দেশে চলছে ভয়াবহ গ্যাস সংকট। ১০ জুলাইয়ের অধিকাংশ জাতীয় দৈনিকেই রাজধানী ঢাকার পাশের রূপগঞ্জে ৩ শতাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে বলে সংবাদ ছেপেছে, যা আতংকিত হবার মতো। পত্রিকান্তে আরও জানতে পারি, প্রেসার না থাকায় রাজধানীর নিকটবর্তী গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও টঙ্গীতেও অনুরূপ অবস্থা। সেখানকার ৪ সহস্রাধিক কারখানাও গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধের পথে। গ্যাস সংকটে এসব শিল্প-কারখানা অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকায় দেশীয় শিল্পখাতে নেমে আসছে চরম দুর্দিন। ফি বছর ধরেই এ সংকট চলছে। গত জুনের শুরু থেকে সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। গত ২ মাস ধরে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংকটের কারণে দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়েছে। বর্তমানে তিতাস কর্তৃপক্ষ গ্যাসের প্রেসার একেবারে কমে যাওয়ায় স্বল্প প্রেসারে সেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান আর চালু রাখা যাচ্ছে না। ৬ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত গড়ে দিনে- রাতে ১ ঘণ্টাও রূপগঞ্জ তারাবো শিল্পাঞ্চলের কারখানা চালু রাখা যায়নি বলে দৈনিক সংবাদের শেষের পাতায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। রোজায় বিদ্যুতের লোডশেডিং কমানোর উদ্দেশ্যে সরকার পাওয়ার প্লান্টগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে গ্যাস সরবরাহ করছে বলে শিল্প মালিকদের অভিযোগ। এছাড়া অতিসম্প্রতি সরকারের বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ ও অবৈধ সংযোগ বৈধ করার ঘোষণার পর এক শ্রেণির তিতাস গ্যাস কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলে সহস্রাাধিক অবৈধ সংযোগ দেয়ার কথা পত্রিকায় ছেপেছে, যা শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের আরও একটি কারণ। অব্যাহত গ্যাস সংকট চলতে থাকলে শিল্প মালিকরা অর্থ সংকটে পরে ঈদের বেতন-বোনাস দিতে ব্যর্থ হবেন বলে আশংকা করা হচ্ছে। এতে ঈদের আগে শিল্পাঞ্চলগুলোতে ব্যাপক শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক প্রণীত গ্যাস সেক্টর মাস্টার প্ল¬্যান থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, বর্তমানে গ্যাসের প্রমাণিত যে মজুদ আছে তা দিয়ে ২০১০-১১ সাল পর্যন্ত মধ্যমানের চাহিদা পূরণ করা যাবে। সম্ভাব্য ২ ক্যাটেগরির যে মজুদ তা আবিষ্কার করা গেলে ২০১৪-১৫ পর্যন্ত চাহিদা পূরণ সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে জিএসএমপির তথ্য অনুযায়ী ২০১৫-২৫ সাল পর্যন্ত চাহিদা পূরণের জন্য দরকার হবে অতিরিক্ত ২৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাত্ এখন থেকেই নতুন গ্যাসফিল্ড অনুসন্ধান ও আবিষ্কার করা না গেলে অচিরেই দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিবে। বলা হয়ে থাকে, দেশটা নাকি গ্যাসের ওপর ভাসছে।
রূপক অর্থের কথাটা বাড়াবাড়ি মনে হলেও দেশ যে গ্যাসসম্পদে প্রাচুর্যময়, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। শুধু দরকার সেগুলোর সন্ধান করে উত্তোলন ত্বরান্বিত করা। বঙ্গোপসাগরেও প্রচুর গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নানা জটিলতায় তা বিরোধপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দেশের শিল্প-বাণিজ্য বেশ নাজুক অবস্থায় পড়েছে। গত এক থেকে দুই বছরের মধ্যে তেমন কোন শিল্প প্রবৃদ্ধি নেই। গ্যাসের উত্পাদন দৈনিক ২২০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত নাকি নতুন কোন সংযোগ দেয়া হবে না। অথচ এ অচলাবস্থা কাটানোর কোন উদ্যোগই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গণমুখী কয়লানীতি প্রণয়ন ও নতুন গ্যাসফিল্ড আবিষ্কার ছাড়া সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
কারখানা চালু রাখার জন্য সর্বপ্রথম দরকার গ্যাস। সে গ্যাস চাহিদার সামান্যও পাওয়া যায় না। তাহলে বিনিয়োগ হবে কি করে ? ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ অলস টাকা পড়ে থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে চাইছে না। তাছাড়া যেসব শিল্প-কারখানা আছে সেগুলো চলছে না, নতুন করে শিল্প গড়ার কথা এখন আর কেউ ভাবছে না। এ পরিস্থিতি দেশের জন্য ভয়ানক আতংকের। এদিকে সরকার বিনিয়োগ করতে সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছে, ব্যাংকগুলোও বিনিয়োগকারী খুঁজচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগের কোন পরিবেশ দেশে নেই। গ্যাস সংকটের সমস্যার সমাধান তো হচ্ছেই না, বরং তা বেড়েই চলেছে। যে কারণে শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা এখন চরমে। কারণ হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তারা বিপাকে পড়েছেন। কিন্তু শিল্প-কারখানা বাঁচাতে শিল্প মালিকদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেলেও কারো টনক নড়ছে না। সরকারের সংশ্লি¬ষ্ট দফতর নিয়ে প্রশ্ন; ওই দফতরের আসলে কাজ কী? কারণ হাজারবার সমস্যার কথা জানিয়েও কোন সমাধান মিলছে না। কর্মকর্তারা যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। দেশ বাঁচাতে হলে অবশ্যই শিল্প-কারখানা যে বাঁচাতে হবে, সেটা তারা যেন বেমালুম ভুলেই গেছেন। অগ্রাধিকার ও জরুরিভিত্তিতে শিল্প-কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরিভাবে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দরকার।
দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড শিল্প-কারখানা। সেই কারখানা বাঁচাতে সবার আগে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ দেয়া উচিত। কিন্তু সেই শিল্প খাত নিয়ে কারো কোন চিন্তা নেই। অথচ এ খাতে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। কারখানা চালু রাখার জন্য সর্বপ্রথম দরকার গ্যাস। সে গ্যাস চাহিদার সামান্যও পাওয়া যায় না। তাহলে বিনিয়োগ হবে কি করে? তাছাড়া যেসব শিল্প-কারখানা আছে সেগুলো চলছে না। এ পরিস্থিতি দেশের জন্য ভয়ানক আতংকের। এদিকে সরকার বিনিয়োগ করতে সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছে, ব্যাংকগুলোও বিনিয়োগকারী খুঁজচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগের কোন পরিবেশ দেশে নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে শিল্প খাত অচিরেই ধ্বংসের মুখ দেখবে। সেইসঙ্গে বেকার হয়ে পড়বে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। বিপর্যয়ের মুখে পড়বে গোটা অর্থনীতি।
লেখক :সাংবাদিক
