জাপানের প্রায় দশ লাখেরও বেশি তরুণ স্বেচ্ছায় নিজেদের গৃহবন্দি করে রাখে। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কারো সঙ্গেই তারা যোগাযোগ রাখে না। এমনও হয়েছে কেউ কেউ টানা এক দশক ঘর হতে বের হয়নি। প্রায় সাত বছর নিজেকে ঘরে আটকে রাখা এক জাপানি তরুণ বলেন, আমার স্কুল ছেড়ে দেয়ার পর থেকেই আমার এই অবস্থা শুরু হয়। আমি নিজেকে এর জন্য দায়ী ভাবতে থাকি; অন্যদিকে বাবা- মাও স্কুলে না যাওয়ার জন্য আমাকে দোষ দিতে থাকে। আমার ওপর ক্রমেই চাপ বাড়তে থাকে। তারপর থেকে আস্তে আস্তে আমি বাইরে যাওয়া কমিয়ে দেই। বাইরে যেতে আমার ভয় লাগে। এমনকি মানুষের সঙ্গে কথা বলতেও। এর পর থেকে আমি চাইলেও ঘরের বাইরে যেতে পারি না। ধীরে ধীরে সব বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিই। সবশেষে পরিবারের সঙ্গে। বাবা-মার সঙ্গে যাতে দেখা না হয় সেজন্য সারাদিন একটি রুমে ঘুমিয়ে কাটাতাম। রাতে ঘুম থেকে উঠে বাকি রাতটুকু টিভি দেখে কাটিয়ে দিতাম। ওই তরুণ বলেন, এ সময় প্রায় সব ধরনের নেতিবাচক আবেগ আমার মধ্যে কাজ করতো। বাইরে যেতে আমার ইচ্ছা করতো ঠিকই। কিন্তু সমাজের প্রতি ও আমার বাবা-মার প্রতি আমার তীব্র রাগ ক্ষোভ সব সময়ই ছিল। আমার এই অবস্থার জন্যও আমার দুঃখ হতো। বাইরে যে যাব, আমার মনে সব সময়ই আশঙ্কা কাজ করতো কী হবে সামনে। যে সব মানুষ বাইরের দুনিয়ায় সাধারণ জীবন-যাপন করছে তাদেরকে আমার খুব হিংসা হতে লাগলো।
এভাবে নিজেকে চারপাশের সবার কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলা, সবকিছু থেকে গুটিয়ে ফেলাকে জাপানিরা বলে হিকিকোমোরি। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতেও এই শব্দটি সংযোজন হয়েছে। এর অর্থ বলা হচ্ছে জাপানে সামাজিক সম্পর্কের অস্বাভাবিক বর্জন। জাপানে হিকিকোমারি দিয়ে সেই সব তরুণদের বোঝাতে ব্যবহূত হচ্ছে যে নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নেয় এবং আশপাশের মানুষ বিষয়টি জানে। মনোচিকিত্সক তামাকি সাইটো ১৯৯০ সালের দিকে গবেষণা করে বিস্মিত হয়ে যান। তিনি দেখতে পান বহু অভিভাবক তাদের সন্তানদের তার কাছে এনে সাহায্য চাইছেন। ওই অভিভাবকদের সন্তানেরা স্কুল ছেড়ে দিয়ে ঘরের মধ্যে নিজেদের লুকিয়ে রাখছে মাসের পর মাস। কখনো তা বছরেও গড়ায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছিল। এদের বেশির ভাগই ছেলে। যাদের গড় বয়স ১৫ বছর। এই বিষয়টি সহজ কথায় কিশোরদের মধ্যে আলস্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাবা-মারা তাদের সন্তানদের জন্য অপেক্ষা করলেও কেন তারা তাদের সঙ্গে দেখা করেন না?
এ প্রসঙ্গে সাইটো বলেন, ওই তরুণরা সমাজের নানা ব্যাপারে ভয় পেয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের মন ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, তারা বাইরের দুনিয়ায় বের হতে চায়, চায় বন্ধু কিংবা ভালোবাসার মানুষ। কিন্তু তারা তা পারে না। রোগী থেকে রোগী ভেদে উপসর্গগুলোও ভিন্ন। এদের কেউ কেউ তাদের মায়ের শরীরে নখ দিয়ে খামছে দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে প্রায় দুই লাখের মতো জাপানি এই রোগে আক্রান্ত। কিন্তু ২০১০ সালে জাপানের মন্ত্রিপরিষদ অফিসের এক জরিপে দেখা গেছে, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাত লাখেরও বেশি। কিন্তু মনোচিকিত্সক সাইটোর মতে, এই সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। গত দুই দশকে হিকিকোমোরিদের গড় বয়স বেড়েছে। আগে এই রোগে আক্রান্তদের গড় বয়স ছিল ২১। এটা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২।
দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সন্তানদের উপর প্রত্যাশার চাপ এবং চাপ সইতে না পারা থেকে তরুণদের মধ্যে এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মাতসু নামের একজন জানান, তার সবকিছুই ঠিক ছিলো। কিন্তু বাবা মা আমাকে যে জন্য জোরাজুরি করতো তা আমার ভাল লাগতো না। তিনি বলেন, আমার বাবা ছিলেন একজন শিল্পী এবং তিনি নিজে তার ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তিনি চাইতেন আমি তার মতো হই। কিন্তু মাতসু একটি বড় প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার প্রোগ্রামার হতে চাইতেন। জাপানের বৃহত্ করপোরেট প্রতিষ্ঠান ‘স্যালারিমেন’র মতো কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে চাইতেন। কিন্তু তার বাবা তাকে বলতে থাকে, সামনে এমন একটি সময় আসবে যখন এই ধরনের চাকরির কোন মূল্য থাকবে না। অন্য হিকিকোমোরিদের মতো মাতসুও পিতা-মাতার এই প্রত্যাশার চাপ সইতে পারলেন না। পরিবারের বড় ছেলে মাতসু যখন দেখলো তার ছোট ভাই নিজের মতো ভবিষ্যত্ গড়ছে এবং বাবা-মা কিছু বলছে না এটা তাকে ক্ষুব্ধ করে ফেলে। তিনি বলেন, আমার মধ্যে প্রচণ্ড হিংসা কাজ করতে থাকলো এবং আমি পরিবারের সবার সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করে দিই।
ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোর শিক্ষাবিদ অ্যান্ডি ফারলং শিক্ষাক্ষেত্র থেকে চাকরিতে যোগদানের এই সময়টা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি হিকিকোমোরির সংখ্যা বৃদ্ধি ও জাপানের ১৯৮০ সালের জাপানের বাবল অর্থনীতি এবং ১৯৯০ সালের মন্দার মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখতে পেয়েছেন। চাকরি প্রত্যাশী জাপানিদের বলা হয় ফ্রিটার্স। ফ্রিল্যান্স ও অরবিটার শব্দ দুটো মিলিয়ে শব্দটি হয়েছে। ফ্রিটার্সদের আবার ‘নিটস’ এর সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা হয়। যার অর্থ যাদের শিক্ষা, চাকরি কিংবা কোন প্রশিক্ষণ নেই। এই নিটস, ফ্রিটার্স ও হিকিকোমোরিদের অভিহিত করা হয় কোন কিছুতেই দক্ষ নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্য পরজীবী হিসেবে। এগুলো তরুণদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। তারা মনে করে তারা পৃথিবীর কোন কাজের জন্যই যোগ্য নয়। এক সময় তাদের মধ্যে কাজ করতে থাকে হতাশা। শুধু জাপানই নয়, কোরিয়া ও ইটালির তরুণদের মধ্যেও এই ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, যেসব দেশে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, এবং তরুণরা তাদের প্রত্যাশিত কাজ পাচ্ছে না সেই সব দেশে তরুণদের মধ্যে হতাশা ব্যাপক কাজ করে। মনোচিকিত্সকরা বলছেন, পরিবার পরিজন যদি এই তরুণদের উপর থেকে প্রত্যাশার চাপ প্রত্যাহার করে নেন তাহলে তরুণরা সুস্থ হয়ে আবারও পরিবারে ফিরে আসবে।
