এই পদ্ধতি চালু করা যাইত। আশার কথা হইল, চলতি শিক্ষাবর্ষে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ্ধতিটি কার্যকর করা সম্ভব না হইলেও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় একটিমাত্র ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানে সম্মত হইয়াছে। যতো দ্রুত সম্ভব অন্য প্রতিষ্ঠানগুলিরও আগাইয়া আসা উচিত বলিয়া আমরা মনে করি। কারণ শুভ কাজে বিলম্ব করিতে নাই। তবে এই ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতাও যে আছে—তাহাও সত্য। জানা যায়, এই প্রস্তাবের সাথে নীতিগতভাবে একমত হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক ভর্তিপদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে। আবার নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় কমিয়া যাইবার আশঙ্কাও ব্যক্ত করিয়াছেন কেহ কেহ। এই ধরনের আরও সমস্যা থাকিতে পারে। তবে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর দুর্ভোগের ব্যাপকতার তুলনায় এইসব সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতাকে বড়ো করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই।
