রমজান মাস আসিলে এবং তাহার আগে হইতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রবণতা নিয়া পত্রিকাগুলোতে লেখালেখি শুরু হইয়া যায়। এখন পর্যন্ত তেল-চিনির মত পণ্যের দামের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোন ঊর্ধ্বমুখী পরিবর্তন দেখা যাইতেছে না। তবে পত্রিকাগুলিতে যখন এগুলি নিয়া অনেক লেখালেখি হয়, তখন অনেক সময় বাজারের উপর ইহার প্রভাব পড়ে। সেদিক হইতে বলিতে গেলে, রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ক্ষেত্রে মিডিয়ারও ভূমিকা রহিয়াছে। রমজান মাসে দাম বৃদ্ধির এই ধারা বাংলাদেশে প্রতিবছরই দেখা যায়। রোজা শুরু হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে হইতে কিছু কিছু পণ্যের দাম হঠাত্ করিয়া বাড়িতে দেখা যায়। এই ব্যাপারটিকে কেহ কেহ বাজারে সিন্ডিকেটের উপস্থিতি বলিয়া মনে করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কতটা সিন্ডিকেটের উপস্থিতির কারণে হইতেছে, আর কতটা বাজারের নিয়মে হইতেছে তাহা বিবেচনায় রাখিতে হইবে। রমজান মাসে বিশ্ববাজারে এইসব পণ্যের দামের গতিপ্রকৃতিও বিবেচনায় রাখিতে হইবে। পাশাপাশি মনে রাখিতে হইবে যে, যাহারা এইসব পণ্য সরবরাহ করিয়া থাকেন, রমজান মাসে তাহাদের খরচও বাড়িয়া যায়। আবার কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রমজানের বাড়তি চাহিদার সুযোগও নিয়া থাকে।
বাংলাদেশে প্রায়ই সরকারের পক্ষ হইতে তেল-চিনির মত দুই-একটি পণ্যকে ‘রাজনৈতিক পণ্য’ হিসেবে গণ্য করা হয় যেগুলির দাম রমজান মাসে কমাইয়া রাখার চেষ্টা করা হয়, কারণ রমজান আসিলে এইসব পণ্যের দাম বাড়িয়া যায়। কিন্তু, একজন ভোক্তা তাহার মোট খরচের মাত্র এক হইতে দেড় শতাংশ তেলের পিছনে খরচ করে। অনুরূপভাবে, মাত্র এক হইতে দেড় শতাংশ চিনি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যয় করে। সুতরাং, তাহার ১০০ ভাগ ব্যয়ের মাত্র ৩ ভাগ তেল ও চিনির পিছনে যাইতেছে। অথচ এই দুটি পণ্যের দাম ১-২ টাকা কমাইয়া রাখার জন্য অবিরাম চেষ্টা করা হয়, যদিও তাহা পুরোপুরি সফল হয় না। অথচ বাড়ি ভাড়ার পিছনে একজন মানুষের খরচের ১০০ ভাগের মধ্যে ৫০-৭০ ভাগ চলিয়া যাইতেছে, চিকিত্সা ও অন্যান্য খাতে যাইতেছে একটা বড় ভাগ। এইসব দিকে সরকার গুরুত্ব দিতেছেন না। দাম নিয়ন্ত্রণের সরকারি কৌশলগুলি সামগ্রিক হওয়া উচিত এবং সেগুলি সারা বত্সরের জন্য হওয়া উচিত। সারা বত্সর যদি পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকিত, তাহা হইলে রমজান আসার পর দাম একটুখানি বাড়িলে ভোক্তার উপর বেশি প্রভাব পড়িত না। তাহারা একটুখানি বেশি দাম দিয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনিতে দ্বিধাবোধ করিত না। কিন্তু সারা বত্সর ধরিয়াই দ্রব্যের মূল্যস্তর মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের সাধ্যের বাহিরে থাকায় রমজানে আরেকটু দাম বাড়িলেই তাহাদের উপর আরও বেশি চাপ পড়ে। সরকারের পক্ষ হইতে সারা বত্সর বাজারে পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টা না করিয়া শুধু রমজান মাসকে কেন্দ্র করিয়া বাজারে হঠাত্ পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য কর্মপন্থা নেওয়া হইলে তাহা সফল হয় না।
গত কয়েক বত্সর ধরিয়া দেখা যাইতেছে, রমজান আসিলে সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন সংস্থাকে নিয়া বাজারে চলিয়া আসে, কিন্তু সেই অর্থে বাজার নিয়ন্ত্রণ করিতে পারে না। দণ্ড দেখাইয়া কখনো বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। প্রকৃত অর্থেই দাম নিয়ন্ত্রণ করিতে চাহিলে সরকারের নিজস্ব কিছু মজুত থাকা উচিত যেন ঘাটতি দেখা দিলে সরকার সেখান হইতে সরবরাহ করিতে পারে। কিন্তু গত কয়েক বত্সরে দেখা গিয়াছে, সরকার যখনই চেষ্টা করিয়াছে সরবরাহ বাড়াইতে, সময়মত সরবরাহ বাড়াইতে পারে নাই। সেইজন্য ব্যবসায়ীরা জানেন যে, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের আসলে কিছু করণীয় নাই। ফলে তাহারা বাজারে ঘাটতি দেখা দিলে তাহার প্রেক্ষাপটে দাম বাড়াইয়া থাকেন এবং বাজার অর্থনীতির নিয়মে তাহাই হওয়ার কথা। তাই এ বত্সর সরকারের উচিত একটু বুঝিয়া-শুনিয়া বাজারে দামের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া।
