পর্যাপ্ত পরিমাণ রাস্তা সংকুলান না থাকলেও আমাদের যে সমস্যাটি রয়েছে তা হলো অতিরিক্ত জনসংখ্যা। সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। এর পাশাপাশি আরও একটি সমস্যা হচ্ছে দিন দিন আমাদের বিভাগীয় শহরগুলো অতি দ্রুত গতিতে মেগা সিটিতে পরিণত হচ্ছে। তাই রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত না নিয়ে অবশিষ্ট জমি মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যবহার করে বর্তমান রাস্তাগুলোর উপর্যুপরি ব্যবহার নিশ্চিত করে কিভাবে সীমিত সম্পদের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা যায় সেরূপ কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কাজেই যাতায়াত সমস্যা সমাধানে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে অধিক মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং করণীয় হবে জনপ্রতি সীমিত রাস্তার ব্যবহার করা।
প্রথমেই আসা যাক অধিক জনসংখ্যাকে কিভাবে অল্প রাস্তার মাধ্যমে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা যায়। এজন্য আমাদের চলাচলের জন্য নির্ভরযোগ্য যে মাধ্যমটি হবে তার ধারণক্ষমতা হতে হবে বেশি। ধারণক্ষমতার কথা চিন্তা করলে অন্য যে কোন বাহন, যেমন-প্রাইভেট কার, ট্যাক্সির চেয়ে বাসের ধারণক্ষমতা বেশি। কাজেই রাস্তার যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ও অধিক লোকের যাতায়াতের ব্যবস্থা করার জন্য বাস হওয়া উচিত আমাদের উপযোগী বাহন। কিন্তু আমাদের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মিরপুর রোডের উপর ২০১০ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, রাস্তার মোট যানবাহনের মধ্যে ৫০%-এর বেশি প্রাইভেট কার, ১৭% সিএনজি, অন্যদিকে বাস, যা আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী বাহন, এর পরিমাণ ২৫%। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত রেজিস্ট্রিকৃত যানবাহনের সংখ্যা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যে হারে প্রাইভেট কারের সংখ্যা বাড়ছে সে হারে বাসের সংখ্যা বাড়ছে না। অথচ আমাদের করণীয় ছিল প্রাইভেট কারের সংখ্যা কমিয়ে বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। কারণ ২টি প্রাইভেট কার যখন ৪ জনকে বহন করবে তখন সমপরিমাণ রাস্তা ব্যবহার করে একটি বাস সেবা দিবে ৩০-৫৬ জনকে। কাজেই বর্তমান যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে বাস সার্ভিস হতে পারে অন্যতম সমাধান। খুবই সাধারণ এবং ব্যয়সাপেক্ষ পলিসির মাধ্যমে বাস সার্ভিসকে ব্যবহার করে যাতায়াতের সমস্যা অনেকাংশেই নিরসন করা যায়। দেখা যাক কি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। বাস র্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থার (বিআরটি) প্রচলন করা যেতে পারে। ১৯৪৭ সালে সর্বপ্রথম ব্রাজিলের কুরিটিবায় এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিআরটি চালু করার জন্য আমাদের নতুন কোন রাস্তা নির্মাণের দরকার নেই। যে সকল ব্যস্ত রাস্তায় বিরতিহীন গতি দরকার, যেমন- মিরপুর রোড, এ রোডে গড়ে দুই পার্শ্বে মিলিয়ে ছয়টি লেন আছে। এ রাস্তার বিপরীতমুখী দুইটি লেন এ বাস ব্যতীত অন্যান্য যানবাহন নিষিদ্ধ করে এবং অবশিষ্ট চারটি লেনে অন্যান্য ট্রাফিক চলাচলের মাধ্যমে রাস্তা নির্মাণ ছাড়াই বাস সার্ভিসের মাধ্যমে বিআরটি পদ্ধতি চালু করা যায়। বিআরটি-এর জন্য নির্ধারিত লেনে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর বাস স্টপেজের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় পরপর যানবাহনের নিশ্চয়তা প্রদান করা যায়। দুইটি বাস স্টপেজের মধ্যবর্তী স্থানে বিআরটি-এর বাস ব্যতীত অন্যান্য যানবাহন না থাকায় সংঘর্ষ কম হয়। ফলে এক্সিডেন্টের সম্ভাব্যতা কমে যায়। বাস স্টপেজ ব্যতীত বাস থামানোর কোন বিকল্প রাস্তা না থাকায় বাসে একটি বিরতিহীন গতি দেয়া যায়। যেমন- নিউইয়র্কের 34th street-এ প্রচলিত বাস সার্ভিসের সময় বাসের গতি ছিল ৪.৫ মাইল/ঘণ্টা, যা বিআরটি ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৭ থেকে ৩০ মাইল/ঘণ্টা পর্যন্ত বর্ধিত করা গেছে। এছাড়াও North America বিআরটি-এর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এই পদ্ধতিতে ভ্রমণের সময় ১৫%-৩০% কমে যায়। নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর বাস স্টপেজের ব্যবস্থা থাকার কারণে যাত্রীদের জন্য একই সাথে যেমন মানসম্মত বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা করা যায়, তেমনি উন্নত টিকেট কাউন্টার ও মালামালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।
এছাড়াও বিআরটি-এর মাধ্যমে বাস এবং রাস্তার সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। বিআরটি-এর নির্ধারিত লেনে বাস সার্ভিসের মাধ্যমে বাসের সর্বাধিক ব্যবহার যেমন নিশ্চিত করা যায়, অপরদিকে বিআরটি-এর লেন ছাড়া অন্যান্য লেনে মোটর সাইকেল, বাইসাইকেল, রিক্সা, সিএনজি, প্রাইভেট কার ছাড়াও অন্যান্য ট্রাফিক ফিডার সার্ভিস হিসেবে ব্যবহার করা যায়। যেহেতু বিআরটি-এ পাবলিক বাসের গতি বেশি থাকে, সময় কম লাগে এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাসের নিশ্চয়তা বেশি থাকে, তাই সাধারণ মানুষকে পাবলিক বাস সার্ভিস ব্যবহারে আরো উত্সাহিত করা যায়।
শুধুমাত্র দক্ষতার দিক থেকেই নয়, পরিবেশের কথা চিন্তা করলেও বিআরটি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি। অযথা ট্রাফিক জ্যামের কারণে যে দূষণগুলো হতো সেগুলোর পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি খরচ অনেকাংশেই কমিয়ে ফেলা যায়।
এছাড়াও বিঅরটি-এর মাধ্যমে পাবলিক চাহিদা ও যোগানের মধ্যে তাত্ক্ষণিক ভারসাম্য আনয়ন করা যায়। বিআরটি-এর জন্য নির্ধারিত কিছু বাস আছে, যেখানে ট্রেনের মতো বগি লাগানো যায়। পিক সময়ে যখন চাহিদা বেশি থাকবে তখন অতিরিক্ত বগি লাগানোর মাধ্যমে পিক সময়ের চাহিদা পূরণ করা যায়। অফ পিক সময়ে যখন চাহিদা কম থাকবে তখন আর অতিরিক্ত বগি ব্যবহার হবে না। আমরা প্রথম অবস্থায় বিআরটি চালু করলে সফলতার সাথে বিআরটি-এর সুবিধা ভোগ করতে পারি বর্তমান বাসগুলোর ব্যবহারের মাধ্যমে। যে বাসগুলো স্বাভাবিকভাবে বিআরটি-এর জন্য ব্যবহার হবে এ বাসগুলো ছাড়াও প্রতিটি স্টপেজে একটি অথবা দুইটি করে অতিরিক্ত বাস থাকবে । যখন বাসগুলো পুরোপুরি ভর্তি হয়ে যাওয়ার পরও যাত্রী থাকবে তখন এই অতিরিক্ত বাসগুলোকে বগির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
কাজেই উপরের আলোচনা থেকে দেখা যায় যে, বিআরটি-এর মাধ্যমে অল্প খরচে অধিক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন উচ্চমানের সার্ভিস দেয়া সম্ভব। অথচ ঢাকার জন্য তৈরি করা Strategic Transport Plan (2005-2025)-এ যাতায়াত সমস্যার সমাধান হিসেবে বিআরটি থেকে এক্সপ্রেস রোড ও এমআরটি (Mass Rapid Transit)-কে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যেগুলো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং এসব এক্সপ্রেস রোড নির্মাণের কারণে প্রাইভেট কারের ব্যবহার আরো বৃদ্ধি পাবে, যা আমরা গত কয়েক দশকে উপলব্ধি করেছি। কিন্তু আমরা যদি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথা চিন্তা করি, যাতে জায়গা কম লাগবে, পরিবেশবান্ধব সমাধান হবে এবং ব্যয়সাপেক্ষ হবে, তাহলে বিআরটি-কে প্রাধান্য দেয়া হবে সবচেয়ে কার্যকরী সিদ্ধান্ত। কাজেই জনসাধারণের কথা চিন্তা করে বর্তমান যাতায়াত সমস্যা সমাধানের জন্য অতিদ্রুত বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব ।
লেখক : শিক্ষক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ,
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Email: [email protected]
