কোটা নয়, মেধাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৩, ২১:৩২
সম্প্রতি ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এবারই প্রথমবারের মত প্রিলিমিনারিতে কোটার আনুপাতিক হারের ভিত্তিতে ওই ফলাফলে উত্তীর্ণ-অনুত্তীর্ণ নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এই ধরনের ফলাফল প্রকাশের প্রেক্ষিতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়েছে। কারণ তাদের চেয়ে কম নম্বর পেয়েও শুধুমাত্র কোটা থাকার কারণে অনেকে উত্তীর্ণ হয়েছেন। আর কোটাধারীদের চেয়েও বেশি নম্বর পেয়েও তারা সাফল্যের হাসি হাসতে পারছেন না। যদিও পিএসসি শিক্ষার্থীদের ওই অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে বলছে যে, প্রিলিমিনারি থেকে এবার কোটা ঠিক করা হলেও মেধাবীরা কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। পিএসসি মেধাবীদের ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ার কারণ হিসেবে বলছে যে, কাট নম্বর (একটি নির্দিষ্ট নম্বর যার বেশি পেলে লিখিত পরীক্ষার জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়) সবার একই রাখা হয়েছে। আমার কাছে, পিএসসি’র এমন যুক্তিকে বেশ হাস্যকর মনে হয়েছে। কারণ এতে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। ঠিক কত নম্বরকে কাট নম্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, সে বিষয়টি পিএসসি না বললেও আমরা ধরে নেই যে, ৬০ নম্বরকে কাট নম্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাহলে হিসাবটি যদি এমন হত যে, ৬০ নম্বরের ওপর প্রাপ্ত কোটাধারী ও মেধাবী সবাইকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে; তবে সেটি যথার্থ মেধার মূল্যায়ন হত। কিন্তু সদ্য প্রকাশিত ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার ফলাফলে সে কাজটি করা হয়নি বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ থেকে অনুমান করা যায়। সেখানে ৬০ নম্বরের ওপর প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে কোটার আনুপাতিক হারই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ-অনুত্তীর্ণ হওয়ার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, একজন ৭৫ নম্বর পেয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। আবার শুধুমাত্র কোটা থাকার কারণে একজন ৬০ নম্বর পেয়েও উত্তীর্ণ হয়েছে। তাহলে পিএসসি যে যুক্তি দেখাচ্ছে যে, মেধার মূল্যায়ন করা হয়েছে, তা কী আদৌও সত্য? তবে এটুকু ত্যাগ বাঙালিরা স্বীকার করতে কখনো আপত্তি করেনি। তারা বছরের পর বছর কোটা পদ্ধতির নাগপাশে বন্দী থাকলেও মুখ ফুটে উচ্চারণ করেনি যে, কোটা পদ্ধতি বাতিল করতে হবে; যাতে এই দাবিতে কোনভাবে যেন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানহানি না ঘটে। স্বাধীনতাপরবর্তী তরুণ প্রজন্মের এই আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তবে তাদের এই আত্মত্যাগ যদি কোটা পদ্ধতির উদ্দেশ্য (অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সরকারি চাকরিতে সুযোগ দান) যথাযথ পূরণ করত, তবে তাতেই তারা সান্ত্বনা খুঁজে নিত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথাই বলছে, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা সুখে-শান্তিতে জীবন-যাপনের বদলে কষ্টই তাদের নিত্যসঙ্গী। প্রকৃতপক্ষে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এর দ্বারা উপকৃত হচ্ছে না। বরং কিছু ধান্ধাবাজ যারা টাকার বিনিময়ে, রাজনৈতিক বিবেচনায় অথবা অন্যকোনভাবে সার্টিফিকেট লাভ করেছে, তারাই এর সুবিধা ভোগ করছে। অন্যদিকে, নারী, প্রতিবন্ধী ও উপজাতিদের জন্য যে কোটা পদ্ধতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তাও তাদের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নারীরা আজ পুরুষের চেয়ে নানাদিকে এগিয়ে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা পরীক্ষায় তারা ছেলেদেরকে টপকিয়ে শীর্ষ স্থান অধিকার করছেন। বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার কৃতিত্বও তাদের রয়েছে। তাই অনগ্রসর শেণি হিসেবে বিবেচনা করে তাদের জন্য বিশেষ কোটার যৌক্তিকতা এখন আর নেই। আর নারীদের জন্য কোটা পদ্ধতির বিরোধিতায় নারীদের এগিয়ে আসা উচিত। কারণ কোটা পদ্ধতি রেখে প্রকৃতপক্ষে তারা যে পুরুষের তুলনায় কম যোগ্য সে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে; যা তাদের জন্য মর্যাদাহানিকরও বটে। সম্প্রতি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি নির্বাচনে দেখেছি যে, আমার অনেক নারী সহকর্মীরা তাদের জন্য আলাদা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট প্রদানের বিরোধিতা করেছেন। তারা পুরুষ সহকর্মীদের মত একই লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়াই তাদের জন্য মর্যাদার বলে মন্তব্য করেছেন। পরিশেষে, উত্তর আধুনিক বাংলাদেশে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিকতা নিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। বর্তমানে মেধার চেয়ে কোটায় বেশি নিয়োগের যে পদ্ধতি আছে তা সংস্কার করা সময়ের দাবি বলে মনে হয়। অনগ্রসর জনগোষ্ঠিকে ভিন্নভাবে সহযোগিতা করা যেতে পারে। তারা যাতে মেধাবীদের সাথে সমান প্রতিযোগিতা করে সরকারি চাকরিতে উত্তীর্ণ হতে পারে সেভাবে গড়ে তুলতে নানা স্কিমের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। মুক্তিযোদ্ধাদের ও তাদের পরিবারের সচ্ছলতার জন্য তাদের ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ, নারী ও উপজাতিদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে উক্ত এলাকায় আধুনিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপন, অধিকসংখ্যক বৃত্তির ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে সরকার উদ্যোগী হতে পারে। কিন্তু কোটার নামে অযোগ্য, কম মেধাবীসম্পন্নদের সরকারি চাকরিতে অধিক সুযোগ বৃদ্ধি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর এই ধরনের পদক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে অন্তরায়ও বটে।  লেখক : শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন