তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা এবং আজকের রাজনীতির বাস্তবতা

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২০:৪৩
আজকের রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক অবস্থার মধ্যে বেশ কিছুদিন আমরা ভালই ছিলাম- অন্তত নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে একটি নিশ্চয়তা কাজ করতো। কিন্তু ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি শর্তানুযায়ী তিন মাস না থেকে দুই বছর ক্ষমতায় থাকলে এ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। গুঞ্জন শুরু হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অস্তিত্বের প্রশ্নে। এরই মধ্যে ২০১১ সালের মে মাসে বাংলাদেশের সুপ্রীম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পূর্বেই তড়িঘড়ি করে বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে ২৯১-১ ভোটে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। রায়ে বাস্তবতার খাতিরে আরও দুটি টার্মের জন্য তাদের দ্বারা ঘোষিত অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি রাখা যেতে পারে যদি জাতীয় সংসদ অনুমোদন করে এমন একটি অবজার্ভেশনও সুপ্রীম কোর্ট প্রদান করেন। কিন্তু সংসদের অধিকাংশ সদস্যগণ তেমন ব্যবস্থা চাননি। তাই সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বাতিল হয়ে গিয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশে না ঘটে অন্য কোন গণতান্ত্রিক দেশে ঘটলে হয়তো বা এখানেই এর ইতি টানা যেত। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর ইতিটানা সম্ভব হয়নি। বলটি গড়াতে থেকেছে আওয়ামী লীগ আর বিএনপির রাজনৈতিক মাঠে। কিন্তু স্থির কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি এই দু’টি দল। একদিকে আওয়ামী লীগ গোঁ ধরে বসে আছে- কোনভাবেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নয়। অন্যদিকে বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচন করবে না। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তার চাই-ই-চাই। এক দলের অন্য দলের উপর কোন বিশ্বাস নেই, আস্থা নেই। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলে বিরোধী দল একটি লেভেল গ্রাউন্ড পেতে পারে এমনটাই বিশ্বাস বিরোধী দলের। অন্যদিকে নির্বাচনী কন্ট্রোলকে নিজেদের সুবিধার মধ্যে রাখতে গিয়ে সরকারি দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা মেনে নিতে পারছে না। যে দেশের দুই প্রধান দলের দুই শীর্ষ নেত্রী একজন আর একজনের ছায়াও মাড়াতে চান না, একজনের কথা ও কাজে অন্যজনের গায়ে ফুঁসকা পড়ার উপক্রম হয়, সেই দেশে অন্তত নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ভাল হয়। তবে বিষয়টি যেহেতু আইন এবং সংবিধান প্রশ্নে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে, এখন আদালতের রায়কেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এমনটাই নিয়ম। তাই এ নিয়ে তেমন কথা বলার সুযোগ নেই। শুধু সুযোগ আছে ঐ সর্বোচ্চ আদালতের সামনের দুই টার্মে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা থাকতে পারে এমন প্রস্তাবনার জন্য। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই দুই দল নির্বাচনে অংশ না নিলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই দুই দলের একদল অন্য দলের কোন কাজকেই কখনও সমর্থন প্রদান করে না। সুতরাং আওয়ামী লীগের হাতে নির্বাচন হলে এবং সেই নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে শুধু সেক্ষেত্রেই বিএনপি সেই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলবে; অন্যথায় নয়। নির্বাচন যতটাই স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হোক, যদি তাতে আওয়ামী লীগের বিজয় ঘটে তবে কোনভাবেই সেই নির্বাচনের ফলাফল বিএনপি মেনে নেবে না। এটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে বলে যে এমনটা হচ্ছে তা কিন্তু নয়। এখানে যদি বিএনপি ক্ষমতায় থাকতো তাহলেও একেবারেই এমনটাই হতো- তারাও তখন বিএনপির অধীনে কোন নির্বাচন মেনে নিত না। তাহলে স্থায়ী সমাধান পদ্ধতি কোথায়? তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কোন স্থায়ী সমাধান নয়। অপরদিকে এই বিধানটি সর্বোচ্চ আদালতে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। তাই আমাদের রাজনীতিকে ফিরে যেতেই হবে দলীয় নির্বাচনের দিকে। তবে প্রশ্নটা হলো-তা কখন? এখনই, না দু’টি নির্বাচনের পর? সামনের দু’টি নির্বাচনের পর যদি আবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে ফিরে যেতে হয় তবে সেই সময়ের বিরোধী দল কি তা মেনে নেবে? এ সমস্ত প্রশ্নগুলো আলোচিত হতে পারত বিরোধী দল এবং সরকারি দলের মধ্যে সংসদে। কিন্তু সেই সুযোগটি বিরোধী দল গ্রহণ করেনি। তারা বরং রাজপথের আন্দোলন থেকেই তাদের দাবিকৃত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদায় করে নিতে চাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল এবং রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে সর্বোচ্চ নেগেটিভ একটি ব্যবস্থা। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই এমন একটি কঠিন বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা। কিন্তু তারপরও শুধু বাংলাদেশেই এর অস্তিত্ব আছে এমনটা নয়। পাকিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, গ্রীস, অষ্ট্রেলিয়া এবং মালিতেও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অস্তিত্ব আছে। বাংলাদেশের সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রধান দুই দলের অসহিষ্ণুতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এক দল আর এক দলকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তাই হয়তো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটির কথা এখানে রাজনীতিবিদরা এক সময় ভেবেছিলেন। যে সময়টিতে তারা এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন এবং একটি সিদ্ধান্তে এসেছিলেন সেই সময় থেকে আজকের দিনে এসেও তারা খুব বেশি সামনে হাঁটতে পারেননি। তাই আজও এই দেশে হয়তো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়কের প্রয়োজন রয়েছে। তারপরও কথা থেকে যায়। কি হবে আরও দু’টি নির্বাচনের পর? কি সমাধান হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান নির্বাচনের ব্যাপারে? প্রশ্নগুলোর উত্তর কারও জানা নেই। তাই সমাধান নয় বরং প্রশ্নের পর প্রশ্নই সামনে এগিয়ে আসে শুধু। সবকিছু মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ইস্যু নিয়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি ক্রমশ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতিকে এই সংঘাতের পথ থেকে উদ্ধার করতে পারে বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা থাকবে অথবা থাকবে না এমন একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছে আজকের এই রাজনৈতিক প্রশ্নটি। মাঝামাঝিও যদি কিছু বের করতে হয় তাও এই দু’টি রাজনৈতিক দলকেই বের করতে হবে। ইতিমধ্যে বড় দু’টি দলই নিজেদের মধ্যে আস্থার জায়গাটি করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। কারও প্রতি কারও কোন বিশ্বাস নেই। এমন করে রাজনীতি করা যায় না- এই সত্যতা এখনও এই বড় দল দু’টি বুঝতে সমর্থ হয়নি। তাদেরকে অবশ্যই আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে হবে- একে অপরকে ছাড় দিতে হবে। দেশের পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। দেশের মানুষের শান্তির জন্য যে কোন দলকে ছাড় দিতে হবে। আর তা করতে ব্যর্থ হলে সংঘাত অনিবার্য। সেই সংঘাতে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ্রদেশের জনগণ, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই বড় দু’টি দলের রাজনীতিও। ভবিষ্যতের ভাষা, জনগণের ভাষা এবং সর্বোপরি রাজনীতির ভাষা যদি বুঝতে ভুল করে এই দু’টি দল তবে তাদেরকে এবার সম্ভবত রাজনৈতিকভাবে বড় মাশুল দিতে হতে পারে। লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা