ধারণাগতভাবে দেশে দুর্নীতির মাত্রা বাড়িয়াছে। এই পর্যবেক্ষণ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের। গত মঙ্গলবার ‘গ্লোবাল করাপশান ব্যারোমিটার ২০১২’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লিখিত চিত্র প্রকাশ করিয়াছে টিআইবি। ধারণাগতভাবেই হউক কী বাস্তবিকই হউক, সময়ের ব্যবধানে দুর্নীতি বাড়িয়া যাইবার সংবাদে অবাক হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু, সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসাবে যখন দেশের রাজনৈতিক দল বা দলসমূহের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয় তখন খানিকটা চিন্তার বিষয় বৈকি! রাজনৈতিক ব্যক্তি নয়, খোদ দলই দুর্নীতিগ্রস্ত—জনমত যাচাই করিয়া এই ধারণা পাইয়াছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংস্থাটি তাহাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে ১ হাজার ৮শ’ ২২ জন বাছাই করা লোকের মতামত গ্রহণ করিয়াছে। তাহাদের ৯৩ শতাংশ বলিয়াছেন যে, রাজনৈতিক দলের মধ্যেই রহিয়াছে দুর্নীতির প্রবণতা সবচাইতে বেশি। দুর্নীতি প্রবণতায় প্রায় সমানে সমানে নাকি পুলিশ ও বিচার বিভাগ। খোদ রাজনৈতিক দলই যখন দুর্নীতি প্রবণতার শীর্ষে স্থান করিয়া লইয়াছে, তখন রাজনৈতিক আদর্শ, নীতি-নৈতিকতা, দেশাত্মবোধ, কর্মসূচি ইত্যাদি অবান্তর হইয়া গিয়াছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। এইরূপ ধারণাচিত্র প্রকাশ করিবার মাধ্যমে দেশকে বিরাজনীতিকীকরণের চেষ্টা করা হইতেছে কি না এক্ষণে সে প্রশ্নও উঠিতে পারে। আমরা সেই বিতর্কে যাইব না।
এই কথা অনস্বীকার্য যে, দেশে বিদেশে যত মহত্ পরিবর্তন আসিয়াছে, গণতন্ত্র ও মানবিকতার সংগ্রামে বিজয়ের যত ইতিহাস রচিত হইয়াছে, তাহা প্রায় সবই হইয়াছে রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে। রাজনৈতিক নেতৃত্বই কিন্তু আনিয়াছে বিশ্ব ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল পরিবর্তনসমূহ। তাহা সত্ত্বেও আজকে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের বিশেষ করিয়া উপমহাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলসমূহের ভূমিকা লইয়া প্রশ্ন উঠিতে শুরু করিয়াছে। পার্টির আদর্শ, কর্মসূচি এবং নৈতিকতা আজ বহুলাংশে যেন বা গৌণ হইয়া গিয়াছে। যে কোনো পার্টির একজন বা কিছুসংখ্যক নেতা-কর্মী দুর্নীতিবাজ হইতে পারেন। হওয়া বিচিত্র নয়। কিন্তু এখন অনেকেই ভাবিতে শুরু করিয়াছেন যে রাজনৈতিক দল নিজেই দুর্নীতিপ্রবণ। এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করিলে যাহা দাঁড়ায় তাহা এই যে রাজনৈতিক দলই দুর্নীতি লালন করিয়া থাকে। এই ধারণা সৃষ্টি হইবার পশ্চাতে কোনো দৃশ্যমান এবং যৌক্তিক কারণ নাই তাহা বলা যায় না।
রাজনৈতিক দল বলিতে এমন একটি সংঘশক্তিকে বুঝায়, যাহাদের নিজস্ব আদর্শ, আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি রহিয়াছে। জনগণের ম্যান্ডেট লইয়া ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা ক্ষমতার অংশীদার হওয়া তাহাদের উদ্দেশ্য। ক্ষমতায় গিয়া তাহারা তাহাদের নীতি-আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়িত করিবে, দেশবাসীর কাছে ইহাই তাহাদের অঙ্গীকার। কিন্তু, অঙ্গীকারকে কার্যে পরিণত করিতে হইলে এবং নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালাইয়া জনমত সংগঠিত করিতে যেমন অক্লান্ত পরিশ্রম করিতে হয় তেমনই প্রয়োজন হয় বিপুল অর্থের। ইহা রূঢ় বাস্তবতা। ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত গণতন্ত্রের দেশসমূহেও রাজনৈতিক দলগুলি বিপুল অংকের অর্থসংগ্রহ ও ব্যয় করিয়া থাকে। উপমহাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহও তাহার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বিরাট ব্যবধান রহিয়াছে তহবিল সংগ্রহের পদ্ধতি ও উেসর মধ্যে। উন্নত গণতন্ত্রের দেশসমূহে পার্টির সদস্য ও সমর্থকগণই এককালীন কিংবা মাসিক-বার্ষিক চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে দলের তহবিল গঠনে ভূমিকা রাখেন। চাঁদা সংগ্রহ করা হয় রশিদ দিয়া স্বচ্ছ পন্থায়। পক্ষান্তরে তৃতীয় বিশ্বে বিশেষ করিয়া এই উপমহাদেশে পার্টির তহবিল কী প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়, তাহা অনেকটাই রহস্যাবৃত। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং সমাজের ধনশালী ব্যক্তিগণ রাজনৈতিক দলকে ডোনেশান দিয়া থাকেন কিন্তু প্রকাশ্যে নয়। তহবিল গঠনে যাহারা সহায়তা দেন, তাহারা দল ক্ষমতায় গেলে সুবিধা আদায় করিয়া নেন। নিয়ম-বিরুদ্ধ সুবিধা দেওয়া হইবে বলিয়াই তাহাদের নিকট হইতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা নেওয়া হইয়া থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এইসব দেশে দলের সাধারণ সদস্য বা সমর্থকগণ দলের তহবিলে চাঁদা দিবেন— এমনটি কখনই ভাবা হয় না। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক দলের নীতি আদর্শ ও কর্মসূচি ছাপাইয়া অনিয়ম যদি প্রাধান্য বিস্তার করে, তাহাতে বিস্ময়ের কিছু থাকিতে পারে না। এইকালে, দেশের জন্য, দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য কিংবা দলের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হইয়া কাজ করিবার মত নিঃস্বার্থ কর্মী-সমর্থক খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন। নিজের দল ক্ষমতায় গেলে চাকরি, ব্যবসায়, লাইসেন্স-পারমিট সর্বক্ষেত্রে তাহারা একচ্ছত্র অগ্রাধিকার পাইবে ইহাই নিয়মে পরিণত হইয়াছে। দলের নীতি-নির্ধারকগণও ইহাতে অন্যায় কিছু দেখিতে পান বলিয়া মনে হয় না। এই বাস্তবতায় জনমনে যদি এই ধারণা সৃষ্টি হইয়া থাকে যে, রাজনৈতিক দলই বেশি দুর্নীতিপ্রবণ, তাহা হইলে দোষ দেওয়া যায় না। গরিব দুনিয়ার মানুষের ইহাই ললাট লিখন। তবে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকিলে এমন একদিন নিশ্চয়ই আসিবে, যেইদিন সকলেই বুঝিতে পারিবেন যে, অনিয়ম-দুর্নীতির রাশ টানিয়া ধরিতে না পারিলে সমৃদ্ধশালী জাতি গঠন কখনই সম্ভবপর হইবে না। রাজনৈতিক দলের কোনো নীতি-কর্মসূচিই জাতীয় জীবনে সুফল বহিয়া আনিতে পারিবে না।
