অভিনব সব কাণ্ড-কারখানা হর-হামেশাই চলে এই দেশে। দেশ পরিচালক, সাংসদ বা আইন প্রণেতাগণ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অভিনব ঘটনা ঘটানোর প্রবণতা দেখা যায় এইখানে। যাহা কিনা তাহাদের পদমর্যাদা বা আত্মমর্যাদার সহিত একেবারেই মানায় না এমন সব ধরনের কাণ্ডকীর্তিও ঘটে অবলীলায়। গত শনিবারের ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি সংবাদে বলা হয়েছে যে, নীলফামারীর দুই সাংসদের কাণ্ড-কীর্তিতে বহু কাঙ্ক্ষিত বরেন্দ্র ও নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের শুভযাত্রা শুরু হইতে পারে নাই। স্থানীয় এই দুই এমপির মধ্যে এই শুভযাত্রা উদ্বোধন উপলক্ষে কে ফিতা কাটিবেন ইহা লইয়া সৃষ্ট দ্বন্দ্বের কারণে ঐ যাত্রা আর শুরু হইতে পারে নাই। অথচ গত ১০ জুলাই হইতে দেশের সর্ব উত্তরের রেলস্টেশন নীলফামারীর চিলাহাটি হইতে রাজশাহী অভিমুখে বরেন্দ্র এবং ঢাকা অভিমুখে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল শুরুর কথা ছিল। খবরে বলা হইয়াছে যে, মহিলা সংসদ সদস্য ড. হামিদা বানুকে বাদ দিয়া এই ট্রেন চলাচলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় এই বিপত্তি ঘটে। সংরক্ষিত আসনের হইলেও হামিদা বানু স্থানীয় এমপি এবং সে মত অবস্থায় স্থানীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাহাকে বাদ রাখিয়া কোন কিছু করার চেষ্টা অবশেষে জনকল্যাণের কাজটিকেই বাধাগ্রস্ত করিয়া তুলিয়াছে। ঐ এলাকার নির্বাচিত এমপি হইলেন জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, যিনি জাতীয় পার্টি হইতে নির্বাচিত হইয়াছেন। ঐ ট্রেন চলাচল উদ্বোধনের জন্য ফিতা কাটিবার কাঁচি তাহার হাতে থাকিলেও মহিলা এমপির ঘোর আপত্তির মুখে ঐ ফিতা তিনি আর কাটিতে পারেন নাই। আর ইহার পরিণতিতে স্থানীয় জনগণের বহু কাঙ্ক্ষিত ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হইয়াছে।
উল্লেখ্য, এমপিরা নির্বাচিত হন জনগণের সেবা করার উদ্দেশ্যকে সামনে রাখিয়া, অবিশ্যি, বাস্তবে তাহা কতটুকু তাহারা করেন বা করিতে পারেন সে বিতর্কে না যাইয়াও বলা চলে যে, সংসদ নির্বাচনকালে নিদেনপক্ষে মৌখিকভাবে হইলেও প্রতিশ্রুতির যে বিশাল তালিকা প্রার্থীরা ভোটারদের নিকট উপস্থাপন করেন তাহা ভোটারদের মনে রেখাপাত করিলেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া প্রার্থীর জন্য সহজতর হইয়া যায়। প্রতিশ্রুতির পাহাড় এইভাবে রচিত হইলেও সংসদের মেয়াদ সমাপনান্তে যখন উহা পূরণের ব্যাপারে ভোটাররা হিসেব-নিকেশ করেন তখন কাজীর অনেক গরুকে কেতাবেই দেখিতে পান গোয়ালে নহে। আর জনগণকে সেবা দিতে না পারিলে পরের মেয়াদে নির্বাচনে জয়ী হইবার সম্ভাবনা ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া দাঁড়ায় ইহাতো বলাই বাহুল্য। ফলে এলাকার উন্নয়ন কিংবা সেবামূলক কাজে সাংসদদের প্রত্যক্ষ অবদান রহিয়াছে ইহা ভোটার বা স্থানীয় বাসিন্দাদের গোচরে আনা প্রার্থী বা এমপিদের পক্ষে অতিশয় জরুরি কাজ হইয়া দাঁড়ায়।
নীলফামারীর এই রেল চলাচল উদ্বোধনকে ঘিরিয়া সৃষ্ট ঐ দ্বন্দ্বের কারণও একটিই। আর উহা হইল : এলাকার এই যে রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা প্রবর্তিত হইতে চলিয়াছে উহাতে এমপি সাহেব বা সাহেবার ভূমিকা ও অবদানের বিষয়টি জনসাধারণের তথা ভোটারদের গোচরীভূত করা। পরের নির্বাচনে জিতিতে হইলে এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে এমপির সাফল্যরূপে চিহ্নিত করিয়া তাহার সফলতার তালিকা বৃদ্ধির প্রয়োজন দেখা দেয় বৈকি! কিন্তু যে জনসাধারণের খেদমতের জন্য এই ব্যবস্থা সে ব্যবস্থাটি প্রবর্তনের চাইতে স্বীয় সাফল্য বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি যখন গুরুত্ব লাভ করে তখনই গোল বাধে। নীলফামারীর এই ঘটনা এই রূপ গোল বাধিবারই স্বাক্ষর বহন করিতেছে। আসলে জনগণের উপকারে কাজ করিলে জনগণই তাহাকে খুঁজিয়া বাহির করে এবং ভোট দেয়, ইহাই কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতির সারসত্য। কিন্তু এই দেশে গণতন্ত্রের অনুশীলনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতির কারণেই প্রার্থীদেরকে প্রচার-সর্বস্বতায় মাতিয়া উঠিতে দেখা যায়। নীলফামারীর বিষয়টি উহারই একটি উদাহরণ মাত্র।
