সরকারের সাড়ে চার বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকার সমর্থিতদের ভরাডুবি এবং বিরোধী দল সমর্থিতদের জয়জয়কার। স্থানীয় নির্বাচন হলেও আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পূর্ব কাছাকাছি দূরত্ব সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় নির্বাচনী ফলাফলে ভিন্ন মাত্রা লক্ষণীয়। উল্লেখ্য যে, ২০০৮ সালে চার সিটির নির্বাচনে (রাজশাহী, সিলেট, খুলনা এবং বরিশাল) মহাজোট সমর্থিতদের বিজয়ের কয়েক মাস পরেই নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের মহাবিজয় ঘটে। এ বিবেচনাতেও এবারের পাঁচ সিটির নির্বাচনও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক ফলাফল নির্ধারণে প্রভাব সৃষ্টি করবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এছাড়াও সদ্য অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু এমন প্রভাব সৃষ্টি করেছে যে, বর্তমানে স্থানীয় নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে তালা, আনারস, দোয়াত-কলম এবং টেলিভিশন মার্কায় নির্বাচন না হয়ে নৌকা, ধানের শীষ, লাঙল কিংবা দাঁড়িপাল্লার ভোট হলেও ফলাফলে খুব বেশি পার্থক্য হতো না বলেই স্পষ্টত প্রতীয়মান হচ্ছে। কাজেই এ নির্বাচনগুলো যে জাতীয় রাজনীতিকেই মঞ্চস্থ করেছে তা আমরা খুব সহজেই বুঝতে পেরেছি। সরকার সমর্থিতদের এমন একচেটিয়া পরাজয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত বহন করছে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবে এক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন আমাদের সবার মনেই নাড়া দেয় যে, কেন সরকার সমর্থিতদের ঢালাও পরাজয় আর কেনইবা বিরাধী দল সমর্থিতদের জয়জয়কার। এটা কি বিরোধী দলের প্রতি জনগণের আস্থার ফল, নাকি সরকারের প্রতি অনাস্থার ফল। এমন ফলাফলে সরকারের প্রতি জনগণের নেতিবাচক গণভোটেরই নমুনা বহন করছে।
বিগত নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের মহাবিজয়ে সরকারের নিকট জনগণের প্রবল প্রত্যাশা সিটি নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ফলের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। গত বেশ কিছুদিন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি ও টকশোতে সিভিল সমাজের আলোচনা-সমালোচনা এবং আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের পরাজয় এবং বিএনপি-জামায়াত সমর্থিতদের জয়ে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ প্রতীয়মান হয়। সেগুলোর মধ্যে শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি ও হলমার্ক কেলেঙ্কারি, নোবেল বিজয়ী গ্রামীণ ব্যাংক ও ইউনূস বিতর্ক, ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে বাড়াবাড়িসহ ছাত্রলীগ-যুবলীগের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াই অন্যতম। এছাড়াও স্থানীয় নির্বাচন হলেও জাতীয় অনেক চাওয়া-পাওয়ার ইস্যুতে নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার পরিচয়ে এবং বিগত সরকারগুলোর পারফরম্যান্সের তুলনামূলক বিবেচনায় এমন ফলাফলে শুধু সাধারণ জনগণই নয়, আমার ধারণা স্বয়ং বিরোধী দলই হতবাক হয়েছে। সরকারের অনেক ব্যর্থতার পরেও যথেষ্ট পরিমাণে সফলতা রয়েছে, যা বিগত বিভিন্ন সরকারের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়। তবে এমন জয়-পরাজয় থেকেই সরকারের ও বিরোধী দলের আগামী পথ চলার সুনির্দিষ্ট নীতি নির্ধাণেরও এখনই সময়। সরকার তথা আওয়ামী লীগের সামনে অস্তিত্বের লড়াইয়ের খুব শক্ত চ্যালেঞ্জ দৃশ্যমান।
পাঁচ সিটির নির্বাচন (রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, খুলনা এবং গাজীপুর) যেহেতু বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সেহেতু সরকার এখন জোরালোভাবেই বলার সুযোগ পাবে যে, আগামী সাধারণ নির্বাচনও দলীয় সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু হবে। ইতিমধ্যেই এ কথার নজিরও পাওয়া গেছে। অর্থাত্ বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে অযৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করবে সরকার । তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিটি নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসবে না। এ নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির ইস্যু যে ওতপ্রতোভাবে জড়িত তা অনুমান করতে কারো বাকি নেই।
তবে বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হলো, আর তাহলো সরকারের অধীনে সরকারি প্রভাবমুক্ত শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন। তবে নির্বাচনের ফলাফল উল্টো হলে বিরোধী দল কারচুপির অভিযোগ আনতো এটা মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। গত ১৫ জুন চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে বাজেট বক্তৃতায় সরকারকে উদ্দেশ করে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে হাস্যকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছেন। আর তার এই বক্তব্য প্রমাণ করেছে নির্বাচনে পরাজিত হলে বিরোধী দল কোনোভাবেই ফলাফল মেনে নিত না। বাংলাদেশে নির্বাচনী গণতন্ত্রের ইতিহাসে সরকারের প্রভাবমুক্ত অবাধ গ্রহণযোগ্য স্থানীয় নির্বাচন আগামী গণতন্ত্রের মাইলফলক হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক নির্দলীয় সরকারের ইস্যুটি রাজনৈতিক মাঠকে ভিন্ন মাত্রায় প্রবাহিত করবে কিনা সে বিষয়ে নতুন করে চিন্তার সুযোগ হয়েছে। গাজীপুর নির্বাচনের ফলাফলের সাথে সাথে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রশ্নটি রাজনীতির মাঠকে উত্তপ্ত করে তুলবে সেটাও মোটামুটিভাবে দৃশ্যমান। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াবে নির্দলীয় সরকার ইস্যু এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার প্রশ্ন। অপরদিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পাঁচ সিটি কর্পোরেশনের পরাজয় নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নটি ইতিমধ্যেই সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আগামী সংসদ নির্বাচনে কোন দল বা জোট ক্ষমতায় আসবে তা এখনি নিশ্চিত করে বলা না গেলেও পাঁচ সিটি নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাবে জনসাধারণের মধ্যে একটি অভিন্ন চিন্তার সৃষ্টি হয়েছে। সেটি হলো অনিশ্চিত হলেও আগামী দশম সংসদ নির্বাচনে ১৮ দলীয় জোটের ক্ষমতায় যাওয়া।
সাধারণত নির্বাচনের মাধ্যমে বা বৈধ উপায়ে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করে। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম হয় না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগের কাছে পরিষ্কার হলো যে, সরকারের জনপ্রিয়তার মাত্রা নেমে এসেছে অনেক নিচে; সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের জন্য ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করা পরিস্থিতি বিবেচনায় কঠিন বটে। এক্ষেত্রে বিএনপিকেও বুঝতে হবে যে, তাদের এই জয়জয়কার নিজেদের জনপ্রিয়তার কারণে নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস অথবা সরকারের প্রতি জনগণের নেতিবাচক ভোট।
বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনর্বহালের ইস্যুতে রমজান-পরবর্তী হার্ডলাইনে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সব সময়ের জন্য রাজনীতির মাঠে উত্তাপ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় বেশিরভাগ নেতা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে বন্দী। ইতিমধ্যেই অনেকেরই বিচারের রায় ঘোষিত হয়েছে। বিচার কাজকে বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের কৌশল ও অপকৌশল গ্রহণ করার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে জামায়াত ।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, কোনোভাবেই প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অংশগ্রহণ ব্যতীত একটি সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। আর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা না হলে দেশে আরো সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে চাইলে এবং দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে চাইলে উভয় দলকেই আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে হবে। তবে এ পর্যন্ত যতটুকু উপলব্ধি করা যায় কোনো অজুহাতেই এ মুহূর্তে সরকারি কিংবা বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি গোঁড়ামি দেখানো উচিত হবে না। বর্তমানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচনী ধারায় দেশবাসী গণতান্ত্রিক ঘ্রাণ পেতে শুরু করেছে। এমনকি ঈদের পর নির্দলীয় সরকার ইস্যু নিয়ে রাজনীতির মাঠে উত্তেজনার সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে । তবে সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে দেশে রাজনৈতিক সংকটের আতঙ্ক থাকলেও এ মুহূর্তে সরকারি দল কিংবা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করা জরুরি। সেক্ষেত্রে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য রূপরেখা হলে সরকার কিংবা বিরোধী দলকে মেনে নেয়া উচিত। কারণ ক্ষমতায় কে অধিষ্ঠিত হবে আর না হবে তা নির্ধারণ করার মালিক জনগণ। বর্তমান সময়ে মিডিয়ার স্বচ্ছ তত্পরতার প্রভাবে ও জনসচেতনতার কারণে কোনোভাবেই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে কিংবা ভোট চুরি করে ক্ষমতায় যাওয়া অসম্ভব। কাজেই কোনো অজুহাতেই বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জন এবং দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগে পা না রেখে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় বড় দলেরই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, দেশে উদ্ভূত সংঘাতময় পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের প্রতি হুমকিস্বরূপ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশের যেন সৃষ্টি না হয়।
সবশেষে এ কথা বলা যায় যে, দলীয় সরকারের অধীনে স্থানীয় পর্যায়ে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং সরকারের প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের ফলে গণতন্ত্রের যে শুভ সূচনা সৃষ্টি হয়েছে তার ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে গণতন্ত্রের জয় নিশ্চিত হবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
Email: [email protected]
