জিএসপি সুবিধা স্থগিত বনাম নিরাপদ কর্মস্থল

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৩, ২১:১০
জিএসপি অর্থাত্ জেনারেল সিস্টেম অফ প্রিফারেন্স বা বাজারে অগ্রাধিকার বাণিজ্য সুবিধার কারণে সাড়া পৃথিবীর প্রায় ১২৫টি দেশের ৫০০০ প্রোডাক্টস আমেরিকাতে ডিউটি-ফ্রিতে প্রবেশ করে থাকে। বাংলাদেশও এই সুবিধা পেয়ে আসছিল। তাছাড়া বাংলাদেশ বছরে যে ১৮ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস বিদেশে রপ্তানি করে থাকে, তাঁর ২৫%-ই (৪.৫ বিলিয়ন) আসে আমেরিকার মার্কেটে। যদিও গার্মেন্টসের উপরে কোনো জিএসপি সুবিধা বাংলাদেশ পেত না। আর এই ১৮ বিলিয়নের মধ্যে ৬০% গার্মেন্টস ইউরোপের বাজারে রপ্তানি হয়ে থাকে। তাই আমেরিকার বাজারে গত মাসে এই জিএসপি সুবিধাটি সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার ফলে অনেকের মনেই আশংকা ছিল যে, এটার একটা নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট হয়তো ইউরোপের বাজারেও পড়তে পারে। আপাতত ইউরোপিও ইউনিয়ন (ইইউ) অবশ্য আমেরিকার পথ ধরে হাঁটছে না বলে জানিয়েছে। গত রবিবার অর্থাত্ ৩০ জুন তারা আশ্বস্ত করেছেন যে কেবল অস্ত্র ছাড়া সব ধরনের পণ্যে ইউরোপে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) পাবে বাংলাদেশ। এটা এখন আমরা জানি যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে পোশাকশিল্প এর একটি ইঞ্জিন হিসাবে কাজ করে আসছে। আর এই ইঞ্জিনের চালকের ভূমিকায় রয়েছেন স্বল্প বেতনের অবহেলিত শ্রমিকরা যারা সংখ্যায় প্রায় ৩২ লাখ ঊর্ধ্ব এবং যাদের মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছেন দেশের সাধারণ মেয়ে ও নারী- যারা ন্যূনতম মূল্যে তাঁদের শ্রম বিক্রি করে উন্নতমানের গার্মেন্টস তৈরির মাধ্যমে আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে ডলারের প্রবাহ নিজ দেশে সঞ্চালনে বিশাল অবদান রাখছেন। এই শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত কাজের পরিবেশ না থাকায় দেশ ও দেশের বাইরে থেকে প্রচুর সমালোচনার ঝড় উঠে বিশেষ করে গত কয়েক বছরে পোশাকশিল্পে উপর্যুপরি কয়েকটি জীবনঘাতী দুর্ঘটনা ঘটার কারণে। অনেক শ্রমিক সে দুর্ঘটনাগুলোতে প্রাণ হারায়। ২০০৫ সালে সাভারে স্পেকট্রামে ৬৪ জনের অধিক, ২০১২ সালের নভেম্বরে আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাক্টরিতে আগুনে দগ্ধ হয়ে শতাধিক, তারপর গত এপ্রিলে সাভারে নয়তলা রানাপ্লাজা ধসে পড়ে ১১৩১ জন নিরীহ শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন এবং আহত ও নিখোঁজও হয় অনেক। এই দুর্ঘটনাগুলোর সচিত্র প্রতিবেদন সাড়া দুনিয়ার মিডিয়াগুলোতে বড় আকারে লিড নিউজ পায়। এর ফলে যা হয় তা হচ্ছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে কর্মরত সাধারণ শ্রমিকদের দৈন্যদশার এক করুণ চিত্রই মূলতঃ বিশ্বব্যাপী মানুষের নিকট দৃষ্টিগোচর হয়। আর এসবের যে একটা প্রভাব আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের কিছু পণ্যের উপর ডিউটি-ফ্রি প্রবেশে বাধা হয়ে আসতে পারে বলে অনেকেই আশংকা করতেন তা অমুলক ছিল না। বিশেষ করে যখন আমেরিকার লেবার ইউনিয়ন ও ক্যাপিটাল হিলের ডেমোক্রাটরা বাংলাদেশের ফ্যাক্টরিগুলোতে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার যে প্রচণ্ড অভাব রয়েছে, সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে ওবামা প্রশাসনের টেবিলে নিয়ে আসেন। ফ্যাক্টরিগুলোতে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা বা ঝুঁকিমুক্ত কাজের পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং সেগুলোতে কাঠামোগত আরো উন্নয়ন সাধনের ফলে কীভাবে শ্রমিকদের অধিকার আরো বাড়ানো যায়, সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তারা ওবামা প্রশাসনের উপরে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত মাসে অর্থাত্ জুনের শেষ সপ্তাহে কংগ্রেসে ওবামা প্রশাসন বাংলাদেশের জন্য এই জিএসপি সুবিধাটি সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেন। মার্কিন প্রশাসন আসলে অগ্রসর দেখতে চায় যে, বাংলাদেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের হয়রানি বন্ধসহ আরো অনেক উন্নয়ন। সেই যথোপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারে দ্রুততম পদক্ষেপ ব্যতীত কোনো ঢিলেঢালা, গড়িমসি বা অজুহাত-ই প্রযোজ্য হবে না। সুতরাং আমেরিকার বাজারে কিছু পণ্যের উপরে জিএসপি সুবিধাটি কেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হল- তা নিয়ে অনেক হৈ চৈ হলেও এর মূলে রয়েছে উপরোক্ত দুর্ঘটনাগুলো এবং কারখানাগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরিবেশ। পাশাপাশি এই বাস্তবতাও আমাদের স্বীকার ও মেনে নেয়া উচিত যে, আমরা দরিদ্র দেশের নাগরিক। পেটের চাহিদায় তাই অনেক সময় অনেক বড় ঝুঁকিই আমরা নিয়ে থাকি। গার্মেন্টস শ্রমিকরাও তাই করছেন। তারা নিরপরাধ। ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে অনন্যোপায় হয়ে তারা ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোতে কাজ করে থাকেন। অন্যদিকে আমাদের দেশের গার্মেন্টস মালিকরা ও সরকার তাঁদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থান তৈরি করতে পারেননি বিধায় উপরের এই দুর্ঘটনাগুলোকে এড়ানো যায়নি, পরিণতিতে অনেক প্রাণই কেবল অকালে ঝরে পড়েছে। আবার বিদেশি বাইয়াররাও এতদিন বাংলাদেশে গার্মেন্টসে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরিবেশের কথা যে জানতেন না তা বিবেচনা করাটাও সমীচীন নয়। আমাদের দেশ থেকে তারা সবকিছু জেনে শুনেই গার্মেন্টস আমদানি করে থাকেন মূলত কম মূল্যে পোশাক পাওয়া যায় সে কারণেই- এতে করে তারা তাঁদের মুনাফার হার বেশি বাড়াতে পারেন সে জন্য। সুতরাং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরিবেশকে নিরাপদ কর্মস্থলে পরিণত করার জন্য সরকার, মালিক ও রিটেইলার সবাইকেই এগিয়ে আসা উচিত। পোশাক শিল্পে একমাত্র ঝুঁকিমুক্ত বা নিরাপদ কাজের পরিবেশই আবার এর সতেজ ভাবমূর্তি ফিরে আনতে পারে বিশ্বব্যাপী। তাই সবার আগে শ্রমিকদের জন্য কিভাবে নিরাপদ কর্মস্থল বাস্তবায়ন করা যায়, একটি শ্রমিকের জীবনও যাতে আর অবহেলায় অকালে ঝরে না যায়, কাউকে যাতে আর পঙ্গু হতে না হয়, আর যাতে কেউ মা, বাবা, স্বামী, স্ত্রী, ভাই, বোন-হারা না হয়-সেই নিশ্চয়তা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেই কাজগুলোর দ্রুত সমাধান করাটায় হচ্ছে এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। আমেরিকার বাজারে জিএসপি সুবিধাটি পুনরায় ফিরে পাবার নিশ্চয়তাও নিহিত রয়েছে নিরাপদ কর্মস্থল বাস্তবায়নের মধ্যেই। পোশাকশিল্প বাঁচলে বা জিয়ে থাকলে দেশের অর্থনীতিও জেগে থাকবে। আর তাঁর সুফল থেকে শ্রমিক, মালিক, সরকার তদুপরি দেশের আপামর জনগণ কেউই বঞ্চিত হবে না। লেখক :যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত alamrowshon¦gmail.com