গাজীপুর নির্বাচন যে শিক্ষা দিয়ে গেল

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৩, ২১:৫১
সদ্য সমাপ্ত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থীকে প্রায় এক লক্ষ ছয় হাজার ভোটে হারিয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর বিজয় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটা সার্বিক চিত্র তুলে ধরেছে। আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়া প্রার্থী আজমত উল্লাহ খান অত্যন্ত ক্লিন ইমেজের একজন নেতা। তিনি প্রায় গত ১৮ বছর ধরে ওই এলাকার জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি। তারপরও বিএনপি নেতা অধ্যাপক আবদুল মান্নানের কাছে তার শোচনীয় পরাজয় আসলে আওয়ামী লীগেরই পরাজয় হিসেবে এখন বিবেচিত হচ্ছে। স্থানীয় জনগণের কল্যাণ আর সুখ-দুঃখের ভাগীদার হওয়ার মতো প্রতিনিধিত্বশীল এমন নির্বাচনে সাধারণত প্রার্থীর গুণাবলী এবং অতীতের কর্মকাণ্ড ও জনসেবাই ভোটাররা বিবেচনা করে থাকেন। গাজীপুরের নির্বাচনে তা বিবেচিত হয়েছে বলা যাবে না। তা হলে আজমত উল্লাহ খান পরাজিত হলেও এত বিপুল ভোটের ব্যবধান হওয়ার কোনো যুক্তি নাই। এই ব্যবধান থেকে এই সত্যই বেরিয়ে এসেছে যে, আসলে স্থানীয় নির্বাচন হলেও এই নির্বাচনে জাতীয় ইস্যুগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। স্থানীয় উন্নয়নের বিষয়গুলো যদি বিবেচিত হতো তাহলে আজমত উল্লাহ খানের এই শোচনীয় হার হবার কথা নয়। কারণ তিনি তিন তিনবারই টঙ্গীর পৌর মেয়র হিসেবে অনেক উন্নয়ন কাজ করেছেন। দুর্নীতিমুক্ত, সত্ এবং গণসংযোগের সুনাম ছিল তার। তারপরও এত বড় হার দেখে সংবাদপত্র, টেলিভিশনে সংবাদ ভাষ্যকাররা বলেছেন, আজমত উল্লাহ খান হারেননি, হেরেছে আওয়ামী লীগ। ভোটাররা স্থানীয় উন্নয়ন এবং প্রার্থী বিবেচনা করেননি। তারা বিবেচনা করেছেন আওয়ামী লীগ-বিএনপি। এর অবশ্য যৌক্তিক কারণও আছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা যেমন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো করে প্রচার চালিয়েছেন তাদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও তাই করেছেন। সুতরাং স্থানীয় নির্বাচন হয়েও এই নির্বাচন গুরুত্ব পেয়েছে জাতীয় নির্বাচনের। আওয়ামী লীগ সমর্থিত আজমত উল্লাহর পরাজয় এবং বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক মান্নানের বিপুল বিজয় আসলে প্রার্থীকে ভোট দেয়া নয়, আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান ও বিএনপিকে গ্রহণ বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে। এর অবশ্য নানা কারণ আছে। সেই কারণগুলো ইতিমধ্যে আলোচনায় এসেছে। সংক্ষেপে সেদিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। গোপালগঞ্জের পরে গাজীপুরই হচ্ছে সারাদেশের মধ্যে আওয়ামী লীগের শক্ত দুর্গ। সেই দুর্গের এভাবে পতন হতে পারে তা আওয়ামী লীগ সমর্থকরা নয়, অনেকেই ভাবেননি। ওই আসনে সব সময় বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এমনকি চারদলীয় জোট যখন নিরংকুশ আসনে বিজয়ী হয়েছে তখনো গাজীপুরে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। কিন্তু এবার যে ব্যতিক্রম ঘটল, কেন? এ ব্যাপারে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মূল্যায়নই যথোপযুক্ত উক্তি। তিনি বলেছেন, জনগণ কী কারণে আমাদের গাজীপুরে ভোট দেয়নি তা অনুসন্ধান ও বিচার-বিশ্লেষণ করে ভুলগুলো সংশোধন করা হবে। তিনি আরও বলেছেন, দশটি ভালো কাজ একটি মন্দ কাজই ম্লান করে দিতে পারে। আস্থা হারালে জনগণ যে কোনও দুর্গই ভেঙ্গে দিতে পারে। অপ্রিয় হলেও কথাগুলো নির্মম সত্য বলেছেন আওয়ামী লীগের এই প্রেসিডিয়াম সদস্য। জনগণ আস্থা হারানোর মতো অনেকগুলো কাজ করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের গত প্রায় সাড়ে চার বছরে কৃষিতে উন্নয়ন, বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও শিক্ষাক্ষেত্রে বিপুল সাফল্যসহ অনেক অর্জন আছে, যা প্রশংসনীয়। এমনকি বাজারও তুলনামূলক স্থিতি রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো। বিদেশে কর্মসংস্থানসহ অনেক অর্জন আছে। কিন্তু ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাস ও টেন্ডারবাজির নৈরাজ্য অনেক বড় অর্জন ম্লান করে দিয়েছে। সরকার ও দল এই অঙ্গ সংগঠনকে সামাল দিতে পারেনি অথবা চায়নি। শুধু ছাত্রলীগ-যুবলীগ নয়, পদ্মা সেতুর মতো একটা বিশাল আশা-ভরসার স্থাপনা সরকার করতে পারেনি। জনগণ হতাশ। সৈয়দ আবুল হোসেনের মতো একজন মন্ত্রীকে কেন রক্ষা করতে গিয়ে সরকার বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে এমন বিরোধ বাধানো যে, পদ্মা সেতুর ঋণদান চুক্তি থেকেই ব্যাংকটি সরে দাঁড়াল দুর্নীতি পরিকল্পনার মতো অভিযোগে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক গ্রুপের সোনালী ব্যাংকের টাকা লুটপাটসহ যেসব দুর্নীতির জন্য সরকারের এত দুর্নাম হয়েছে সেসব দুর্নাম সাধারণ ভোটাররা বিবেচনায় নিয়েছে। মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের কতজন মারা গেছে তা সরকার প্রমাণ করতে পারেনি। করা উচিত ছিল। তা যথাযথ তদন্ত না করায় যে অপপ্রচার বা প্রচার চালু হয়ে গেছে গ্রামেগঞ্জে, তাতে অনেক ভোট নষ্ট হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। ‘আড়াই-তিন হাজার আলেম ও তালবে আলেম মেরে ফেলেছে আইন-শৃংখলা বাহিনী’ এই গুঞ্জন যারা ছড়িয়ে দিয়েছে, তারা সফল হতে পেরেছে। সরকার তথ্য প্রচারে ব্যর্থ হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক এবং ড. ইউনূস ইস্যুতে সরকার যে বিরোধ বাধিয়েছে, তা কি জরুরি ছিল? এই নোবেল বিজয়ীর ইমেজ উল্টো ব্যবহার করতে পারতো। গ্রামীণ ব্যাংকের হাজার হাজার ঋণ গ্রহীতা-কর্মী সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এসব নানা কারণে স্থানীয় নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনের গুরুত্ব পেয়ে ভোট হয়েছে প্রার্থীর মধ্যে নয়, বড় দুইটি দলের মধ্যেই, যা আওয়ামী লীগের জন্য বিপর্যয় বয়ে এনেছে। বিএনপি, জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোটকেও মনে রাখতে হবে এ ভোট তাদের প্রতি ভালোবাসার নয়, আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভের প্রতিশোধ। এ থেকে দুই দলই শিক্ষা নিলে দেশ উপকৃত হবে। গণতন্ত্র সমৃদ্ধ হবে। লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক E-mail : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন