নি র্বা চ ন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব অনভিপ্রেত

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৩, ২১:১০
খুলনা, রাজশাহী, সিলেট এবং বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হলো ১৫ জুন এবং নতুন সিটি করপোরেশন গাজীপুরের নির্বাচন হলো ৬ জুলাই ও সমগ্র দেশবাসী ব্যাপক আগ্রহভরে প্রত্যক্ষ করলো এ নির্বাচনকে। মনে হলো জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে। গণমাধ্যম এমনভাবে প্রচার শুরু করলো প্রতিটি দিন যেন এক একটি নিত্য-নতুন বার্তা বয়ে আনছে। জনগণ অবলোকন করলো অতি আগ্রহভরে প্রতিদিনের পত্রিকা এবং টেলিভিশনের প্রতিবেদন। এ যেন জাতীয় রাজনীতি “করো অথবা মরো”। অফিস-আদালত থেকে শুরু করে গ্রামেগঞ্জের হাট-বাজারের চায়ের দোকান সর্বত্র এমন বিতর্কমূলক আলোচনা, দূরকল্পী ভাবনা। অন্য কোন স্থানীয় সরকারের নির্বাচনকে নিয়ে এমন হয়েছে বলে বাংলাদেশে কোন উদাহরণ নেই। এমনটি হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে জাতীয় রাজনীতিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ভোটারদের দ্বারপ্রান্তে, বির্তকের বিষয়বস্তু হিসাবে। জাতীয় পর্যায়ের নেতারা বিচরণ করেছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে। একপক্ষের কেন্দ্রীয় নেতারা এলাকায় গিয়ে বলেছেন কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাফল্যের কাহিনী, অপরপক্ষ তুলে ধরেছেন তাদের ব্যর্থতা ও অপকর্মের বিশাল তালিকা। এলাকার উন্নয়ন এবং সমস্যার কথা কেন্দ্রীয় নেতারা ভালোভাবে জানেন না, লোকজনদেরও ভালোভাবে চিনেন না। তারা কথা বলেছেন তাদের নিজেদের মুখস্থ করা ছন্দে, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের সুরে এবং বেসুরে। এলাকার জনগণের ভাষা ও ভাবনার সাথে তাদের কথার কোন মিল ছিল না। এক বিস্ময়কর নির্বাচন, যেখানে স্থানীয় সরকারের অস্তিত্ব বা তার মূল্যায়নের সুযোগ বিলুপ্তির পথে। তাই লক্ষ্য করা যায়, এডভোকেট আজমতউল্লা ১৮ বছর টঙ্গি পৌরসভার মেয়র থেকেও এবার ভোটে টঙ্গি এলাকায় ১৩৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০০টি কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন এবং মোট ৩৯২টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৩৪টি কেন্দ্রেই পরাজিত হয়েছেন । নেহাত পুবাইলের এলাকাবাসী প্রয়াত আহসানউল্লা মাস্টারের এলাকার লোকজন কিছুটা তার সন্মান রক্ষা করেছেন । অনুরূপভাবে পদ্মার কূল বয়ে জনাব খায়রুজ্জামান লিটন রাজশাহীকে নতুন রূপ দিতে পেরেছেন, নগরের পরিচ্ছন্নতা বা বিদ্যুত্, গ্যাস সঞ্চালন করে রাজশাহীকে নবরূপে সাজাতে চেয়েছেন, নির্বাচনে তার কথা ও কাজের মূল্যায়ন হয়েছে কি ? অনুরূপভাবে মেয়র আবদুল খালেক নিজে তদারকি করেছেন খুলনা মহানগরকে ভিন্নরূপ প্রর্দশন করতে। হয়তবা এজন্য কর্মীদের সাথে রাগারাগি করেছেন শধু মহানগরের উন্নয়নের স্বার্থে। কিন্তু এ সকল কথা জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনকালে কেন্দ্রীয় নেতারা আলোচনায় তুলে আনতে পারেননি। তাই চলে এসেছে পদ্মা সেতুর কিচ্ছাকাহিনী, শেয়ারবাজারের ফটকাবাজির কাহিনী, হলমার্ক, বিসমিল্লা গ্রুফ ও ডেস্টিনির কেলেঙ্কারি, মতিঝিলের কর্মকাণ্ড, বিশ্বজিত্ হত্যা, হিন্দু ও বৌদ্ধদের মন্দির ধ্বংসসহ আরো অনেক কথা যে সর্ম্পকে স্থানীয় ভোটাররা ভালোভাবে অবহিত নয় বা সম্পর্কিতও নয়। কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে স্থানীয় সরকারের কাঠামো এবং ভাবনাকে বিনষ্ট করেছেন। স্থানীয় নেতাদের দক্ষতা ও ভাবনাকে ভূলণ্ঠিত করেছেন বলে অনেকে মনে করেন। তাই ভবিষ্যতে স্থানীয় নির্বাচনে কোন কেন্দ্রীয় নেতা যদি ঔ এলাকার অধিবাসী না হন, তাকে সেখানে যেতেই দেয়া সঠিক হবে না। নির্বাচন কমিশন বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ৯ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে উত্সাহদান করিবেন এবং এই সকল প্রতিষ্ঠানসমূহে কৃষক, শ্রমিক এবং মহিলাদিগকে যথাসম্ভব বিশেষ প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হইবে”। লক্ষণীয় যে, সংবিধানে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের সক্ষমতা অর্জনকে প্রাধিকার দেয়া হয়েছে এবং এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতাদের সেখানে গিয়ে কোন প্রার্থীকে ভোট দিবেন এ জাতীয় কথা বলাই হচ্ছে সংবিধান বিরোধী। এছাড়াও স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০০৯ ( ২০০৯ সনের ৬০ নং আইন)-এর প্রথম অধ্যায়ে ৩(৬) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “সিটি কর্পোরেশন একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হইবে এবং ইহার স্থায়ী ধারাবাহিকতা ও একটি সাধারণ সীলমোহর থাকিবে এবং এই আইন ও বিধি সাপেক্ষে, ইহার স্থাবর ও অস্থাবর উভয় প্রকার সম্পত্তি অর্জন করিবার, অধিকারে রাখিবার ও হস্তান্তর করিবার ক্ষমতা থাকিবে এবং ইহার নামে ইহা মামলা দায়ের করিতে পারিবে বা ইহার বিরুদ্ধেও মামলা করা যাইবে।” অর্থ হচ্ছে, সিটি কর্পোরেশনসমূহ পৃথক সত্তা ও পরিচয় বহন করে এবং প্রশাসনিক একাংশ বা ইউনিট হিসাবে গণ্য হবে, যা কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে পৃথক। এতএব, কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদগণ সেখানে গিয়ে স্থানীয় জনগণের প্রগতি ও সংগতির ভাবনাকে বিভ্রান্ত করা সঠিক নয়। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন কোন দলের প্রতীকে বা ব্যানারে হয় না। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারের উপর উন্নয়নের দায়িত্ব অর্পণ সরকারের বিঘোষিত নীতি। প্রশাসনের সাথে স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করে মাঠ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করা এবং উন্নয়নের প্রবাহমান স্রোতধারাকে জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনসহ অর্থবহ অগ্রগতি সাধনই হচ্ছে সরকারের লক্ষ্য। বর্তমানে বিশ্বায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কের যুগে শহর এবং গ্রামের মধ্যকার সংযোগ নিবিড় হওয়ার প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকারসমূহকে ক্ষমতায়ন করে এলাকার জনগণের চাহিদা অনুসারে পরিকল্পনা নিতে হবে। এতএব, মহানগর প্রশাসনের নিজস্ব চিন্তাধারাকে কেন্দ্রীয় রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত করা হলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। পক্ষান্তরে, স্থানীয় সরকার ও জনগণের অধিকারে হস্তক্ষেপ বলে বিবোচিত হতে পারে এবং স্থানীয় নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্ঠি হতে পারে। আধুনিক বিশ্বে প্রশাসনের গতি-প্রকৃতি হচ্ছে সর্বস্তরের জনগণকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করে স্বচ্ছতার স্বাক্ষর বহনকারী জবাবদিহিমূলক সরকার পরিচালনা করা। এ অবস্থানের ব্যত্যয় হলে সরকার বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। সন্দেহের সূচনা হয়, গুজব এবং সন্দেহ সরকারের ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করে। তাই স্থানীয় সরকারকে তার নিজের পথে চলতে দিতে হবে। স্থানীয় নেতৃত্বকে তাদের এলাকায় নির্বাচন ও পরিকল্পনা নির্ধারণসহ অর্থের চাহিদা নিরূপণ, জোগান এবং উেসর সন্ধান নিজেদেরকেই করতে হবে। বাংলাদেশে একটি সংস্কৃতি চলে আসছে, যা নিতান্তই অনভিপ্রেত। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা , জিলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদসমূহের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। যদিও আইনে বলা আছে, এ সকল প্রতিষ্ঠান হচ্ছে স্বশাসিত। কিন্তু এ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া এ সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রশাসন পরিচালিত করতে পারে না, নতুন কর নির্ধারণ বা আরোপ করতে পারে না এবং সাংগঠনিক কাঠামোরও অনুমোদন নিতে হয়। এমন কাজে যদি কোন ব্যতিক্রম হয় তবে সেখানকার মেয়র বা চেয়ারম্যান বা নির্বাচিত পরিষদ সুপারসিড ( বাতিল ) হতে পারেন অথবা তার বরাবরে যে থোক বরাদ্দের সুযোগ আছে তা থেকে ঐ পরিষদ বঞ্চিত হতে পারেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১১টি সিটি কর্পোরেশন, ৩১৮টি পৌরসভা, ৪৮০টি উপজেলা পরিষদ, ৬৪টি জেলা পরিষদ এবং ৪৪৫১টি ইউনিয়ন পরিষদ আছে। প্রায় প্রত্যেকটি কোন না কোনভাবে সরকারের কাছে দায়বদ্ধ। তাই ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিবকে দেখা যায় স্থানীয় সরকারের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে। বর্তমান সরকারেও দলের মহাসচিব স্থানীয় সরকারের মন্ত্রী। তবে সৌভাগ্য বর্তমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মহোদয় কোন চেয়ারম্যান বা মেয়রের অধিকারে বা কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করেন না । এভাবে কেন্দ্রীয় রাজনীতি স্থানীয় সরকারসমূহকে প্রভাবিত করলে কোনদিন মাঠ পর্যায়ে নেতৃত্ব যেমন গড়ে উঠবে না এবং একইসঙ্গে এলাকাভিত্তিক প্রতিভাও বিকশিত হবে না । এছাড়া এমন হলে স্থানীয় চাহিদা ও প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন বা তৃণমূলভিত্তিক পরিকল্পনা বিকশিত হবে না। তাই প্রস্তাব হচ্ছে ভবিষ্যতে কোন কেন্দ্রীয় নেতা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাক্কালে যদি ঐ এলাকার অধিবাসী না হন তবে সেখানে গিয়ে কেন্দ্রীয় রাজনীতি নিয়ে প্রচারণা করা থেকে বিরত থাকবেন এবং তাতে দেশের গণমানুষের কল্যাণ হবে। লেখক : সাবেক সচিব

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন