আস্থার স্থান সন্ধানে

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৩, ২১:২৫
বারবার বলতে হচ্ছে আমরা কোথায় যাব? আমরা সাধারণ মানুষ কারো সাতপাঁচে থাকতে চাই না। অথচ আমরা ব্যবহূত হতে হতে উচ্ছিষ্ট হই। আবার ব্যবহূত হই। রাজনীতিবিদদের চরম ব্যর্থতা আর অদক্ষতা আমাদেরকে অপব্যবহারে সহায়তা করে। অপরদিকে, যারা সুদক্ষ রাজনীতিবিদ তারা কেউ কেউ নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকেন, কেউ কেউ ধাক্কা খেয়ে পিছনে পড়ে থাকেন। তাদেরকে সম্মুখে আনলে হয়তো ফ্রি স্টাইলে দুর্নীতি করা যাবে না, যখন যা খুশি বলা যাবে না, যা খুশি করা যাবে না, এত সুন্দর করে আখের গোছান যাবে না। তাই সকল খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদেরকে। জাতি হিসেবে আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে চেষ্টা করছি বহুকাল ধরে। কিন্তু কতটুকু দাঁড়াতে পেরেছি বা পারছি তা সকলের জানা। ভেতরে ভেতরে আমরা গুমরে কাঁদি, অস্থির হয়ে পড়ি ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে। দেশের প্রতি বুক ভরা ভালোবাসা নিয়ে না পারি সহ্য করতে, না পারি মুখ ফুটে বলতে। শুধু মনে মনে বলতে হয় ‘ও আমার দেশ তুমি দুখিনী জননী।’ অনেক প্রশ্ন জাগে, কেন আমার জননী দুখিনী হবে? কেন আমরা গণতন্ত্রের সুফল দেখতে পাব না? কেন এই অস্থিরতা? কেন হরতাল, মিছিল, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ...? কেন একটি স্বাধীন দেশে অবরুদ্ধ জীবনযাপন? হূদয়ের প্রতিটি রক্তবিন্দুতে বাংলাদেশের নাম অথচ সেই রক্ত দেশের মাটিতে ঝরে যায় নির্বিচারে, নির্দ্বিধায়। আমরা নিরুপায় হয়ে সহ্য করি অসহ্য সকল কর্মকাণ্ডকে। এইভাবে আর কত? ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হেরে যাওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলছেন তা জনগণকে আরো বিপক্ষে ঠেলে দেবে সন্দেহ নেই। তিনি বলেছেন এত উন্নয়নের পরেও জনগণ তাদেরকে ভোট না দিয়ে দুর্নীতিবাজদেরকে নির্বাচিত করেছে। আমরা বলতে চাই, যদি কেউ দুর্নীতিবাজ প্রার্থী থাকেন তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয়াই উচিত নয়। কিন্তু নির্বাচিত হবার পর তাকে অসত্ বা দুর্নীতিবাজ বলা কতটা যুক্তিসংগত যার দায় জনগণকে নিতে হচ্ছে। এভাবে কথা বললে জনগণ বিরূপ ধারণা পোষণ করবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি আরো বলেছেন ঈদের পর লোডশেডিংয়ের প্র্যাকটিস করবেন ঘোষণা দিয়ে। জনগণের সাথে এটা কি দ্বন্দ্বের শামিল নয়? তবে হ্যাঁ, একথা সত্য যে এই সরকারের মেয়াদে আট থেকে নয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্যাপাসিটি হয়েছে খুব দ্রুত সময়ে। কিন্তু এর প্রতিফল ভোগ করার অধিকার তো জনগণেরই। তিনি তো আমাদের জন্যেই উন্নয়ন করছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ছেন। সুতরাং আমাদেরকে বিপক্ষে দাঁড় করাতে চাইবেন কেন? বরং আমাদেরকে কীভাবে মজবুত একটি ভিতের উপর দাঁড় করানো যায় তার ব্যবস্থা নেয়াই তো জরুরি। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার দোদুল্যমান অবস্থা থেকে কখনো ফিরতে পারেননি। মহাজোটে অবস্থান করেও প্রতিটি কথা ও কাজে মহাজোটের অপমৃত্যুই কামনা করেছেন ও করছেন। নয় বছর তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তার সকল বৈশিষ্ট্য আমাদের জানা। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে কাউকে সমর্থন দিবেন না বলেও নির্বাচনের দুদিন আগে একজনকে সমর্থন জানালেন। আস্থার জায়গাটি পরিষ্কার করতে তিনিও ব্যর্থ। বিকল্প ধারা তৈরি করে সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী হয়তো অনেক বিকল্প ভাবনা ভেবেছিলেন। কিন্তু সেই বিকল্প ধারাও নানাভাবে হোঁচট খেতে খেতে এখন জোটের সাথে শরিক হতে যাচ্ছে বলে কথা উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম আওয়ামী লীগ ত্যাগের পর বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করে নিজেই পথহারা হয়ে আছেন। তিনি না পারছেন বঙ্গবন্ধুকে ভুলতে, না পারছেন জামায়াতের সাথে এক কাতারে বসতে। বেগম খালেদা জিয়ার ইফতার পার্টিতে গিয়ে এ বিষয়টা আরো পরিষ্কার করলেন তিনি। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের আরেক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না নাগরিক ঐক্য গঠন করে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। আমরা তো কোথায়ও স্বস্তি দেখি না। না কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে, না তৃতীয় শক্তির কাছে। বিশ্বের কোথায়ও কোনো ‘শক্তি’ নামের কেউ রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে বা করে বলে জানা নেই। রাজনৈতিক বা দলীয় শক্তিটাই সর্বক্ষেত্রে মূল ভিত্তি। কিন্তু এমন কোনো ভিত্তি এদেশে এখনো তৈরি হয়নি যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারি। জাতীয় সংসদে যে ভাষায় কথা বলেন মাননীয় সংসদ সদস্যগণ তা শুনে মর্মাহত হই। এই বাংলা ভাষার জন্য কি বায়ান্নতে শহিদ হয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার— একসারি দ্যূতিময় নাম? যে মেয়েদের বিপক্ষে আহমদ শফী এত কটুবাক্য ব্যবহার করলেন, সেই মেয়ে-সাংসদরাও কেউ কেউ তার পক্ষে সাফাই গাইতে দেখে লজ্জায় নত হই। ব্যক্তি স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, ভোটের স্বার্থ বুঝি মানুষের বিবেক-বোধ-জ্ঞান-দৃষ্টি সবকিছু কেড়ে নেয়! একদল অন্যদলের প্রতি কুরুচিপূর্ণ ভাষায় যেভাবে পরস্পরকে দোষারোপ করেন তাতে মনে হয় সংসদ ভবনটি দোষারোপের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। আমরা ভোট দিয়ে যাদেরকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠাই তারা সেখানে গিয়ে আমাদের কথা বেমালুম ভুলে যান। এই অভিজ্ঞতা বছরের পর বছর অর্জন করে চলেছি। বড় পীড়াদায়ক, বড় যন্ত্রণাদায়ক এই অভিজ্ঞতা। এখন আমরা মুক্তি চাই। আমাদের ভাষা বুঝাতে চাই; যে ভাষা প্রেমের-প্রাণের, যে ভাষা সুখের-স্বাচ্ছন্দ্যের, যে ভাষা মিথ্যের-অস্তিত্বের, যে ভাষা মাটির-মমতার, যে ভাষা দেশের-রাষ্ট্রের, যে ভাষা গণতন্ত্রের । আমরা সেই ভাষায় আপ্লুত হতে চাই যেখানে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, বন্ধন অটুট। ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা, অশ্লীলতা পরিহার করে একটি সুন্দর পরিমন্ডলে বেড়ে উঠতে চাই— নতুন প্রজন্মের এই চাওয়া বিবেচনায় রাখা অতীব জরুরি। আমাদেরকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া করার আগে রাজনৈতিক নেতাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা পরিষ্কার হওয়া দরকার। এই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল সকল এমপি ও মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব দেয়া হবে, আমরা তা পাইনি। বলা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে, আমাদের কাছে এখনো তা ধোঁয়ার ভেতরে নিমজ্জিত। পদ্মাসেতু বাস্তবায়নে দুর্নীতি আর দীর্ঘসূত্রতা হতাশ করেছে। বিরোধীদলের কাছ থেকেও আমরা সুস্পষ্ট কোনো ধারণা পাই না। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার হাতে গড়া দলটিতে মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী জামায়াত-শিবির অনেকখানি জায়গা দখল করে রেখেছে। যে জামায়াত নারী নেতৃত্ব হারাম বলে, যে হেফাজত নারীকে ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করে তাদের সাথে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ দলটি কী করে একমঞ্চে বসে তা বুঝা আমাদের সাধ্যের বাইরে। আমরা পরিচ্ছন্ন আর পরিপক্ব রাজনীতি দেখতে চাই। শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্যে আর ক্ষমতায় যাবার জন্যে যারা রাজনীতি করেন, আর যাই হোক তাদেরকে দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, মানুষের মঙ্গল সম্ভব নয়। এই দেশের মানুষ আজ অনেকটা ছিন্নভিন্ন, বিভক্তির যাঁতাকলে পিষ্ট। আমরা পরিত্রাণ চাই। এই হতাশার কথা বলতে চাই না, এই আবেগের কথা বলতে চাই না, দুঃখ-দুর্দশার কথা বলতে চাই না। আমরা বলতে চাই সুখের কথা, হাসি-আনন্দের কথা, একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কথা। আমরা চাই পুরো বাংলাদেশ জুড়ে নির্ভেজাল মানুষের অফুরন্ত উচ্ছ্বাস। মানবতাবোধ আর দেশাত্মবোধ নিয়ে আজ ও আগামী দিনের প্রজন্ম যাতে অগ্রসর হতে পারে তার জন্য চাই সঠিক দিক-নির্দেশনা। উদার আকাশের মতো না হোক, স্বচ্ছ পানির মতো না হোক, উর্বর মাটির মতো না হোক— আমরা এমন রাজনীতি চাই যেখানে টিআইবির রিপোর্টে সর্বপ্রথম না হয়ে সর্বশেষ দুর্নীতিবাজ হবে রাজনৈতিক দল। আমরা তাদের ভালোবাসায় পরিপ্লুত না হলাম, অন্তত অবজ্ঞা থেকে রক্ষা পাব। আস্থার স্থানটি রাজনীতিবিদেরাই তৈরি করবেন এমন প্রত্যাশা দেশের প্রতিটি মানুষের। আমাদের যেন আর কখনো বলতে না হয়, আমরা কোথায় যাব? লেখক: শিশুসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন