অক্ষরজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে মানুষ জ্ঞানরাজ্যের যে কোন শাখায় বিচরণ করতে পারে। অর্থাত্ শিক্ষিতরাই পারে জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধি করতে। তাদের দীর্ঘকালের সাধনা পরীক্ষা- নিরীক্ষার মাধ্যমে বিপ্লব কিছু ঘটিয়ে দিতে পারে। নিরক্ষর মানুষরা তাদের চিন্তাশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে না। সাহিত্যের বেলায় অন্যরকম কিছু ঘটতে পারে। সাহিত্যের সূচনাতো মনে। মানুষ যা বোঝে ও কাজে লাগাতে চায় তারই বহিঃপ্রকাশই সাহিত্য।
আমাদের সাহিত্য দুটি ধারায় প্রবাহিত। একটি গ্রামীণ সাহিত্য, অন্যটি শহুরে সাহিত্য। শহরের সুখ-দুঃখ, নগরের ভয়াবহতা,আনন্দ, ক্ষোভ ইত্যাদি নিয়ে রচিত হয় শহুরে সাহিত্য। আর পল্লীগ্রামে যে সাহিত্য প্রচলিত তা গ্রামীণ সাহিত্য। শহুরে সাহিত্যের বিশাল অংশ এখনো আমাদের অগোচরেই রয়ে গেছে। যত না লিখিত জ্ঞানের ভাণ্ডার আছে তার চেয়ে বেশি অলিখিত জ্ঞান আছে মানুষের মুখে মুখে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি পল্লীসাহিত্যের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন তার ‘পল্লী সাহিত্য’প্রবন্ধে। তিনি এ সাহিত্যকে আখ্যায়িত করেছেন শ্রমজীবী মানুষের সাহিত্য হিসেবে। পল্লী অঞ্চলে এ সাহিত্যের জন্ম। শহীদুল্লাহর কথায় ‘পল্লীর মাঠে-ঘাটে, পল্লীর আলো-বাতাসে, পল্লীর প্রত্যেক পরতে-পরতে সাহিত্য ছড়িয়ে আছে। কিন্তু বাতাসের মধ্যে বাস করে যেমন আমরা ভুলে যাই বায়ু সাগরে আমরা ডুবে আছ তেমনি পাড়া গাঁয়ে থেকে আমাদের মনে হয় না যে কত বড় সাহিত্যের উপকরণ ছড়িয়ে আছে’।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চোখে আগুল দিয়ে দেখিয়েছেন আমাদের মূল্যবান উপকরণগুলো। দীনেশ চন্দ্র সেনের সংগ্রহ ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ প্রমাণ করে আমাদের সাহিত্যে কত বড় অমূল্য খনি লুকিয়ে আছে পল্লীতে। তিনি আরও বলেছেন, এরূপ সাহিত্য অনেক আছে যা ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র মতো সংগৃহীত হ্য়নি; কোন গবেষকের চোখের দৃষ্টি পড়েনি সেদিকে। পল্লীসাহিত্যের আর একটি উপাদান প্রচলিত গল্প। বহুকাল থেকে শুধুমাত্র নানী-দাদীদের মুখে প্রচলিত এ গল্প। গল্প বলার ঢঙে শিশুমন উপাদেয় কিছু খুঁজে পেয়ে হয় চমত্কৃত ও মুগ্ধ। এ গল্প বলার একটা আর্ট আছে। এ গল্পগুলোর আকর্ষণের কমতি নেই বর্তমান ইলেক্ট্রিক মিডিয়ার যুগেও। আর তাই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ গল্পগুলো সংগ্রহের ওপর জোর দিয়েছেন। এসব গল্পের বিশ্বকোষ হতে পারে বলে তার ‘পল্লীসাহিত্য’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন। এর পরে আসে প্রবাদের কথা, যা পল্লীর জনজীবনকে নিয়ে যায় মধুর উপস্থাপনায়। এসবও পল্লীর রমণীদের মুখে মুখে। প্রচলিত ছোট্ট একটা প্রবাদ জীবনের একেকটা দিকনির্দেশনা দেয়। ড.শহীদুল্লাহ ব্যবহূত দুটি প্রবাদ নিম্নরূপঃ
“দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা নেই” এবং “ধরি মাছ না ছুঁই পানি”।
উপমহাদেশের ভাষাবিদ পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পল্লী সাহিত্যের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পল্লী উপকরণগুলো সংগ্রহের। পল্লীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পল্লীসাহিত্যের উপকরণগুলো জড়ো করা গেলে এগুলো ‘ঠাকুমার ঝুলি’র মত হতে পারে অথবা পারে বিশ্বকোষ হতে। আমাদের এই অমূল্য সম্পদ শুধু নিজেরাই উপভোগ করবো তা হয় না। সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে এর খ্যাতি। ময়মনসিংহ গীতিকার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সুদূর পশ্চিমের সাহিত্য রসিক রোমারোলা পর্যন্ত ময়মনসিংহের মদিনা বিবির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন’। আর শুধু শহুরে সাহিত্য নয় পল্লী কবি-সাহিত্যিকদেরও শহরের জনসমাবেশে পরিচিত করার সুযোগ এনে দিতে হবে। লেখকের ভাষায়, ‘মনসুর বয়াতির মত আর কত পল্লীকবি শহুরে চক্ষুর অগোচরে পল্লীতে আত্মগোপন করে আছেন; একটা মহত্ কর্তব্য এঁদের খুঁজে বের করা’।
লেখক :কথাসাহিত্যিক
