আ ত্ম জৈ ব নি ক

‘যদি ফাগুন আসে গো ফিরে’

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৩, ২১:১২
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ এম জহির গতকাল সকালে ব্যাংককের একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন) করেন। পরিচ্ছন্ন মানসিকতার অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন জাতির গুণী সন্তানদের একজন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই লেখাটি প্রকাশ করা হলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছুদিন আগে আমি জন্মেছি কলকাতার ভবানিপুরে। সাধারণত বাচ্চাদের জন্ম হয় নানার বাড়িতে, কারণ মা যায় বাবার বাড়ি। কিন্তু আমার জন্ম হয়েছে ভবানিপুরের পুলিশ হাসপাতালে। সেখানে আমার নানা আর্মির চিকিত্সক ছিলেন। পরে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হন। কলকাতার দাঙ্গার সময় ১৯৪৬ সালের আগস্টে আমরা পার্ক সার্কাসে এলাম। সেখানে থাকার পরে আমার আব্বা (পরে বিচারপতি) কলকাতায় থাকার চিন্তা করেছিলেন, বাড়িও কিনেছিলেন, ৪৭ সালে। তবে, ৫০ এর দাঙ্গার পরে তিনি এদেশে চলে আসেন। কলকাতার দাঙ্গায় হিন্দু মুসলিমদের হত্যার চিত্র দেখেছি। শুধু হিন্দু বা মুসলিম হওয়ার কারণে মারা হত। শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের সাথে আমার বাবার ভাল পরিচয় ছিল। ঈদের সময় তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। ১৯৪৮ সালের দিকে কলকাতায় একদিন ঈদের সময় তিনি আমাদের বাড়িতে এলেন। তিনি বললেন, ‘খোকা, তোমার আব্বা বাড়িতে আছেন।’ আমি বললাম, ‘নেই।’ তিনি বললেন, ‘আমি এসেছিলাম।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার নাম কি?’ তিনি চুপ করে থেকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর আাামকে বললেন, ‘বলো, বেড়াল এসেছিল।’ আম্মা আমাকে বললেন, ‘কে এসেছিল।’ আমি বললাম, ‘বেড়াল।’ তিনি দৌড়ে গিয়ে দেখলেন, ‘শেরে বাংলা গাড়িতে উঠছেন।’ এটা আমার জীবনের একটা স্মরণীয় স্মৃতি। তিনি কেএম দাস লেন থেকে নারিন্দায় যখন আসতেন তখন আমাদের বাসায় প্রত্যেক ঈদে ঘুরে যেতেন। কলকাতায় পড়তাম হিন্দুদের সাথে। ভবানিপুরে একটা ভাল স্কুলে পড়তাম। পুরো বাংলায় দশটা প্লেসের মধ্যে প্রায় পাঁচটা সেখান থেকে থাকত। পার্ক সার্কাসে চলে আসার পর ভাল স্কুল পেলাম না। পরে ঢাকায় এসে সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি হলাম। সেখানে আমেরিকানদের বেতের বাড়ি খেয়ে ‘বাবু ইংলিশ’ বের হয়ে গেল। সেখান থেকেই মেট্রিক পাস করেছিলাম তিনটাতে লেটার মার্কসহ স্টার। আই-এ পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৬ সালে ইংরেজিতে সম্মানসহ ভর্তি হয়েছিলাম। আব্বা আমাকে পাস কোর্সে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার মন ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজের সাথে ছিল। ফাদার মার্টিন আমাকে বলল, আমি তোমাকে দেব কিন্তু তোমার ক্লাসের রফি (পরে ব্যারিস্টার) এবং মইনুর রেজা চৌধুরী (পরে প্রধান বিচারপতি)- এদেরকে তুমি নিতে পারবে না। আমি তাদের না নিয়ে ইংরেজিতে চলে গেলাম। সেখানে অনার্স, মাস্টার্স করলাম। আইন পাস করে অ্যাডভোকেট হলাম। ১৯৬২ সালে আমি এনরোল হই। তারপর বিলেত গিয়েছি। আব্বার খুব বেশি বিশ্বাস ছিল না যে, আমি বিদেশ গিয়ে পাস করতে পারব। বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টার ও এলএলএম পাস করলাম। লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৬৬ সালে কোম্পানি আইনের ওপর পিএইচডি করলাম। ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে খণ্ডকালীন লেকচারার হলাম। ৬৭-এর জানুয়ারিতে বিয়ে করলাম। প্রাকটিস শুরু করতে হলো। দেশ উত্তাল হয়ে উঠছে। এর মধ্যে এল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। আমি আর আমীর-উল ইসলাম হেবিয়াস করপাস রিট করলাম। স্যার টমাস উইলিয়ামসকে আনলাম। তিনি আমার সাথে রিহার্সেল করলেন এখনকার হোটেল রূপসী বাংলায় বসে। আগরতলা মামলায় প্রথমে আমরা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তখন ক্যান্টনমেন্টে যাইনি। কারণ আমাকে বলল, যারা যারা যায়নি, তাদের মামলাগুলো আমি দেখব ঢাকা হাইকোর্টে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ট্রায়াল চলে আসল। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে প্রায়ই যেতাম। বঙ্গবন্ধু অনেক বড় হূদয়ের ছিলেন। আগরতলা মামলা থেকে ফিরে আসার পর তার সাথে ক্লোজ হই। একাত্তর সালের মার্চে ওনার সাথে আমার সখ্যতা আরো বাড়ে। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কোথাও যাইনি। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে রুমি, কর্নেল জামানের ছেলে নাদিমকে বাসা থেকে নিয়ে আমি আর সিদ্দিক (এখন মারা গেছে) সেন্ট্রাল রোডে একটা বাড়িতে আসলাম। সেখানে রুমি আসল। তারপর একবারে আর্মির নাকের ডগা থেকে তাদের পার করলাম। আমার আব্বার ভালো চেহারার কারণে একাত্তরের ২৬শে মার্চ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। আর্মিরা আমাকে বলল, ইউ কাম এন্ড সো আস। বললাম, আমি তো যাবই না। বলে, হোয়াই নট, গেট বন্ধ ছিল। আমি বললাম আই ডোন্ট হ্যাভ কারফিউ পাস। মারার মতো অবস্থা। আব্বা বেরিয়ে আসলেন। আব্বার চেহারাও ছিল মাগরিবি। ওসব দেখে আমাদের ছেড়ে দিল। সেদিন যাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল তারা আর ফেরেনি। কিছুদূর নিয়ে গিয়েই মেরে ফেলত। তখন তো আমার মাথায়ই আসেনি আল বদর, আল শামস- এগুলো হবে। আমি তাত্ক্ষণিকভাবে তাদের ঘৃণা করেছি। আমার বাবা পঞ্চাশের দাঙ্গার পর ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি হলেন। তিনি অবসর নেন ১৯৬৫ সালে। এক গ্রামে যেমন দুই পীর থাকতে পারে না, তেমনি বাবা আমাকেই এগিয়ে দিলেন। তবে, আমার একটু অসুবিধে হলে ওনার কাছে যেতাম। তখন আটজন বা নয়জন বিচারপতি ছিলেন। আমি বিচারপতি হইনি বাবার অবস্থা দেখে। অবসরের সময় বাবার পেনশন এক হাজার টাকা মাত্র। বঙ্গবন্ধু আমাকে ৭২ সালের মার্চে বললেন, ‘তুমি কি হতে চাও? চাকরি করতে হবে’ আমি বুঝেছিলাম উনি কি বলতে চান। হয়ত, আমাকে বিচারপতি হতে বলতেন। আমার ওদিকে নজরই ছিল না। বাবা অবসরের পর বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকতে পছন্দ করতেন। আমি হাইকোর্ট থেকে আসার পর বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন। পরামর্শ দিতেন। একটা বিষয় আমি ভুলতে পারব না। খুশি খুশি হয়ে আমি বললাম, ‘ওমুক পরিচালকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। উনি, আমাকে লিগ্যাল অ্যাডভাইজারশিপ দেবেন।’ হঠাত্ তিনি ক্ষেপে উঠে বললেন, ‘কি, ডায়রেক্টর দেবেন? অনলি আল্লাহ ক্যান গিভ ইউ।’ যেটা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। এস আর পাল আর দেবেশ ভট্টাচার্য কিভাবে কোর্টে অ্যাপ্রোচ করেন তা দেখতে তিনি বলেছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথা কিছুটা মনে আছে। ১৯৬১ সালের দিকে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের মেয়ের বিয়েতে এসে তিনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তখন তিনি আব্বাকে বলেছিলেন, ‘আইয়ুব ডাজ নট রিয়েলাইজ, আনলেস দেয়ার ইজ ডেমোক্রেসি, পাকিস্তান উইল ব্রেক। মুজিব এন্ড আদার্স ওয়ান্ট টু ব্রেক পাকিস্তান। আই এ্যাম হোল্ডিং ইট। আই ক্যান নট। ইফ দেয়ার ইজ নো ডেমোক্রেসি পাকিস্তান উইল ব্রেক।’ এতো দূরদর্শী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আরেকটি মজার ঘটনা, বঙ্গবন্ধুর গাড়িকে আমি ধাক্কা মেরেছিলাম। ছেলেরা এসে আমার গাড়ির নম্বর লিখে নিল। তখনো জানতাম না, কার গাড়ি। ১৯৬০-৬১ সালের কথা। পরে বাসায় গিয়ে দেখি দুই ভদ্রলোক। একজনের স্বাস্থ্য অনেক। আমার বাবা বললেন, এই যে আমার ছেলে। তখনই দেখলাম বঙ্গবন্ধুকে। আমাকে বললেন, কিসে পড়। বললাম ল’তে পড়ি। ব্যারিস্টারি পড়ছ ভালো। কোয়ালিফাইড হয়ে আমার কাছে এসো। বঙ্গবন্ধুর গাড়িকে আমি ধাক্কা মেরেছি ভাবতেই কেমন লাগছে! একবার একজন মক্কেল এলেন একটা সমস্যার জন্য। আমি তাকে বললাম আপনাকে কে পাঠিয়েছে? তিনি বললেন, আমাকে এস আর পাল পাঠিয়েছেন কোম্পানি ল’জ সমস্যার জন্য। আমি তো পারলে তার পায়ে গিয়ে সালাম করি। আমি ভেবেছিলাম তিনি আমার শিক্ষক। উল্টো তিনিই আমাকে দেখিয়ে দিলেন। এই হচ্ছে তাদের উদার মানসিকতা। এখন সেটা নেই বললেই চলে। ফরিদপুরের একটি মামলা, দুই জমিদারের ঝগড়া নিয়ে। ৭৪ সালে মামলাটা কোর্টে উঠলে এস আর পাল ওদিকে আর আমি এদিকে। অনেক মানুষের সাথে কথা বলছিলাম। ভয়ও লাগছিল। হঠাত্ এস আর পাল আমাকে বললেন, এই চুপ চুপ। তাকিয়ে দেখি জাস্টিসরা বসেছেন। প্রচন্ড গরম পড়েছিল। আর এরই মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়েন জাস্টিস জাবির। প্রধান বিচারপতি সায়েম মাথা ধরে বসে আছেন, ‘আর বলছেন, ও ব্রাদার।’ জাবির সাহেবের এই অবস্থা দেখে আমি দেয়াল ডিঙিয়ে গেলাম। গিয়ে জাস্টিস জাবিরের গলার কলার ছিঁড়ে ফেলে হাতে থাকা বই দিয়ে বাতাস করি কিছুক্ষণ। এর মধ্যে তার জ্ঞান ফেরে। আমার কাছে মনে হয়, ‘ইতিহাসের লিগ্যাল হিস্টোরিতে আমিই প্রথম মানুষ যিনি বার ডিঙিয়ে গিয়েছিলাম।’ মামলা তো ওখানেই শেষ। তারপরতো ১৯৭৮ সালে মামলাটা নিষ্পত্তি হয়েছিল। গিটার বাজিয়ে সময় নষ্ট করতাম। পালিয়ে এখানে-ওখানে বাজিয়ে বেড়াতাম। তারপর একবার এডভোকেট হওয়ার পরে ১৯৬১ অথবা ৬২ তে পল্টন ময়দানে গিটার বাজিয়েছি। তারপর আমার সিনিয়র ও প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আমাকে যা বকা দিয়েছেন। বলেছিলেন, অ্যাডভোকেট হয়ে পল্টন ময়দানে তুমি গিটার বাজাও, তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না। তারপর থেকে গিটারটা বাইরে কম বাজিয়েছি। এখন হয়ত এক বা দুই ঘন্টা প্রাকটিস করি। লন্ডনে একবার মোহাম্মদ রাফির সঙ্গে গিটার বাজিয়েছিলাম। ওনার গিটারের হ্যান্ড কম হয়েছিল, সেই সুযোগটা নিয়েছিলাম। মোহাম্মদ রাফির মতো মানুষের সাথে গিটার বাজানো আমার জীবনের অন্যতম একটা অর্জন। টেনিস আমাকে আরেকটা সুযোগ দিল। টেনিস কোর্টেই আমি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সুযোগটা পেয়েছিলাম। কোনো একটা কারণে আমি বীতশ্রদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। টেনিস কোর্টে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারিকে চাকরির কথা বলেছিলাম। তারপর আমি আবেদন করলাম। মনেই ছিল না। তার তিন চার মাস পর একটা জবাব আসল অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা থেকে। দুটো শর্ত দিল আমাকে, সেখানকার ইমিগ্রেশন নিতে হবে আর তাদের হাইকোর্টে অ্যানরোলমেন্ট নিতে হবে। এরপর আমি এক মিনিটে এনরোলড হয়ে গেলাম। তারপর ওখানে চলে গেলাম। কোম্পানি ল’ আর সিকিউরিটিজ ল’ এর ওপরে আমাদের কাজ ছিল। সেখানে সিকিউরিটিজ লজ’ অব অস্ট্রেলিয়া ড্রাফট করেছিলাম। তারপর একবার আব্বার স্ট্রোক হলো। আমি চলে আসলাম। তারপর থেকে আসতাম, আবার যেতাম। এরপর ১৯৯১ সালের পরে আমি খুব কম যেতাম। কোম্পানী আইনের ওপরে একটা বই লিখেছি। আশা করছি, মরে গেলে হয়ত বইটা অন্য উকিলদের ঘরে থাকবে। এটাই হবে আমার এপিটাফ। এখন পর্যন্ত ওটাই আমার হাতে লেখা ভাল একটা বই। আইনজীবীরাও সেটা অনুসরণ করেন। একটি আফসোস দিয়ে শেষ করতে চাই। হেমন্তের গান আমার খুব প্রিয়। আমি একবার অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছি। সেবার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি ছিলেন সুন্দরবন হোটেলে। আমার এক চাচাত বোন হেমন্তকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। আমি তাকে সামনাসামনি দেখতে পারিনি। দ্যাট ওয়াজ দি বিগেস্ট মিসটেক অব মাই লাইফ। আজ আমার জীবনের পশ্চিম আকাশ লাল। ওপারের ডাকের অপেক্ষায়। তবু বলে যাই- আবার যদি আসে ফাল্গুন শিমুল শাখায় লাগে আগুন তখন আবার স্মরণ করো অচিন সাথীটিরে- দেখা হবে আবার যদি ফাল্গুন আসে গো ফিরে \ (সংক্ষেপিত)

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন