ক্ষমতা থাকিলে কী না করা যায়! শাসন-বারণ কোনো কিছুরই পরোয়া করিবার প্রয়োজন হয় না। রমনা টেলিফোন অফিসের দেওয়াল ঘেঁষিয়া নির্মাণাধীন দোকানের সারি এই নিদারুণ সত্যেরই সাক্ষ্য বহন করে। রাজপথের উপরই ছড়ানো-ছিটানো রহিয়াছে রড-সিমেন্টসহ যাবতীয় নির্মাণসামগ্রী। ইটের গাঁথুনি দিয়া ছোট ছোট দোকানের দেওয়াল নির্মাণ সম্পন্ন হইয়াছে। এখন চলিতেছে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ। কে বলিবে যে, মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে এই দোকানগুলি উচ্ছেদ করা হইয়াছিল। কারণ, এইগুলি অবৈধ। রাজপথের উপর কোনো দোকানপাট বা মার্কেট থাকিতে পারে না। কাজেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু সাতটি দিন যাইতে না যাইতেই কোন যাদুমন্ত্র বলে ভাঙ্গিয়া দেওয়া সেই দোকানগুলি আবারও দাঁড়াইয়া গিয়াছে সে এক বিস্ময়ই বটে। সত্যই আমরা ভারি চমত্কার একটা সময় অতিক্রম করিয়া চলিয়াছি। এইকালে সম্ভব-অসম্ভব বলিয়া যেন কোনো কথা নাই। যেন বা ঘুচিয়া গিয়াছে নিয়ম আর অনিয়মের সকল প্রভেদ। যাহাদের ক্ষমতা আছে, আর ক্ষমতার সাথে আছে যাহাদের সামান্য যোগ, তাহারা তুড়ি মারিয়া যেন বা উড়াইয়া দিতে পারে আছে যত নিয়ম-কানুন শৃঙ্খলা। উল্লিখিত দোকানপাটের নেপথ্য নায়কগণও যে সেই প্রজাতির কর্মী ক্যাডার তাহা বুঝিতে কোনো অসুবিধা হইবার কথা নয় কাহারও। গত রবিবার পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত রিপোর্টে সেই ইঙ্গিতই দেওয়া হইয়াছে।
রমনার কয়েকটি দোকান বলিয়া তো কথা নয়, সরকারি জায়গাজমি, রাজপথ ও ফুটপাত দখল করিয়া স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী দোকানপাট কিংবা মার্কেট নির্মাণ এইখানে মোটেও কোনো নূতন বিষয় নহে। রাজধানী ঢাকার রাজপথের দুই পাশে ফুটপাতের অবস্থা এমনিতেই সঙ্গীন ও সংকীর্ণ। নগরীর ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাসমূহের অপ্রশস্ত ফুটপাতের পুরোটাই হকারদের দখলে। কোনো কোনো এলাকায় ফুটপাত ছাড়াইয়া মূল রাস্তার অনেকটা পর্যন্ত পসরা হকারদের। কোথাও কোথাও গড়িয়া তোলা হইয়াছে অস্থায়ী কাঠামো। সময়-সময়ান্তরে দেখা যায় হকার উচ্ছেদ অভিযান। ফুটপাতসমূহ দখলমুক্ত করিবার জন্য উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা রহিয়াছে। উচ্ছেদ অভিযানে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন গরীব হকারগণ, যাহারা রোদে পুড়িয়া বৃষ্টিতে ভিজিয়া উদয়াস্ত পরিশ্রম করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিয়া থাকেন। সত্য বটে, দৃশ্যত এই মেহনতি মানুষই অবৈধ দখলদার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহারা এইসব সরকারি জায়গার অদৃশ্য ও অবৈধ দখলদারদের মাসোহারা কিংবা দৈনিক ভাড়া দিয়া বৈধ ব্যবসা করিয়া থাকেন। যাহারা আসল দখলদার, যাহারা ক্ষমতাসূত্রে বলীয়ান, নেপথ্যে যাহারা দুধের সর খায় তাহারা সব সময়ই থাকিয়া যায় ধরাছোঁয়ার বাহিরে। তাহারা উচ্ছেদ হয় না। উহারা মূলোত্পাটিত হয় না। উহারা থামিয়া থামিয়া বাড়ে বারংবার। কারণ, তাহাদের শক্তির উত্স শাসক দল। রাষ্ট্র ক্ষমতায় পার্টির পরিবর্তন হইলে উহাদেরও পালাবদল ঘটে। কিন্তু বাহিরে পরিস্থিতি যেই কে সেই থাকিয়া যায়। এই তো চলিয়া আসিয়াছে যুগ যুগ ধরিয়া । যখন যেই দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের এক শ্রেণীর কর্মী-ক্যাডার বেপরোয়া হইয়া ওঠে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি সবকিছুতেই তাহারা হইয়া ওঠে অপ্রতিরোধ্য। এদের অন্যায় অপকর্মের দায়ভার শেষ পর্যন্ত কিন্তু সংশ্লিষ্ট দলকেই বহন করিতে হয়। জনমত বিপক্ষে চলিয়া যায়। তাহার পরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, রাজনৈতিক দলের নীতি নির্ধারকগণ কার্যত এই ক্ষতিকর কর্মী-ক্যাডারদের ব্যাপারে কঠোর হইতে পারেন না বা হন না। এইভাবে চলিতে পারে না। এই অবস্থার পরিবর্তন ও সংশোধন একান্ত প্রয়োজন। রাজনৈতিক সংস্কৃতি অবশ্যই বদলাইতে হইবে। আইন প্রয়োগে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই হইতে হইবে নিরাসক্ত ও নিরপেক্ষ। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, আইন সকলের জন্যই সমান । যাহারা রাজপথ দখল করিয়া দোকান নির্মাণ করে, তাহাদের দমন করিতে আইন প্রয়োগে বিলম্ব করা উচিত হইবে না কিছুতেই।
