৪২ লাখ ডলার বনাম একটি সামান্য চাকরি

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৮
লিমনের বয়স মাত্র ১৬ বছর। সে যেন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে যেতে পারে সেজন্যে সরকার লিমনের বিরুদ্ধে র্যাবের করা মামলা দু’টি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঝালকাঠির কলেজ ছাত্র লিমন ভুলবশত র্যাবের নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ে। উপরন্তু প্রায় দীর্ঘ আড়াই বছর র্যাবের করা মামলায় হয়রানিতে দুঃসহ এক জীবন পাড়ি দিতে থাকে। দেশবাসীও মেনে নিতে পারেনি বিষয়টি। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকা, মিডিয়া ও সর্বস্তরের জনসাধারণ বিভিন্ন সময়ে সোচ্চার ছিল প্রতিবাদে। কিন্তু আমাদের দেশে নিরীহ জনগণের প্রতিবাদের ভাষা বড় দুর্বল। অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের যে উপাদান বিদ্যমান তাদের ভুল-ভ্রান্তি হলে সেটাকে জায়েজ করার প্রচেষ্টায় আমাদের ভাগ্য নির্ধারণের মূল সরঞ্জাম সরকার আর বেশি মরিয়া হয়ে পড়ে। পৃথিবীর বহু উন্নত দেশেও ভুলের স্বীকার হয়ে নিরীহ লোককে বরণ করতে হয়েছে যন্ত্রণা। কিন্তু সে দেশে যখন ভুল বুঝতে পারে তখন মিথ্যা বা অন্যায় দিয়ে অথবা ভুলের স্বীকার নিরীহ জনসাধারণকে আরও বেশি দুঃসহ পরিস্থিতিতে ফেলে জল ঘোলা করে না সরকার। সেখানে অবশ্য জনসাধারণ আমাদের মত গুলিস্তানে ফুটপাতে বিক্রি হওয়া সস্তা পণ্যের মত নয়। তারা রাতারাতি সবকিছু ভুলেও যায় না। রাজনীতিবিদদের, সরকারের বা সরকারি প্রশাসনের কোন ভুল-ভ্রান্তি হলে তার খেসারত তাদের টানতে হয়। আমাদের এখানে যে যত বেশি গুণ্ডামিতে অভ্যস্ত, যে যত বেশি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে আমরা তাদের কাছে তত বেশি মাথা নত করে থাকি। তাদের পূজনীয় মনে করি। তাদের তাঁবেদারীতে আমাদের মনে খই ফুটতে থাকে। সে কারণে খোদ আদালত আঙ্গিনায় উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাও পিস্তল ঠেকিয়ে শাসাতে পারেন। কর্মকর্তার দোষ নেই কারণ তিনিও বুঝেন টিকে থাকার এটাই যে এ দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পকলা। লিমন ভুলের স্বীকার হয়ে পঙ্গু হয়েছে এটা মেনে নিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো যেতো। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো। ভুল কাজটি সঠিক প্রমাণের জন্যে আরও ভুল পথে এগিয়েছে সরকার। লিমনের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা ঠুকে পরিবারশুদ্ধ ভুগিয়েছে। দেশবাসীকে করেছে মর্মাহত। আমাদের হূদয় আরো বেশি ভেঙ্গে পড়ে যখন শুনি মানবাধিকার সংস্থার প্রধান এক্ষেত্রে আপোষ মীমাংসার কথা তোলেন। গত ৭ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ বিভাগ থেকে বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ডরনারকে ধরতে যেয়ে পুলিশী অভিযান পরিচালনার সময় ভুল করে গুলি চালায় পত্রিকার বিতরণের কাজে নিয়োজিত মা এমা ও মেয়ে মারজির গাড়িতে। এতে গুলিবিদ্ধ হয় মা এবং কাঁচের টুকরো লেগে আহত হয় মেয়ে মারজি। তারা এই দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতে মামলা করেন। লস এঞ্জেলসের আদালত মা ও মেয়ে প্রত্যেককে ২১ লাখ ডলার করে মোট ৪২ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আইনি ও চিকিত্সা খরচ এবং মানবিক যে ক্ষতি তাদের হয়েছে সেটাকে পূরণের জন্যে এ অর্থ দেয়া হচ্ছে। আমাদের লিমন খুব খুশি সরকারের মামলা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তে। তার মায়ের ছোট্ট একটি আবদার কলেজ পড়ুয়া এই ছাত্রের জীবন-জীবিকার জন্যে একটি সামান্য চাকরি। হায়রে বাংলাদেশ ! শত সাধে বোনা ৪২ বছরের এই স্বাধীনতায় সাধারণের প্রত্যাশা কত ক্ষুদ্র। তবুও সরকারকে সাধুবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই লিমনের পাশে দাঁড়াবার জন্যে। আমরা আরও আন্দোলিত হতাম যদি লিমনের পাশে আরও আগে দাঁড়াতো সরকার। ভোটের আগে এই সিদ্ধান্ত আমাদের এখনও ভাবায়- আমাদের কে আছে ? যে রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশ/র্যাব আমাদের সাধারণের কাছে অতি ভরসার তাদের মাধ্যমে যখন আমরা দলিত-মথিত হই, প্রতি সেকেণ্ডে প্রহর গুনি অজানা আশংকায়, তখন সে রাষ্ট্রের কি থাকে নিজের আর কিবা পেতে পারে অন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে। বিশেষ করে যখন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে প্রকাশিত হয় ৯৩-৮৯ ভাগ মানুষ মনে করে রাজনৈতিক দল, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। আমাদের ভাল থাকার স্বপ্ন কি দুঃস্বপ্ন রয়ে যাবে আরও বহুকাল? র্যাব, পুলিশ বিচার ব্যবস্থায় নিয়োজিতরা, রাজনীতিবিদ ও আমরা সবাই যে বাঙালি। আমাদের সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, আবেগ সবকিছুর রং তো একই। তাহলে কেনো বিভেদে বিভেদে তুলে দিচ্ছি এই দেশমাতাকে আবারও ধর্ষিত হওয়ার পথে। লিমন সাধারণ, নিরীহ। তাই লিমন আমাদের সাধারণের প্রতীক। তাই দেরিতে হলেও সরকারের এই সিদ্ধান্ত (যদিও সরকারের এই সিদ্ধান্তের নির্দেশনা গত ১০ জুলাই পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের হাতে পৌঁছায়নি) এবং পরিশেষে তার একটি সুন্দর ভবিষ্যত্ পরিচালনায় তার ও তার পরিবারের আর্থিক ভিত তৈরি করে দিলে সরকার পরিচালনায় যে রাজনৈতিক দলটি রয়েছে তারা আমাদের কাছে হাজারো বেদনায় একঝলক ভালো লাগা হয়েই থাকবে। ভোটের ফলাফলে এর প্রতিক্রিয়া থাকুক আর নাই থাকুক। রাজনীতিবিদও মরণশীল। অন্তত আমাদের একটু আশান্বিত হওয়া, একটু ভালো লাগা, ঐপারে কিছুটা হলেও কাজে লাগবে তাদের। উপরে উল্লেখিত ঘটনায় মা ও মেয়ের গুলিবিদ্ধ হওয়া ও আহত হওয়া বিশ্ববাসীকে যতটা নিরাশ করেছে আমি নিশ্চিত তার চেয়ে বেশি আশান্বিত করেছে বিচার ব্যবস্থায় তাদের সুপ্রাপ্তি। লেখক :ব্যাংকার ই-মেইল ঃ [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন