পোশাক কারখানার কর্ম পরিবেশ

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৩, ২১:৩১
দেশে পোশাক কারখানার সংখ্যা কত? সরকারি হিসাবে সারা দেশে অনুমোদিত কারখানার সংখ্যা ২৮ হাজার। কেবল ঢাকা শহরেই এইরূপ ফ্যাক্টরির সংখ্যা ১৭ হাজার। অন্য এক পরিসংখ্যান হইতে জানা যায় সারা দেশে অননুমোদিত পোশাক কারখানা রহিয়াছে ২ লাখ ৪১ হাজার। তাও এই হিসাব ২০০১ সালের। এক যুগের ব্যবধানে আরও বাড়িয়াছে বৈ কমিবার তেমন কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নাই। অন্যদিকে, কলকারখানা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের জন্য একটি সরকারি সংস্থা রহিয়াছে। উহার গালভরা নাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর। কিন্তু বিপুল সংখ্যক কারখানা পরিদর্শনের জন্য ইনস্পেক্টর আছেন মাত্র ৩৯ জন। গার্মেন্টস কারখানা ও পরিদর্শকের সংখ্যার আনুপাতিক হিসাবে দেখা যায় একজন পরির্শক বছরে ৭১৭ টিরও বেশি কারখানা পরিদর্শন করিলে প্রতিটি কারখানায় একবার করিয়া যাওয়া হইবে, বাস্তবে যাহা অসম্ভব। অন্যদিকে অননুমোদিত কারখানাসমূহ পরিদর্শনের কোনো প্রশ্নই উঠে না। তদুপরি পরিদর্শন পরিদপ্তরের পরিদর্শনের জন্য আলাদা কোনো পরিবহন নাই। এমতাবস্থায় পোশাক কারখানাসমূহ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চলিতেছে ফ্রি স্টাইলে। এই সেক্টরে বিদ্যমান পরিস্থিতি কতখানি অপ্রীতিকর হইয়া উঠিয়াছে, তাহা এখন আর কাহাকেও চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইবার প্রয়োজন পড়ে না। অনুকূল কর্মপরিবেশের অভাব বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বিদেশী ক্রেতাদেরও বীতশ্রদ্ধ করিয়া তুলিয়াছে। গার্মেন্টস সেক্টরে ঘটিয়া যাওয়া একের পর এক দুর্ঘটনা এবং শতশত কর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদে দেশ ও বিদেশের বিবেকবান মানুষমাত্রই বিচলিত ও বিক্ষুব্ধ। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের তৈরি পোশাকের দুই বৃহত্ ক্রেতা আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক আগে হইতেই চাপ দিয়া আসিতেছিল। দেশের ভিতরে গার্মেন্টস শ্রমিকরাও নিয়মিত বেতন-ভাতা ও সুষ্ঠু কর্মপরিবেশের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করিয়া যাইতেছেন। কিন্তু তাহাতে কোনোই ফলোদয় হয় নাই। গার্মেন্টস মালিকদের খুব কমসংখ্যকই পরামর্শ কিংবা সমালোচনার পরোয়া করিয়াছেন। ফলে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা দুর্ঘটনায় মেহনতি গার্মেন্টস কর্মীদের মৃত্যুর মিছিলই কেবল দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইয়াছে। তাজরিন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরও আগুন লাগিবার বহু ঘটনা ঘটিয়াছে। সাভারের রানা প্লাজা ধসিয়া মৃত্যুময় মানবিক বিপর্যয় ঘটিয়া যাইবার পর বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিরাজমান পরিস্থিতি সম্পর্কে যে বার্তাটি পৌঁছে, তাহা এই সেক্টরকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না। এই দেশে তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মীদের সঙ্গে ক্রীতদাসের মত আচরণ করা হয় বলিয়া মন্তব্য করা হইয়াছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের জন্য দেওয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করিয়াছে। এই দিকে ইইউ জিএসপি সুবিধা স্থগিত না করিলেও গার্মেন্টসে কর্মপরিবেশ সম্পর্কে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিয়াছে। সমপ্রতি জেনেভায় অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হইতে বাংলাদেশকে কড়া বার্তা দেওয়া হইয়াছে। সেই বৈঠকে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও পোশাক খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাব্লিও মজীনা সেই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। আইএলওর মহাপরিচালক আই রাইডারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কারখানা পরিদর্শকের সংখ্যা ডিসেম্বরের মধ্যে ২০০-তে উন্নীত করার কথা বলা হয়। ইইউ এই আশাবাদও ব্যক্ত করে যে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করিবার অধিকারসহ শীঘ্রই সংশোধিত শ্রম আইন পাস হইবে। গার্মেন্টস শিল্প আমাদের রফতানি আয়ের সবচাইতে বড় খাত। এই খাতের বিরাজমান সব অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটুক, ইহাই প্রত্যাশিত। মেহনতি কর্মীদের বঞ্চনার অবসান ঘটাইয়া কাজের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা আশু কর্তব্য। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার যাহাতে আরও সংকুচিত হইয়া না যায় এবং হারানো সুবিধা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে কালক্ষেপণ করা উচিত হইবে না কিছুতেই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন