বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রশ্রয়ে যখন জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল তখনি এদেশের সাধারণ মানুষ অসামপ্রদায়িক রাজনীতির পরাজয়ের আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পরে। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতি ভোটারদের অসামান্য সমর্থনের পেছনে দেশবাসীর মুক্তির একটি আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছিল। কিন্তু মানুষের আস্থার মূল্য দিতে পারেননি আওয়ামী লীগের পরিচালকগণ। দিনবদলের কথা বললেও দিন বদলে দেয়ার কোনো চেষ্টাই করেননি। শাসন ব্যর্থতা আর আর দলীয় সন্ত্রাস ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে একটি বড় রকম দূরত্ব তৈরি করেছে। ফলে সরকারের শেষ পর্বে এসে অনেকটা খেই হারিয়ে ফেললেন যেন আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীরা। এর সুবিধা পুরোটাই গ্রহণ করে জামায়াত-বিএনপি। হেফাজতে ইসলাম নামে এক ধর্মীয়গোষ্ঠীকে উসকে দিয়ে আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী করে তোলে। সময় থাকতে দূরদৃষ্টি দিয়ে এসব সংকটের গভীরতা বুঝতে চাননি আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীরা। ফলে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভূমিধস পরাজয় ঘটলো আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের একটি স্টেজ রিহার্সেল যেন হয়ে গেল। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের মনোবল ভেঙ্গে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। জাতীয় নির্বাচন যদি হয় তবে এর প্রস্তুতির জন্য বড়জোর চার মাস সময় পাবে আওয়ামী লীগ। অনেক কিছু হারালেও এখনো যদি সততা ও বাস্তবতা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীরা মাঠে নামতে পারেন তবে অন্যরকম কিছু ঘটে যাওয়া অসম্ভব নয়। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে অবশ্যই পেছনে তাকাতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া খুব জরুরি।
মাঠ গরমের বক্তৃতাবাজ রাজনীতিক আর দলকে নিয়মনিষ্ঠ রাজনীতির মধ্য দিয়ে বিরুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সুগঠিত করার মতো মেধাবী নির্লোভ আর আদর্শিক রাজনীতিক দু’জন এক নন। আওয়ামী লীগের দুর্ভাগ্য সঙ্কটময় মুহূর্তে দ্বিতীয় ধারার রাজনীতিকের বড় অভাববোধ হতে থাকলো দলটিতে। বা এ ধারার পোড়খাওয়া রাজনীতিক দলে থাকলেও তেমন গুরুত্ব পেলেন না যেন। স্কুলে বা কলেজে ইতিহাস পরীক্ষায় মোগল সাম্রাজ্য পতনের কারণ লিখতে দিলে একটি সফল পয়েন্ট চলে আসত, তা হচ্ছে বিশাল সাম্রাজ্য আর দুর্বল উত্তরাধিকার। কারণ অত বড় সাম্রাজ্যের ভার বহনের যোগ্যতা ছিল না আওরঙ্গজেব-উত্তর দুর্বল সম্রাটদের। তাই নানা অংশের রাজ্য বিদ্রোহীদের হাতে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে।
নানা চড়াই-উতরাই থাকলেও বঙ্গবন্ধু তাঁর অসাধারণ মেধা দিয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের রাজনৈতিক অদক্ষতা স্পষ্ট হতে থাকে। দেশ তখন নানা মত-পথে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি, ডান-বাম-মধ্যপন্থা প্রভৃতি ইস্যু তো আছেই—এছাড়া ছাত্র-শিক্ষক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী—সকল সামাজিক শক্তিও বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। আর এর মোকাবিলার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দূরদর্শী চিন্তা করতে পারেনি সে সময়ের আওয়ামী নেতৃত্ব। এই ব্যর্থতার সুবিধা পুরোটাই নিতে পেরেছিলেন জিয়াউর রহমান। জাতীয়তাবাদী শ্লে¬াগানে নানা মত- পথের মানুষকে নিয়ে বিএনপির জন্ম দিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা যে শূন্য মাঠ তৈরি করে দিয়েছিল সেখানে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি ভালো ফল দিল। বিএনপির মতো একটি ভুঁইফোঁড় দল দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার পেছনে রাষ্ট্রীয় সুবিধা থাকার পরও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যর্থতা যে অনেকাংশে দায়ী ছিল তা কি বর্তমান আওয়ামী নেতৃত্ব কখনও স্বীকার করেন?
গত শতকের আশির দশকে ভাঙ্গনের মুখ থেকে দল বাঁচাতে শেখ হাসিনাকে নেতৃত্বে নিয়ে আসা হয়। এ পর্বেই আওয়ামী লীগ তার মূল আদর্শ থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। দীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করা একটি গণতন্ত্রী দল গণতান্ত্রিক ধারণা দলীয় আচরণ থেকে নির্বাসন দিয়ে তা শুধু বক্তৃতার ভাষায় জিইয়ে রাখলো। বিএনপির উত্থান এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এর বাড়বাড়ন্ত কিছুটা যেন দিশেহারা করে দিল আওয়ামী নেতৃত্বকে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী দল নিজেকে সুগঠিত করার বদলে ক্ষমতায় পৌঁছার প্রতিযোগিতায় যেন ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ আওয়ামী লীগের হতাশা যেন আরও বাড়িয়ে দেয়। রাষ্ট্র সুবিধার ছত্রছায়ায় এরশাদের জাতীয় পার্টিও ফুলেফেঁপে উঠলো। দুটো ভুঁইফোঁড় দলকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করা আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী দলের জন্য কঠিন ছিল না। কিন্তু নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা দলের রাজনৈতিক ভিতকে ক্রমে দুর্বল করে দিচ্ছিল। গ্রাম পর্যায়ে সাংগঠনিক তত্পরতা স্থবির হয়ে যেতে লাগলো। নির্বাসিত হতে লাগলো গণতন্ত্র চর্চা। নিয়মমাফিক গ্রাম, জেলা, আঞ্চলিক বা জাতীয় পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক পন্থায় কমিটি গঠনের রেওয়াজ ভুলতে বসলো আওয়ামী লীগ। অগণতান্ত্রিকভাবে দলীয় সভাপতির পদটি শেখ হাসিনার জন্য স্থায়ী হয়ে গেল। ক্রমে সভানেত্রী একচ্ছত্র ক্ষমতাধর হয়ে পড়তে লাগলেন।
শ্রেণিচরিত্র এবং রাজনৈতিক আভিজাত্যের (!) কারণে রাজনীতিকে ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিণত করলো বিএনপি আর জাতীয় পার্টি। নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার মাপকাঠি হতে থাকলো অর্থ আর পেশিশক্তি। বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির মতো ভুঁইফোঁড় দলগুলোর না হয় এ আচরণ মানায়, আওয়ামী লীগ কেন গড্ডালিকায় গা ভাসালো? এ পর্যায়ে রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিতে পারতো আওয়ামী লীগ। তার বদলে দেখা গেল দলটি তার নব্য প্রতিপক্ষদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামলো। এভাবে ওদের রাজনৈতিক সম্মান বাড়িয়ে দিল বা নিজেদেরটা কমালো। এ পর্যায়ে নেতৃত্ব আত্মবিশ্বাসের অভাবে দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের গরিমাকে ম্ল¬ান করে দিয়ে বরণ করলো অসুস্থ রাজনীতিকেই। তথাকথিত গণতান্ত্রিক ধারায় নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দিতে রাজনৈতিক পরম্পরা নয়—পেশিশক্তি আর অর্থ শক্তিকেই নাবিক হিসেবে মেনে নিল। তাই দেশজুড়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞায় প্রাজ্ঞ নিবেদিতপ্রাণ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের অনেকেই রাতারাতি পরিত্যাজ্য হলেন। সেখানে অর্থের জোরে মনোনয়ন কিনে নিতে লাগলেন নব্য ধনী বণিক আর আমলারা। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের শিকার হলেন কেউ কেউ। যেসব অঞ্চলে পেশিশক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে বধ করা যাবে সেসব অঞ্চলে চিহ্নিত সন্ত্রাসীর হাতেই চলে গেল দলীয় নেতৃত্ব। অর্থাত্ ভুঁইফোঁড় দলগুলোর সাথে সুর মিলিয়ে আওয়ামী লীগও দেশের সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারা ভেঙ্গে দিতে ভূমিকা রাখলো। আত্মবিশ্বাসহীন আওয়ামী নেতৃত্বের ক্ষমতা প্রত্যাশা এতটাই প্রকট হয়ে পড়েছিল যে, কখনো কখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মৌলবাদী শক্তির কৃপা ভিক্ষা করতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু আওয়ামী লীগের কি তার কোনো প্রয়োজন ছিল? দেশজুড়ে যে দলটির ভিত আমূল প্রোথিত তাকে নিয়মমতো পরিচর্যা করলে এর ছায়ায় কোনো পরগাছা সবল হয়ে বেড়ে উঠতে পারতো কি? এর জন্য যে মেধাবী আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল জেলহত্যার মধ্য দিয়ে সে জায়গায় তৈরি হয়ে গিয়েছিল বড় শূন্যতা। তারপরও দলের ভেতর মুক্ত চিন্তার মেধাবী মানুষ যে একেবারে শূন্য হয়ে পড়েছে তা নয়। কিন্তু একচ্ছত্র ক্ষমতার মধ্যে বুঁদ করে দিয়ে দলীয় সভানেত্রীকে ততক্ষণে সুবিধাবাদী শক্তি তাদের বলয়ের ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সকলকে একই দৃষ্টিতে দেখা নেত্রীর পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছে না। দলীয় নেতৃত্বে যাদের এগিয়ে থাকার কথা তারা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছিলেন। আমার জানামতে দলের নিবেদিতপ্রাণ কোনো কোনো নেতা অনেক আগে থেকেই দলীয় সংস্কার নিয়ে ভেবেছেন, সুচিন্তিত মতামতে বিন্যস্ত পাণ্ডুলিপি সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সামনে উপস্থাপনও করেছেন। কিন্তু অসুস্থ রাজনীতি ততক্ষণে সুবচনকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। এভাবে ঐতিহ্যে উজ্জ্বল আওয়ামী লীগের শিরা-উপশিরায় বর্তমানে ঘুণ পোকার বসতি।
আমার কোনো কোনো আওয়ামীভক্ত বন্ধু তবুও শেষ চেষ্টা করেন দলের সম্মান রাখতে। তারা নানা রাজনৈতিক নৈরাজ্য আর সুবিধাবাদ দর্শন করে দলের পক্ষে সাফাই গাইতে চান। বলেন বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগতো তবু মন্দের ভালো। আমি মানতে পারি না, বলি রাজনীতিতে মন্দের ভালো বলে কিছু থাকতে পারে না। হয় ভালো, নয় মন্দ। কারণ রাজনৈতিক দলের পরিচিতি, এর চালিকাশক্তি দলের রাজনৈতিক আদর্শ। বিশেষ স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই আদর্শই যদি আপোষকামিতার বেড়াজালে বন্দী হয়ে যায় তাহলে দলের ভালো বলে কিছু থাকে না। দলকে নতুন করে দাঁড়াতে হলে ওই আদর্শকে সামনে নিয়েই দাঁড়াতে হয়।
আওয়ামী লীগের এসব দুর্বলতা তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে যতই আনন্দের হোক না কেন দেশের জন্য তা কখনও কল্যাণের হতে পারে না। এদেশের ঐতিহ্যিক বাম দলগুলো যদি সবল হতো তবে আওয়ামী লীগের বিকল্প ভাবা যেত। কিন্তু সে হবার নয়। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ধরনের ভুঁইফোঁড় দলগুলো আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার কারণেই শক্তিমান হয়েছে। দলছুট পাঁচমিশেলী মানুষে সমন্বিত দল সুবিধাবাদকেই প্রশ্রয় দেয়। এদের সরাসরি প্রশ্রয়ে মৌলবাদী শক্তিগুলো ক্রমে তাদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করছে, যা দেশের জন্য অশনি সঙ্কেত।
এসব বাস্তব বিবেচনায় দেশের রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। দীর্ঘ যত্নের অভাবে কৃশকায় হয়ে পড়লেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল এখনও দেশজুড়ে প্রোথিত। এবার দরকার জল সিঞ্চন। ভুল স্বীকার করে আত্মশুদ্ধ হতে হবে আওয়ামী নেতৃত্বকে। নিজেদের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য থেকে শক্তি নিতে হবে। আবার জাগিয়ে তুলতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। শর্তহীনভাবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এ মুহূর্তে যৌক্তিক কারণেই আর অন্য কোনো বড় দলের পক্ষে সম্ভব নয়। মেয়াদকালের শেষ দিকে এসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কৃতকর্মের কারণে এখন ভোটের রাজনীতিতে অনেকটা সংকটে আছেন। এ অবস্থায়ও সরকারি ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ হতাশ মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেন তারা আওয়ামী লীগের দুরবস্থা দেখতে চান না। শেষ বেলায় তারা অন্তত দেখতে চান আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ঈন্দ্রজালমুক্ত হতে চাচ্ছেন। আত্মশুদ্ধ হওয়ার পথে হাঁটতে চাচ্ছেন। দলকল্যাণের বদলে জনকল্যাণের পথ প্রশস্ত করার পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তাহলে মানুষের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে না। নানা প্রশ্রয়ে মৌলবাদী শক্তি অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে। এদেশের মানুষ মৌলবাদের পক্ষে নেই এ কথা ঐতিহাসিকভাবেই সত্য। কিন্তু প্রশ্রয় পেলে এরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করবেই। এই সত্য ও সূত্র পথ দেখাতে পারে আওয়ামী লীগকে। তাই গণতন্ত্র রক্ষা ও মৌলবাদমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে এখন দায়িত্ব নিতে হবে এই ঐতিহ্যিক দলটিকেই। আওয়ামী রাজনীতির দেহে ও মনে পরিশুদ্ধি ছাড়া তা সম্ভব নয়।
লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
