স্মরণ

শামসুদ্দীন মোল্লা

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৩, ২১:৫০
আজ শামসুদ্দীন মোল্লার মৃত্যুবার্ষিকী। একজন প্রগতিশীল এবং মানবদরদী মহত্প্রাণ ব্যক্তি হিসেবে তিনি সর্বজনের নিকট ছিলেন পরম শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবাল্য সহচর। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালে সেই গত শতকের চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী উপধারার রাজনীতিতে তিনি সম্পৃক্ত হন। বঙ্গবন্ধুও ঐ উপধারার অন্যতম প্রধান কুশীলব হিসেবে বাঙলার রাজনৈতিক অঙ্গনে সদম্ভে বিরাজ করছিলেন তখন। এডভোকেট শামসুদ্দীন মোল্লা বিভাগোত্তরকালে ঢাকায় আইন বিষয়ে অধ্যয়ন শেষে ফরিদপুরে গিয়ে আইন ব্যবসা শুরু করেন। একই সঙ্গে রাজনীতিতেও তিনি সম্পৃক্ত থাকেন গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন এবং তত্পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৪৯-এ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এবং পরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীনে দলটিকে গড়ে তোলার ব্যাপারে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। এতদঞ্চলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ঘটাতে তার বিশেষ অবদানের কথা ফরিদপুরবাসী এবং দেশবাসী বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তিনি একাধিকবার ফরিদপুর বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন, এবং ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের ফরিদপুরস্থ নিজস্ব সংবাদদাতা। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির সভাপতি, বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, ফরিদপুরের গভর্নর এবং আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি, জেলা সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। শামসুদ্দীন মোল্লা আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের সারথী হিসেবে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম ঐ জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাকায় গণমিছিলের নেতৃত্ব দেন, বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যাকাণ্ডের শিকার ৪ জাতীয় নেতার রুহের মাগফেরাত্ কামনা করে গায়েবানা জানাজা এবং প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অসম সাহসি ভূমিকা পালন করেন। পঁচাত্তর পরবর্তীকালে যখন অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতা ভোল পাল্টান এবং অনেকেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন তখনও শামসুদ্দীন মোল্লা কিন্তু তাঁর করণীয় কর্তব্য বিস্মৃত হননি। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতিহাসের ঐ জঘন্য সব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার চৌধুরী, রওশন আলী, একলাখ উদ্দিন আহমদ, সাজেদা চৌধুরী, রাশেদ মোশাররফ, এসএম ইউসুফ, ইসমত কাদির গামা এবং মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখকে নিয়ে যে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেন তা যে তাকে ইতিহাসে প্রাতঃস্মরণীয় করে রাখবে এতে কোন ভুল নেই। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর মধ্যকার বন্ধুত্বের গভীরতা ছিল সুবিদিত। ৬ দফাকে সারা দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ৭০-এর নির্বাচনে ভাঙ্গা সদরপুর ও চরভদ্রাসন অঞ্চল থেকে বিপুল ভোটাধিক্যে এমএলএ নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭৩-এর নির্বাচনেও তিনি এমপি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর বেশ কিছুকাল তিনি বাকশালের অন্যতম সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক পর্যায়ে তাকে দেশত্যাগ করতে হয়। শামসুদ্দীন মোল্লাদের মতো আত্মত্যাগী, আদর্শবাদী, ন্যায়-নীতিনিষ্ঠ, সাহসী এবং প্রত্যয়ী মানুষরা ষাট ও সত্তুরের দশকের রাজনীতিতে ছিলেন বলেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশ সেদিন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। বিভিন্ন জেলায় তখন এমন ধারার নেতা বঙ্গবন্ধু তৈরি করেছিলেন যারা দেশ ও জাতির কল্যাণে সর্বস্ব ত্যাগে কখনই পরাঙ্মুখ ছিলেন না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই যে, শামসুদ্দীন মোল্লার এত ত্যাগ-তিতিক্ষার পরও রাষ্ট্রের কাছ থেকেও আজও প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি পাননি। এক্ষেত্রে সংকীর্ণ দলীয় ও মতলবী স্বার্থের বলি হয়েছেন শামসুদ্দীন মোল্লাসহ অন্য আরও অনেক নেতা, যাদের অবদানে বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে। লেখক :সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন