“তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়, রাতের চাঁদ ও তারারা তাকে ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না।...তিতাস শাহী মেজাজে চলে।”
[‘তিতাস একটি নদীর নাম’, অদ্বৈত মল্লবর্মণ]
তিতাসের দু’পাড়ের মানুষগুলোর জীবন ছিলো নদীর মতই বহমান। ভাঙ্গা-গড়ার সঙ্গী, কোন প্রতিকূলতাই তাদের জীবন স্তব্ধ করে দিতে পারে নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অদূরে তিতাস নদী-তীরবর্তী গোকর্ণঘাট গ্রামে এক জেলে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ক্ষণজন্মা অদ্বৈত মল্লবর্মণ।
তিতাস-পাড়ের মালোদের জীবন-জীবিকা নিয়ে তিনি যে কেবল এক মনোজ্ঞ সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন তা নয়, ওরা যে তার জীবনেরই অংশ। মালোরাই চাঁদা তুলে তাঁর পড়ার খরচ চালাতো। যখন পিতা-মাতার স্নেহ-শাসন-সোহাগে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার কথা, সেই শিশুকালেই তিনি পিতৃ-মাতৃহারা হয়ে নিঃসঙ্গ জীবন সংগ্রামে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন। ১৯৩৩ এ ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হলেও শেষাবধি শেষ করা হয়ে ওঠেনি। জীবিকার সন্ধানে কলকাতা গমন করেন। কলকাতার মাসিক ‘ত্রিপুরা’ পত্রিকায় কর্মজীবন শুরু, কিছুদিন পর ‘নবশক্তি’ তে যোগদান। কিশোর ছাত্র অদ্বৈতের বিদ্যালয়ের দেয়াল পত্রিকা ‘সবুজ’-এ ‘তিতাস’ কবিতা প্রকাশের মধ্যেই নিহিত ছিলো ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের স্বপ্নবীজ। একদিকে আর্থিক টানাপোড়েন, অন্যদিকে নিয়ত সংগ্রামী চিত্তে তিতাস পাড়ের মানুষগুলোর জন্য অপার ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে উপন্যাস লিখতে।
কলকাতায় সীমিত আয়ের কিছু অংশ মালোপাড়ার শিশু-কিশোরদের পড়ালেখার জন্য ব্যয় করতেন। তিতাস পাড়ের মানুষগুলোর জন্য একধরণের দায়বদ্ধতা তাঁকে সারাজীবন ভাবিয়েছে। তাঁর বন্ধুরা অকপটে বলেছেন : “আমরা চিরকাল অদ্বৈতকে তাহার মুষ্টি অন্ন বহুজনের সঙ্গে ভাগ করিয়া খাইতে দেখিয়াছি।” জ্ঞানচর্চা আর অর্ধাহারে অনাহারে শীর্ণ, ক্লিষ্ট মানুষগুলোর প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকেও বহুদিন অনাহার আর অর্ধাহারে থাকতে বাধ্য করেছে। তিতাস আর তিতাস পাড়ের মানুষগুলোর প্রতি দরদ ছিলো যতটা, নিজের প্রতি অযত্ন-অবহেলা ছিলো তার চেয়ে বেশি। “পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন-মন সকলি দাও / তার চেয়ে সুখ কোথাও কী আছে, আপনার কথা ভুলিয়া যাও।” এই ছিলো অদ্বৈত মল্লবর্মণের সকাল-সন্ধার ধ্যান-জ্ঞান।
