ফার্মগেট ও যাত্রাবাড়িতে সড়ক অবরোধজনিত দুঃসহ বিড়ম্বনার রেশ কাটিতে না কাটিতেই রাজধানীর ব্যস্ততম সংযোগস্থল শাহবাগে আবারও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটিয়াছে। গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হইয়া এই অবরোধ অব্যাহত থাকে রাত্রি অবধি। অফিস সময়ের প্রায় পুরোটা সময় জুড়িয়া আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত এই অবরোধের কারণে স্থবির হইয়া পড়ে কর্মব্যস্ত মহানগরীর কেন্দ্রস্থলসহ একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ঘন্টার পর ঘন্টা শাহবাগ মোড় বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্ট যানজট ছড়াইয়া পড়ে সারা শহরে। অচল হইয়া পড়ে যাত্রাবাড়ি, সদরঘাট হইতে শুরু করিয়া কাওরান বাজার, ফার্মগেট, মহাখালী, বনানী, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা। ফলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাইতে হয় স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, চাকুরীজীবী ও ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষকে। রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সকেও অসহায়ভাবে রাস্তায় দাঁড়াইয়া থাকিতে হয় দীর্ঘক্ষণ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইয়াছে যে, এইসব দেখিবার কেহ নাই। সঙ্গত কারণেই প্রশাসনের ভূমিকা লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। সেই সাথে দেশে আদৌ কোনো প্রশাসন এবং আইনের শাসন বলবত্ আছে কিনা দেখা দিয়াছে সেই প্রশ্নও।
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় প্রতিপালিত প্রশাসনের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য হইল জনজীবন স্বাভাবিক ও সচল রাখা। নাগরিকরা যাহাতে নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে চলাফেরা করিতে পারে তাহা নিশ্চিত করা। সেই কর্তব্য যথাযথভাবে পালিত হইলে জনসাধারণকে নিশ্চয় এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাইতে হইত না। কিন্তু কোনো প্রকার পূর্বঘোষণা ছাড়াই প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘন্টার পর ঘন্টা কিভাবে এই অবরোধ চলিতে পারিল তাহা আমরা বুঝিতে অক্ষম। বিশেষ করিয়া এই প্রশ্ন উঠিতে পারে যে—আইন, পূর্বানুমতি ও জননিরাপত্তার দোহাই দিয়া প্রায়শ যেইখানে জোরপূর্বক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বৃহদাকার সভা-সমাবেশ ভাঙিয়া দেওয়া হইতেছে, সেইখানে আইন বহির্ভূতভাবে রাস্তা অবরোধ করিয়া রাখা ক্ষুদ্রাকার এই সমাবেশটির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটিল কেন? ইহার আগে যাত্রাবাড়ি এবং ফার্মগেটেও অনুরূপ ঘটনা ঘটিয়াছে। প্রতিনিয়তই সড়ক অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিতেছে যত্রতত্র। আর তাহার মারাত্মক কুফল ভোগ করিতে হইতেছে করদাতা জনগণকে। ক্ষোভের বশবর্তী হইয়া নাগরিকদের যে কোনো অংশ রাস্তায় নামিয়া আসিতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সকলেরই শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করার কিংবা ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশের অধিকার রহিয়াছে। কিন্তু সেই ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশ করিতে গিয়া কোনোভাবেই যাহাতে অন্যের অধিকার খর্ব না হয়—ব্যাহত না হয় জনজীবন—তাহাও নিশ্চিত করিবার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হইয়াছে সংবিধানে। উন্নত গণতন্ত্রে নাগরিকরাই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এই দায়িত্ব পালন করিয়া থাকেন। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় তাহা এখনও অভাবনীয়। বরং ঐতিহ্যগতভাবে দাবি আদায়ের জন্য অবরোধ-ভাঙচুরের মতো কার্যক্রমেই আমরা বেশি অভ্যস্ত। আমাদের রাজনীতির চিত্রও ভিন্ন নহে। এমতাবস্থায়, জনজীবন স্বাভাবিক রাখার দায়িত্বটি অনিবার্যভাবে রাষ্ট্র তথা পুলিশ ও প্রশাসনের উপরই বর্তায়। তাহারা কী উপায়ে তাহা নিশ্চিত করিবেন সেই সিদ্ধান্তটিও তাহাদেরই গ্রহণ করিতে হইবে।
গণতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারিতা যে একসাথে যায় না—তাহা কোনো নূতন কথা নহে। গণতন্ত্রে যাহা ইচ্ছা তাহা করা যায় না। কারণ গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পরস্পর অবিচ্ছেদ্যই বলা চলে। একটিকে ছাড়া অন্যটি অচল ও অকার্যকর। অথচ আমাদের দেশে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এক নৈরাজ্যকর অবস্থা চলিয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। কথায় কথায় যেমন অবরোধ-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিতেছে, তেমনি দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে যাহা চলিতেছে তাহাও নৈরাজ্য ছাড়া আর কিছুই নহে। স্বাধীনতাপরবর্তীকালে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্মারক হিসাবে দেশে যানবাহনের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে সত্য, তবে ইহার সাথে যানজটের সম্পর্ক অতি সামান্য। বলা বাহুল্য, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়শ যে যানজটের সৃষ্টি হইতেছে তাহার মূলেও রহিয়াছে বিশৃঙ্খলা ও স্বেচ্ছাচারিতা। কেহই ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করিতেছে না। যাহার যেইভাবে ইচ্ছা চলিতেছে। যত্রতত্র গাড়ি থামাইয়া বা পার্ক করিয়া অবরুদ্ধ করিয়া রাখিতেছে সড়ক। আবার আইনের শাসন নিশ্চিত করা যাহাদের দায়িত্ব— তাহারা নিজেরাও যে আইনের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল আমাদের অভিজ্ঞতা তাহা বলে না। এই অবস্থা চলিতে থাকিলে তাহার পরিণাম যে কাহারও জন্য শুভ হইবে না— তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না।
