মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত ৭-৮ জুন তারিখে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানান। ওবামা ২০১২ সালের শুরুর দিকে তার সাথে সাক্ষাত্ করেছিলেন যখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে চীনা নেতা হিসেবে শি যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসেছিলেন। চীনের ভবিষ্যত্ রাজনীতিতে শি’র জড়িত হওয়া নিয়ে যে জল্পনা-কল্পনা চলছিল তা সত্য হয়েছে। গত মার্চে জিনপিংয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম দুই নেতা শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক করলেন। এ দুই শীর্ষ পর্যায়ের নেতার ঐতিহাসিক বৈঠক বিশ্ব দেখেছে এবং বোঝার চেষ্টা করেছে যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার জন্য তাদের আলোচনা হয়েছে এবং দেশীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করার মাধ্যমে তা সম্ভব। দু’পক্ষের মুখপাত্রদ্বয় জানিয়েছেন যে, তাদের আলোচনা অনন্য, ইতিবাচক ও গঠনমূলক হয়েছে। কাজের ক্ষেত্রে চীনের প্রচেষ্টা ও আগ্রহের কথা বলতে গিয়ে চীনা প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ইয়ং জেশি বলেন, বিরোধের চেয়ে সহযোগিতাকেই বেশি প্রাধান্য দেন। ওবামা বলেন, দ্বিতীয় বারের মত শাসনকালে তিনি চীনের সঙ্গে সহযোগিতার একটি নতুন মডেল তৈরি করতে চান যেখানে প্রথম মেয়াদে চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, এত আগেভাগে দুই শীর্ষ নেতার এই বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভবিষ্যত্ সম্পর্কের প্রতি গুরুত্ব নির্দেশ করে।’ ওবামা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছেন যে, সাধারণ কিছু বিষয়ের প্রতি জোর দিতে হবে। যা শুধু দু’দেশের সমৃদ্ধির জন্যই নয় বরং প্রশান্ত মহাসগরীয় অঞ্চলে তাদের পারস্পরিক নিরাপত্তার জন্যও প্রয়োজন।
বিভিন্ন সূত্র থেকে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যে, তারা তাদের দেশীয় ও আন্তজার্তিক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলাচনা ও মতামত প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। আশা করা যায় তাদের এই পারস্পরিক আগ্রহ ও শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে বৃহত্ রাষ্ট্রের নতুন মডেল তৈরি করতে সাহায্য করবে। তবে ওবামা একটি বিষয় পরিষ্কার করে বললেন যে, “আমরা বিশ্বাস করি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল চীন শুধুমাত্র চীনবাসীর জন্যই নয় বরং তা সমগ্র বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও উত্তম হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে আন্তজার্তিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে অনিবার্য দ্বন্দ্বের অর্থ কী তা হবে উভয় দেশের জন্য একটি হয়রানিমূলক প্রশ্নের ছিল। সানিল্যান্ডের এ সামিটে ক্যালিফোর্নিয়া তার উত্তর দেওয়া চেষ্টা করেছিলেন। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে শঙ্কার কারণে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তা এ বৈঠকে জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়, সাইবার অপরাধ, জলবায়ূ পরিবর্তন, উত্তর কোরিয়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ওবামা যে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অচিহ্নিত জলের রূপরেখা দিয়েছিল তা পারস্পরিকভাবে ঘনিষ্ঠ ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চীনা ইন্টারনেটের টার্গেট ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি এবং বাণিজ্যিক গোপন বিষয়াদিসহ মেধাভিত্তিক সম্পত্তিসমূহ, আপাতত দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগ ছিল। এতে আরও বলা হয়, ইতোমধ্যেই তা অনুসন্ধান করতে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলো লক্ষ লক্ষ মিলিয়ন মার্কিন ডলার লোকসান করেছে। কিন্তু চীন এ অভিযোগ অস্বীকার করে। এর মধ্যে গণমাধ্যমে একটি মজাদার প্রতিবেদন প্রকশিত হয় তা হলো, এই স্পর্শকাতর সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইমেইল ও টেলিফোনগুলোকেপ্রখর নজরদারির মধ্যে রেখে সাইবার নিরাপত্তার অপব্যবহার করছে।
যাইহোক, হ্যাকিংপ্রতিরোধ করার জন্য উভয় পক্ষ থেকে “সাধারণ নিয়ামের পথ” এবং নিরাপত্তার জন্য সাধারণ কিছু বিষয় অনুসরণ করা দরকার। এ বিষয়ে চীনকে যুক্তরাষ্ট্র কিছু নিয়ম মেনে চলার জন্য বলেছিল। উত্তরে চীন বলেছিল তারাই সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত (তাদের অর্থনীতি গবেষণা ও উদ্যোক্তা নির্ভর), কারণ তারা ঘন ঘন সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে।
যাইহোক, প্রধানমন্ত্রী শি যে সব বিষয়ের প্রতি জোর দিয়েছেন তা হলো, পরস্পরকে সরল বিশ্বাসে সহযোগিতা করা, শঙ্কা দূর করা, তথ্যের নিরাপত্তা তৈরি করা এবং দু’দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সাইবার নিরাপত্তার সহযোগিতা তৈরি করা। এখানে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় উল্লেখ্য যে, “দ্য গার্ডিয়ান” পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দুই নেতার সৌহর্দ্যপূর্ণ আলাপ হওয়ার পরেও মর্কিন রাষ্ট্রপতি সাইবার হামলার সম্ভাব্য বিদেশি সকল লক্ষ্যমাত্রার তালিকা তৈরি করার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের প্রতি আদেশ জারি করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সন্ত্রাসবাদের সাথে লড়াই ও জনগণকে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এ দুয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে মর্কিন প্রশাসন টিকে আছে। এ প্রসঙ্গে আরও বলা যায়, আপনার যদি “শত ভাগ নিরাপত্তা” আয়োজন করতে হয় তাহলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।
এরপর উভয় পক্ষ থেকে দ্বিতীয় যে বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া হয়েছে তা হলো উত্তর কোরিয়ার পরমাণু, পারমাণবিক বিস্তার ও ক্ষেপণাস্ত্র বিষয়ক সমস্যা। দুই নেতার আলোচনার পর একজন মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মি. ডনিলন বলেন, উত্তর কোরিয়ার এ সমস্যার প্রশ্নে দুই নেতা একমত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক শক্তি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও তারা একমত হয়েছেন। তাছাড়া পারমাণবিক সশস্ত্র দেশ হিসেবে উত্তর কোরিয়াকে কেউ ভালোভবে গ্রহণ করবে না এবং দুই দেশ আলাপ-আলোচনা করে গভীর সহযোগিতার মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তি কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে। এ কথা বলাই যেতে পারে যে, উত্তর কোরিয়াকে স্থিতিশীল করতে চীন ও পিয়ংইয়ং এর মধ্যে যে মিত্রতা হয়েছে তা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে ভালো। যাইহোক চীন একটি বিষয় খোলাখুলিভাবে বলেছে যে, চীনের যে কোন বিষয়ে নাক গলানো পিয়ংইয়ং এর একটি স্বতন্ত্র সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের এমন অনুভূতি যেভাবে মার্কিন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে তাতে করে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া উভয়ই সম্ভবত তা খুব সতর্কতার সাথেই বিশ্লেষণ করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আজ বিশ্বের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে বৃহত্ শক্তিশালী দুটি দেশ। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে একটি বিশাল ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করেছে যা গত বছর ৩১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে ছুঁয়েছে। যা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈশ্বয়িক সম্পদ তৈরিতে চীনকে সাহস যুগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের উচ্চ হার দেখে শ্রমিক নেতারাসহ উদ্যোক্তারা ওবামা প্রশাসনকে অনুরোধ জানিয়েছে যাতে চীন তাদের মুদ্রামান বৃদ্ধি করে। কারণ তারা বিশ্বাস করে চীনা পণ্যগুলোকে আরও ব্যয়বহুল করা হলে তাদের পণ্যের বাজার রক্ষিত হবে। সাধারণভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে যে, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও সৌর প্যানেলসহ চীনা রপ্তানি শিল্প মূলত বেইজিং কর্তৃক ভর্তুকি দেওয়া হয়। তারা মনে করে যে, চীন যত সস্তায় বাজারে পণ্য রপ্তানি করে তাতে করে যুক্তরাষ্ট্রের দেশীয় সংস্থাগুলো চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে পারবে না।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে আসা কিছু পণ্যের উপর চীন কর আরোপ করে। বিষয়টি ওবামা বৈঠকে তুলেছিলেন এবং চীনা নেতারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করার আশ্বাস দেন। বেইজিং পরবর্তীতে তাদের মুদ্রার ক্ষেত্রে করের বিষয়টি শিথিল করার কথা জানায়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, নতুন সুতার ব্যবসা চলার মাঝে চীনের পক্ষ থেকে একটি বিস্ময়কর ঘোষণা এসেছে তা হলো চীন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত ট্রান্স প্যাসেফিক ব্যবসায় চুক্তির অংশীদারিত্ব নেয়ার কথা ভাবতেছিল। যেখানে জাপানসহ আরও ১১টি দেশ অন্তর্ভুক্ত আছে। কোন কোন বিশ্লেষকের মতে ভারসাম্য রক্ষার জন্য এ চুক্তিতে চীনকে স্বাগত জানানো হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এমন আলোচনা চলাকালে ওবামা সিরিয়াকে আরও সহযোগিতা করার জন্য বেইজিং-এর প্রতি অনুরোধ জানান। এর কারণ এই যে, চীন, রশিয়াসহ সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাশার-আল আসাদ কাঠার অবস্থানে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র জনিয়েছে তারা মার্কিন বেসামরিক নাগরিক হত্যা এবং সিরিয়ার বিভিন্ন প্রতিবেশি দেশের সীমন্তে উদ্বাস্তুদের আশ্রয় নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। এ সব অঞ্চলে গুরুতর অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা চিহ্নিত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বিগ্ন হওয়াটা চীন বুঝতে পেরেছিল কিন্তু কোন রকম প্রতিশ্রুতি বা সিদ্ধান্ত তারা দেয়নি।
আলোচনার অন্য বিষয়ের মধ্যে ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়। এ প্রেক্ষাপটে একটি উত্সাহজনক বিষয় এই যে, হাইড্রো-ফ্লুরো কার্বন ও গ্রীন হাউজ গ্যাস কমাতে দুটি দেশ এক সাথে কাজ করাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের মত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের পক্ষ থেকে এই প্রচেষ্টা স্বাগত জানানোর মত। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ও কর্মকৌশল যে চীন পরিপন্থি ও চীনের উত্থানের বিরুদ্ধে নয় তা বোঝানোর জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার এ বৈঠকটি একটি সুযোগ হিসেবে ছিলো। এটি চীনের এশীয় প্রতিবেশি জাপান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ অন্যান্য দেশের সাথে চলমান সামুদ্রিক বিরোধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরার একটি দারুণ সুযোগ ছিলো। বৈঠকটি ভালোভাবে শুরু হয়েছে এবং আশা করা যেতে পারে আগে হোক আর পরেই হোক পরবর্তী যে কোন অনানুষ্ঠানিক বৈঠক বেইজিং-এর বাহিরে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এটি সারা বিশ্বের জন্য ভালো হবে।
ভাষান্তর : জিলফুল মুরাদ শানু
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
