আলোকপাত

ঢাবির লোকপ্রশাসন বিভাগের ৪০ বছর

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৯
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠাকালে এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পশ্চাত্পদ পূর্ব বাংলার উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা। পরবর্তীতে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই যে ভাষাভিত্তিক একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদ্বয়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবে, এটি বোধ করি এর উদ্যোক্তাদের কারো চিন্তাতেই ছিল না। তো, সেই চিন্তার অগম্যতাকে পেছনে ফেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন স্বাধীন বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করলো, তখন সে যাত্রার একেবারে গোড়াতেই একটি নতুন দেশের আবেগ ও প্রয়োজনকে ধারণ করে সেখানে যে বিভাগটির যাত্রা শুরু হয়। সেটি হচ্ছে লোকপ্রশাসন। অর্থাত্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা বলতে গেলে প্রায় সমবয়সী। আর এ বছরই স্বাধীনতার প্রায় সমবয়সী এই লোকপ্রশাসন বিভাগেরও ৪০ বছর পূর্ণ হলো। সে উপলক্ষে এর প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদেরকে জানাই সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা, যাদের অধিকাংশরাই আজ আর বেঁচে নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য যেমনি নানাদিক থেকে পশ্চাত্পদ এ ভূখণ্ডে উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মোচন, লোকপ্রশাসন বিভাগ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যও তেমনি ছিল পাকিস্তানের ২৩ বছরের বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রনীতির মধ্য দিয়ে সৃষ্ট জনবিচ্ছিন্ন প্রশাসনকে গণমুখী করে তোলার লক্ষ্যে দক্ষ মানবসম্পদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণা সৃষ্টি। ঢাবির লোকপ্রশাসন বিভাগ উল্লিখিত উদ্দেশ্য অর্জনে কতোটা সফল হয়েছে, এক বাক্যে তার জবাব দেয়া একেবারেই অসম্ভব। তবে এক বাক্যে যেটি বলা যেতে পারে তা হচ্ছে, বিভাগটি তার ৪০ বছরের কর্মকাণ্ড দিয়ে এর প্রতি রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক শিক্ষার্থী ও গবেষক এবং একই সঙ্গে শিক্ষিত সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। এ বিভাগে অধ্যয়নের ব্যাপারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমনি নিবিড় আগ্রহ রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক কর্মকৌশল নির্ধারণ ও সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় চিন্তা ও ধারণা দিয়ে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান রাখবে সে রকম একটি প্রত্যাশাও ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। বলা যেতে পারে যে, লোকপ্রশাসন বিভাগের বিগত ৪০ বছরের পথপরিক্রমায় এটিই তার সবচেয়ে অবদান। ঢাবির লোকপ্রশাসন বিভাগ যখন যাত্রা শুরু করে তখন অন্যান্য বিভাগের অনেক শিক্ষকরাই এখানে খণ্ডকালীন ভিত্তিতে ক্লাস নিতেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকরা ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা ও পরিসংখ্যান বিভাগের। আজ চার দশক পর এ বিভাগের অনেক শিক্ষক অন্য অনেক বিভাগের শিক্ষাদান কার্যক্রমে সহযোগিতাদান, এমনকি প্রতিষ্ঠার সাথেও যুক্ত। এখান থেকে পাস করে বেরিয়ে যাওয়াদের হাত দিয়েই ক্রমান্বয়ে দেশের অন্য আরো অন্তত ৮টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র লোকপ্রশাসন বিভাগ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এবং এরাই বস্তুত বাংলাদেশে লোকপ্রশাসনের অধ্যয়নিক চর্চা, গবেষণা ও শিক্ষাদান কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা এখন পৃথিবীর বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথেই এখন ঢাবির লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়ে কার্যক্রম চালু রয়েছে। লোকপ্রশাসন বিভাগের সম্মানিত শিক্ষকগণের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলি, লোকপ্রশাসনের সাথে সম্পর্কিত দক্ষ পেশাজীবীদের প্রায়োগিক জ্ঞানের বিষয়টিকে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কার্যক্রমের সাথে যুক্ত করা যেত, তাহলে সেখানকার শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞানের ক্ষেত্রেও আরো অনেক বেশি পরিপুষ্ট হয়ে ওঠতে সক্ষম হতেন এবং কর্মক্ষেত্রে দক্ষ ও সফল পেশাজীবী হয়ে ওঠার বস্তুত এটাই অন্যতম পূর্বশর্ত। অতএব সে শর্ত পূরণে লোকপ্রশাসন বিভাগ যত দ্রুত এগিয়ে আসবে, এ বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা ততোই অধিক হারে বিশ্বব্যাপী সফল পেশাজীবী হিসেবে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ বছরের বয়স্কাল ও তার বিশাল কর্মযজ্ঞের পরিধিতে লোকপ্রশাসন বিভাগের ৪০ বছর পূর্তির ঘটনা তেমন বড় কোনো মাইলফলক না হলেও তা একেবারে উপেক্ষণীয়ও নয়। বিগত ৪০ বছরের ব্যবধানে এ বিভাগের শিক্ষক-গবেষক ও এখান থেকে পাস করে বেরিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা মিলে বাংলাদেশের সমাজে যতটুকু অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো ও তার আর্থ-সামাজিক মানদণ্ডে সেটি পর্যাপ্ত না হলেও নেহায়েত কমও নয়। তবে স্বীকার্য যে, তা আরো বেশি হতে পারতো এবং বস্তুত সে উপলব্ধি থেকেই বলতে চাই যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ যখন তার সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে পৌঁছাবে আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণ করবে তার জন্মের শতবর্ষ, তখন লোকপ্রশাসন বিভাগও যেন তার প্রতিষ্ঠার অর্ধশত বর্ষে দাঁড়িয়ে একটি অধিকতর সুশাসিত রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায় নিজেদের অবদানটুকুকে আরো শানিত ও লক্ষ্যযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হবে সেটাই প্রত্যাশা। লেখক :পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন