সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দল ইতিমধ্যেই ‘ক্ষমতার গন্ধ’ পেতে শুরু করেছে। আর এই ‘গন্ধ’ তাদের হিতাহিত দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য অবস্থান থেকে অনেকটাই দায়িত্বশীল অবস্থানে ফিরিয়ে এনেছে। অন্যদিকে ‘ক্ষমতা হারানোর ভয়’ সরকারি দলকে কিছুটা হলেও ধীরস্থির বানিয়ে ফেলেছে। একাধারে ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনগণ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করেছে। বলা যায় ভোটাররা আওয়ামী লীগকে যথেষ্টই ‘টাইট’ দিয়েছে। রূঢ় এবং স্পষ্ট ভাষায় নিজেদের অসন্তোষের কথা সরকারি দলকে জানিয়ে দিয়েছে। সরকারি দলও বাধ্য হয়ে বিষয়টি আমলে নিতে শুরু করেছে। তারা বুঝতে শুরু করেছে, একতরফাভাবে কোনো কিছু করার দিন শেষ। সুশাসন বাদ দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা, মানুষের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়। তাই তো আমরা লক্ষ্য করলাম, র্যাবের গুলিতে পা হারানো ঝালকাঠির লিমনের প্রতি সরকারের ইতিবাচক আচরণ। অনেক সমালোচনার পরও কলেজ ছাত্র লিমনের প্রতি অন্যায় আচরণ থেকে সরকারকে বিরত রাখা যায়নি। লিমনকে প্রায় আড়াই বছর ধরে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল বিবেচনায় নিয়ে আত্মশুদ্ধির পথে শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে আকস্মিকই লিমনের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারের এই সুমতি, শুভবুদ্ধির উদয় বা উপলব্ধি নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের জন্য অনেক বড় অর্জন।
এখন বিরোধী দল-সরকারি দল সবার একমাত্র মনোসংযোগের বিষয় হওয়া উচিত আগামী জাতীয় নির্বাচন। যথাসময়ে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে সবার আগে সেগুলো অপসারণ করতে হবে। কেননা গণতন্ত্রের প্রাণভোমরাই হলো নির্বাচন। যত বেশি নির্বাচন হবে, তত বেশি কারচুপির পথ বন্ধ হবে, তত বেশি টনক নড়বে, তত বেশি অনির্বাচিত সরকারের ঝুঁকি কমবে। ভারত এভাবেই পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশেও নির্বাচন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সবরকম ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে উদ্ধার করার সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থা দূর করতে হবে। দলীয় সরকারের অধীনেও যে অবাধ-স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব সে দৃষ্টান্ত বর্তমান সরকারের আমলে স্থাপিত হয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচনও যেন এভাবে করতে পারে তা নিশ্চিত করতে, সেই দক্ষতা-ক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিব্যবস্থা-পদক্ষেপ নিতে হবে। এটা করতে হবে বিরোধী দল এবং সরকারি দল উভয়কে মিলেই।
মনে রাখতে হবে আওয়ামী লীগের পায়ের নিচের মাটি কিন্তু যথেষ্টই আলগা। আর বিএনপি যদি দায়িত্বশীল যৌক্তিক ভূমিকা থেকে সরে গিয়ে একগুঁয়েমি আর জেদকেই প্রাধান্য দেয় তাহলে লাভের গুড় শেষে পর্যন্ত পিঁপড়ের পেটেই চলে যেতে পারে। এতে কারোরই লাভ হবে না। কাজেই ছাড় দিয়ে হলেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে হবে।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় নির্বাচন, বিভিন্ন উপ-নির্বাচনে যে বিরোধী দল ভালো করছে এটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই জয়। বর্তমান সরকারের আমলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিকাশে সহায়ক বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এ সরকারের সময়েই মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন গঠিত হয়েছে, নাগরিকরা অবাধে তাদের মত প্রকাশ করতে পারছে। যে কেউ সরকারের ভালো-মন্দের সমালোচনা করতে পারছে। এটা তো গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার ফলেই সম্ভব হচ্ছে। এই অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে হবে। আজকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ‘০-৫ গোলে’ হেরে যাওয়াটা গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিজয়ও বটে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের ’বদান্যতায়’ হয়েছে। তারা চাইলেই এটাকে আরও বছরখানেক ঝুলিয়ে রাখতে পারতো। অতীতের দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনকে যেভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে, আওয়ামী লীগ তা করেনি। এটা তাদের শুভবুদ্ধিরই পরিচয়।
এই শুভবুদ্ধি সবাইকেই অর্জন এবং চর্চা করতে হবে। আমাদের সবারই মানসিকতা পাল্টাতে হবে। গোড়া ঠিক করতে হবে। গোড়া ঠিক না হলে কোন সিস্টেমেই কাজ দেবে না। এদেশে এখনো রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই সুবিধামাফিক অবস্থান নেয়। মুখে সবারই গণতন্ত্র, কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল পছন্দ না হলে কেউ কালো টাকা, কেউ সরকার, কেউ নির্বাচন কমিশন, কেউ আমেরিকা, কেউ ভারত, কেউ সেনা, কেউ ধর্ম ইত্যাদি নানাজন নানাজনকে দোষারোপ করে। অমুক চায় নাই তমুক ক্ষমতায় আসুক, এই কথা অনেক বিজ্ঞজনের মুখেই আমরা শুনি। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার এত শক্তি যদি সক্রিয় থাকে, তাহলে জনগণের নাম বেচার দরকার কী? আর জনগণ চাইলে কী কোনো মতামতকে ছিনতাই করা সম্ভব? কারচুপি করে টিকে থাকা সম্ভব? অতীতে কি সম্ভব হয়েছে? তাহলে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে এত দ্বিধা কেন? তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করা না করা নিয়েইবা এত টানা-হেঁচড়া কেন?
না, দেশে এখন কোনো কিছুই আর সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে না। আটার কেজি ৩৫-৩৮ টাকা। মাঝারি সাইজের একটি কাঁঠাল কমপক্ষে ১০০ টাকা। ভাতের বদলে যে আমরা রুটি কিংবা কাঁঠাল খাবো, তারও জো নেই। কাঁঠালও বর্তমানে আমাদের কাছে দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে। অথচ এই কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। এর অনেক গুণ রয়েছে। এর পুষ্টিমান যেমন উঁচু, তেমনি ফলেও প্রচুর। এক গাছেই শত শত কাঁঠাল। আর একটি কিনলেই পুরো পরিবার পেটভরে খেতে পারে। এর কোনো অংশই ফেলনা নয়। মানুষ যে অংশটুকু খেতে পারে না, সেটুকু গরু-মহিষের প্রিয় খাবার। একটা সময় পর্যন্ত কাঁঠাল বেশ সস্তায় পাওয়া যেত। এখন অবশ্য অন্য সবকিছুর মতো কাঁঠালেরও দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। যে কাঁঠাল এক সময় ছিল ফেলনা, অবহেলিত, সেই কাঁঠালও এখন চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে গেছে। এর গন্ধ আকর্ষণ করলেও দামের কারণে সবাই কাছে ভেড়ার সুযোগ পায় না। আপেল বা আঙ্গুরের মতো কাঁঠালও এখন মহার্ঘ ফল। অল্প কিছু সৌভাগ্যবান টাকাওয়ালা মানুষই শুধু এর রূপ-রস-গন্ধ-স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পান। বড়লোকের রূপসী মেয়ের প্রতি মধ্যবিত্ত কিশোরের দীর্ঘশ্বাসের মতো কাঁঠালও এখন সাধারণ মানুষের মুগ্ধ দীর্ঘশ্বাসের বস্তুতে পরিণত হয়েছে!
অথচ এই কাঁঠাল কিন্তু মাত্র ১/২ বছর আগেও ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। তখন বরং মানুষের মধ্যে কাঁঠাল সম্পর্কে এক ধরনের উপেক্ষার মনোভাব লক্ষ্য করা যেত। এখন কাঁঠালের সেই দুর্দশা আর নেই। কাঁঠালও এখন মূল্যবান ফল। আর দামের সঙ্গে আমাদের সমাজে যে কোনো বস্তুর ‘জাতে ওঠা’ নির্ভর করে। এ যুগে দামের ওপরই নির্ভর করে ওই বস্তুর মর্যাদা। যে জিনিসের দাম বেশি তা সাধারণ মানুষ কিনতে পারে না।
কাঁঠাল এখন হতাশার নাম, বঞ্চনার নাম। মানব সমাজে বুদ্ধিজীবীদের যে বৈশিষ্ট্য, ফল সমাজে কাঁঠালের অবস্থানও অনেকটা সেইরকম। বুদ্ধিজীবী যেমন যৌবনের চেয়ে বার্ধক্যে পৌঁছে অধিক গুরুত্ব ও মর্যাদা পান, কাঁঠালও ঠিক তেমনি। ‘যৌবনে নাহিকো রস রসিক যুবতী, বৃদ্ধকালে হয় সে অতি রসবতী!’
আমাদের জীবনে কাঁঠালের অনেক প্রতীকী তাত্পর্য রয়েছে। যদিও অধিকাংশ পাবলিকই কাঁঠাল খেতে পায় না। কেননা এখন কাঁঠাল খাওয়াও অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। আমরা বাঙালিরা কলা খাওয়ার চেয়ে যেমন কলা দেখেছি বেশি, কাঁঠালের ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা। গাছের কাঁঠাল গাছেই থেকেছে, অথচ আমরা মিছে মিছে ঢোক গিলেছি, আঠার ভয়ে অস্থির হয়েছি। তবে কাঁঠালের চেয়ে এর আঠা অধিক ভয়ানক বা বিপজ্জনক। অধিক ক্ষমতাবানও। মন্ত্রীর চেয়ে যেমন আমলা। নেতার চেয়ে যেমন পাতি-নেতা, নেতার-হাতা। কাঁঠালের আঠা যদি একবার শরীরে, কাপড়ে বা গোঁফে লেগে যায় তাহলে সহজে তা ছাড়ানো যায় না (কিশোর-কিশোরীর নাছোড়বান্দা প্রেমকে তাই বুঝি কাঁঠালের আঠার সাথে তুলনা করা হয়!)। এটি অনেকটা ক্ষমতার সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মতো। কিংবা বড়ো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মতো। একটির সঙ্গে অন্যটিকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। একবার লাগলেই খেল খতম। যা সুপার গ্লুর চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।
এই আঠার কারণে কাঁঠাল নিয়ে অনেক বিপত্তি ঘটে। গোঁফে একবার যদি আঠা লেগে যায় তাহলেই মহাসর্বনাশ। সাবধানীরা তাই কাঁঠাল খাওয়ার আগে গোঁফে ভালোমতো তেল মেখে নেন। কেননা তৈলাক্ত গোঁফে আঠা খুব একটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় না। কিন্তু তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাও এখন মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের দেশের মানুষ অবশ্য খুব একটা সাবধানী নয়। তারপরও কেন জানি অনেকে গাছে কাঁঠাল দেখলেই গোঁফে তেল মাখতে শুরু করে দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হাতে বা মুখে এসে পৌঁছায় না। তেল মাখাই সার হয়। অল্প কিছু লোক সব কাঁঠাল মজা করে খায়। তাদের তৈলাক্ত শরীরে আঠাও কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। এদেশের বঞ্চিত মানুষগুলো ভাগ্য বদলের জন্য কাঁঠালের স্বাদ পাওয়ার জন্য শুধু গোঁফে তেলই মেখে গেছে; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কাঁঠাল গাছ থেকে, মুষ্টিমেয়র হাত থেকে কখনোই তাদের নাগালের মধ্যে আসেনি।
ক্ষমতায় যেই গেছে তারাই মহানন্দে মনের সাধ মিটিয়ে জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খেয়েছে। নির্বোধ জনগণ উচ্ছিষ্টও ভাগে পায়নি। তারপরও তারা আশা ছাড়েনি। গোঁফে তেল মেখেই যাচ্ছে। এবার না হয় গাছের কাঁঠালগুলো হাতছাড়া হলো, আগামীবার নিশ্চয়ই মিলবে। কিন্তু হায়! সেই আগামী আর আসে না। সাধারণ মানুষ কাঁচকলা দেখার মতো শুধুই কাঁঠাল দেখে। আমাদের জীবনের এই অব্যাহত কাঁঠাল-বঞ্চনার বিরুদ্ধেও কী আমরা সবাই মিলে একবার রুখে দাঁড়াব না?
লেখক :কলামিস্ট
