পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তহীন অস্থিরতা

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৭
অনিয়ম-অস্থিরতাই যেন বিধিলিপি হইয়া দাঁড়াইয়াছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির। শিক্ষার মূল লক্ষ্যকে ছাপাইয়া উঠিয়াছে শিক্ষকদের ক্ষমতার কদর্য লড়াই ও দলাদলি। অনিশ্চিত হইয়া পড়িয়াছে পরীক্ষাসহ স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। সেই সাথে দ্রুত নামিয়া যাইতেছে শিক্ষার সামগ্রিক মান। আর অনিবার্যভাবে ইহার কুফল ভোগ করিতেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কিন্তু জনগণের অর্থে পরিচালিত এইসব প্রতিষ্ঠানকে অন্তহীন এই অস্থিরতা ও নৈরাজ্য হইতে উদ্ধারের কার্যকর কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান নহে। ফলে দিনে দিনে সংকট আরও ঘনীভূত হইতেছে। প্রকটাকার ধারণ করিতেছে শিক্ষার্থীদের হতাশা। উল্লেখ্য যে, উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে প্রায় তিন সপ্তাহ যাবত্ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করিয়া রাখিয়াছে শিক্ষক সমিতি। সরকার-সমর্থক শিক্ষকদের সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদে’র আন্দোলনের কারণে অচল হইয়া পড়িয়াছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিমধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক জোট সমর্থক শিক্ষকরাও শরিক হইয়াছেন মূলত উপাচার্যবিরোধী সেই আন্দোলনে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা নূতন নহে। ছাত্রদল কর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ তাহাতে নূতন করিয়া ঘৃতাহুতি করিয়াছে মাত্র। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রটি এককথায় মর্মান্তিক। পরীক্ষা শুরুর দাবিতে লাগাতার অনশন করিয়া অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছেন ২৭ জন শিক্ষার্থী। তাহাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করিয়াছেন যে, ডিন নিয়োগ লইয়া নিজেদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তির কারণে শিক্ষকরা তাহাদের ‘জিম্মি’ করিয়া ফেলিয়াছেন। অনিশ্চিত হইয়া পড়িয়াছে তাহাদের পরীক্ষা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান অস্থিরতার অন্তর্নিহিত বাস্তবতাটি অনুধাবন করিবার জন্য এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে। অপরাপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির চিত্রও যে ভিন্ন নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুরূপ অস্থিরতার অভিজ্ঞতাও বেশিদিনের আগের নহে। দেখা যাইতেছে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অস্থিরতার মূলে রহিয়াছে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও দলাদলি। এই দলাদলি মূলত ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থকেন্দ্রিক। আজ্ঞাবহ ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ে নিয়োগ প্রদান এবং দলীয় বিবেচনায় বিশেষ বিশেষ শিক্ষকদের মধ্যে যথেচ্ছ সুযোগ-সুবিধা বন্টনের রেওয়াজ চলিয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই যে ইহার উদ্দেশ্য তাহাও সুবিদিত। কিন্তু এই একচোখা ও ভ্রান্ত নীতির কারণে বর্তমানে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে যে, সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধা বন্টন করিয়াও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাইতেছে না। হালুয়া-রুটির ভাগাভাগি লইয়া তাহারা এখন নিজেরাই লিপ্ত হইয়াছে অন্তহীন এক অন্তর্কলহে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের নিয়োগ দেওয়া উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করিতেছে সরকার-সমর্থক শিক্ষকদেরই এক বা একাধিক গ্রুপ। সর্বাপেক্ষা পরিতাপের বিষয় হইল, বিশ্ববিদ্যালয় সচল রাখা যাহাদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য—সেই শিক্ষকদের একটি অংশই এখন এই ক্ষেত্রে গুরুতর বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হইয়া যাহারা ক্ষমতায় আসেন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে তাহাদের পছন্দ থাকা দোষের নহে। কিন্তু এই পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি যখন দলান্ধতায় পরিণত হয় এবং মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিষ্ঠাসহ প্রতিষ্ঠিত সকল নিয়মনীতিই যখন তাহার নিকট পরাস্ত হইতে থাকে—তখনই এই ধরনের অস্থিরতা তথা নৈরাজ্যকর অবস্থা অনিবার্য হইয়া ওঠে। কারণ নীতি-আদর্শ ও অধ্যবসায় গৌণ হইয়া যায়। দুর্নীতি ও দলবাজিসহ সর্বপ্রকার নীতিহীনতাই হইয়া ওঠে রাতারাতি তরক্কি হাসিলের মূলমন্ত্র। ফলে নিরন্তর নিভৃত জ্ঞানসাধনার মধ্য দিয়া প্রকৃত শিক্ষকের যোগ্যতা অর্জনের চাইতে ক্ষমতাসীনদের কৃপাদৃষ্টি বা অনুগ্রহ অর্জনই অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া বিবেচিত হয়। অনুরূপ অনুগ্রহপ্রার্থী শিক্ষকের আধিক্য ঘটিলে দ্বন্দ্ব ও দলাদলি তো হইবেই। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও ঠিক তাহাই ঘটিয়া চলিয়াছে। উচ্চশিক্ষার মান যে নিম্নগামী তাহা লইয়া দ্বিমত নাই। এখন যাহা চলিতেছে শক্ত হাতে সেই সর্বনাশা দলাদলির লাগাম টানিয়া ধরা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অস্তিত্বই যে সংকটাপন্ন হইয়া পড়িবে— তাহাও অনুধাবন করা কঠিন নহে। কিন্তু প্রশ্ন হইল, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধিবে কে?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন