আপনদর্পণ

সোনালী দিগন্তের আভাস

আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৩, ২১:৩২
রমজান এলেই মনের মধ্যে আনাগোনা করে নানা সাধু বাক্য। কুরআন শরিফে আল্লাহ্তা’য়ালা সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন আমি রাজাকে ফকির করি, ফকিরকে বাদশা, আমি মৃতকে জীবিত করি, জীবিতকে মৃত। কেন তবে আমরা সামান্য এই ক’দিনের জীবনে এতো আড়ম্বর, এতো আয়োজন, এতো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে মশগুল হয়ে আছি। কোথা থেকে এলাম, ক’দিন থাকবো, কোথায় যাবো, সে চিন্তা এক মুহূর্তও করি না। করতে পারলে আমাদের অনেক পাপ মোচন হতো। রোজা শুরুর আগেই রাজপথ চলে গেছে ভিক্ষুকের দখলে, অথচ এমনটি হওয়ার কথা নয়। আমাদের দেশে বিত্তশালী ব্যক্তি অনেক আছেন, বড় বড় দালান, হাইরাইজ বিল্ডিং, শপিংমল, রেষ্টুরেন্ট, বায়িং হাউস, দিনে দিনে বাড়ছে। কোথায় খরচ করবেন তারা এতো বিত্ত, টাকার পাহাড় কতো সুউচ্চ হবে। কিছুই তো সঙ্গে যাবে না, শুধু দু’টুকরো সাদা কাপড়ে ঢেকে মাটির বিছানায় রেখে আসবেন নিকটজনেরা। গত ক’দিন অনেকগুলো বিয়ে ও দাওয়াতে এ্যাটেন্ড করলাম। ফুলে ফুলে সাজানো গেট থেকে শুরু করে ভেতরের স্টেজ পর্যন্ত প্রতিটি প্রান্তর। কতো যে ফুলের বাহার, কতো রঙের, কতো ডিজাইনের, কিছু ঢাকার অধিকাংশ বিদেশ থেকে আমদানী। টাকার অংকে হিসেব মিলাবো না, তবে ফুল দেখলে মন খুশি হয় অবশ্যই। সেদিন আমার এক অংক বিশারদ বন্ধু বললেন, ‘জানো একদিনের পুষ্প শয্যায় পনেরটি পরিবারের স্থায়ী রোজগারের ব্যবস্থা করা যায়’। জানি তো আমিও, কিন্তু কিছুই করতে পারি না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখতে পাই পবিত্র গ্রন্থের আয়াত, ‘অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই, ইন্নালমুবাজ্জিরিনা কানু ইখওয়ানিস শয়তান’। এছাড়াও অনেক সত্ উপদেশ কুরআন শরিফের পাতায় পাতায়, দরসে হাদিসের প্রতিটি পঙক্তিতে। একে বাক্সবন্দি করে না রেখে জীবনে প্রয়োগ করেন এমন মানুষও আছেন, না হলে পৃথিবী এখনো বাসযোগ্য থাকতো না। আমার নিকটতম প্রতিবেশী রোটারিয়ান এম এ জামান, দু’কদম চললেই তাকে পাই। সকালে ঘুম থেকে জেগেই দেখলাম বিছানার পাশে সুন্দর একটি ঝুড়িতে গাছ থেকে পাড়া পাতাসহ সুপক্ক অনেকগুলো আম। পাঠিয়েছেন জামান ভাই। এমন একটি মানুষ আমার প্রতিবেশী, চোখে পানি চলে এলো। উনি তো সবসময়ই পাঠাচ্ছেন, ইত্তেফাকে আমার লেখা পড়ে এমন খুশি হলেন যে সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মিষ্টির দোকান থেকে দু’কেজি দইয়ের হাঁড়ি পাঠিয়ে দিলেন। এর আগে মাঝে মাঝেই পাঠাচ্ছেন কুয়াডাঙ্গায় নিজস্ব খামার থেকে তোলা টাটকা মাছ। তার ছেলে রোটারি গভর্নর ইশতিয়াক জামান তার মধুর হাসির সঙ্গে যোগ করে পাঠিয়ে দেন নানা রকম স্বাদের মিষ্টি, সঙ্গে সুহাসিনী তাহিয়ার নিজস্ব রেসিপির লাজানিয়া যা আমার নাতি-নাতনির অত্যন্ত পছন্দের খাদ্য। কিছুক্ষণ পরে এলো গাছ থেকে পাড়া বিরাট একটি কাঁঠাল, পাঠিয়েছেন রোটারি গভর্নর পিডিজি ইফতেখারুল আলম, যার স্নেহধারা মাঝে মাঝেই বর্ষিত হয় আমাদের উপর। আমার সত্যি সৌভাগ্যের অন্ত নেই, আমি যেটুকু সাধ্য চেষ্টা করি প্রিয়জনকে রান্না করে পাঠাতে। মাঝে অসুস্থ হয়ে একটু দুর্বল হয়ে পড়েছি, তবু ভাবি না হয় আমার লেখা একটি বই পাঠালাম, এও তো মনের খাদ্য। রমজান আসে সিয়ামের বার্তা নিয়ে, কৃচ্ছ তা সাধনের মন্ত্র নিয়ে। পানির অপচয়, বিদ্যুতের অপচয়, খাদ্যের অপচয় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আমার একটু সতর্কতা আরেকজনের কাছে বাঁচার ন্যূনতম চাহিদা হতে পারে। আমার একটু কষ্ট করা আরেকজনের রাতের ঘুম আরামের ঘুম করতে পারে। না খেয়ে থাকলেই রোজা আদায় হয় না, এর সঙ্গে লাগে হূদয়ের সংযম, চিত্তের সংযম, কথার সংযম এবং সর্বোপরি অন্যের দুঃখ অনুভবের আবেগ। গতকাল উদিত হয়েছে যে সোনালী চন্দ্র, তার দিকে তাকিয়ে আমরা সবাই শপথ নেবো সত্ মানুষ হওয়ার, সকল রকম অসত্য, অন্যায় ও অবিচারকে বর্জন করার। মনে হয় এর মাধ্যমেই আমাদের সিয়াম সাধনা হবে সফল। লেখক :শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন