বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হইলো কৃষি। এখনও বাংলাদেশকে কৃষিনির্ভর দেশই বলা যায়। বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদার অনেকাংশেই মিটাইয়া চলিতেছে কৃষি খাত। বাংলাদেশের কৃষকেরা তাহাদের শ্রম ও মেধা দিয়া কৃষির ফলন উত্তরোত্তর বাড়াইয়া চলিতেছে। সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভূমিকাও এই ক্ষেত্রে প্রশংসনীয়। সরকার কৃষির জন্য নানান ঋণসুবিধাও দিয়া যাইতেছে। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু কিছু উদ্যোগ যেমন অভিনব তেমনই প্রশংসনীয়। বিশেষত ইদানীংকালে কিছু অপ্রচলিত কৃষি বাংলাদেশের কৃষিখাতকে সমৃদ্ধ করিয়া চলিতেছে। দেশে এখন সমতলে চায়ের চাষ হইতেছে। খুব সম্প্রতি এক সৌখিন কৃষক বাণিজ্যিকভাবে এলাচের চাষ করিয়াছেন। আর দুই দশক হইলো ফুলচাষ এখন অপ্রচলিত হইতে ক্রমশ প্রচলিত কৃষিতে পরিণত হইয়াছে।
কৃষকদের এই উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে সাধুবাদ জানাইতে হয়। এককালের বিরানভূমি পঞ্চগড় এখন সবুজ চা বাগানে ছাইয়া গিয়াছে। চা সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় জন্মাইয়া থাকে, কিন্তু পঞ্চগড়ের চা বাগানগুলি প্রমাণ করিয়াছে যে, অনুকূল মৃত্তিকার বরাতে সমতলেও চা চাষ সম্ভব। উল্লেখযোগ্য বিষয় হইলো, এই চায়ের মান যথেষ্ট উন্নত, ইহা দার্জিলিং ভ্যারাইটির মতোই। সমতলের চা এখন দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি হইতেছে। নূতন কৃষি ক্ষেত্রটি নূতন কর্মসংস্থান করিয়াছে। এইদিকে দুই দশক হইলো, দেশে বিপুল পরিমাণে ফুল চাষ হইতেছে। বিশেষত যশোর ও ঝিনাইদহ জেলা এই ক্ষেত্রে অগ্রগামী। যশোরের গদখালি, ঝিকরগাছা ও শার্শার নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করিতে হয়। যশোর ও ঝিনাইদহ ছাড়াও মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা ও বগুড়ায় ফুলের চাষ হইতেছে। এইসব এলাকায় রজনীগন্ধা, গাঁদা, জারবেরা, কেলোনজরা, চন্দ্রমলি¬কা, লাল ও সাদা গোলাপ, ভুট্টা ফুল, বেলি, কামিনী, সূর্যমুখী, ডায়মন্ড, রতপুসুটি, টুনটুনি, জিপসি, স্টারকলি, ডালিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষ করা হইয়া থাকে। ইহাছাড়া কিছু অর্কিডও চাষ হইয়া থাকে। সাভারে ব্যাপকভাবে গোলাপের চাষ হইয়া থাকে। বিবাহ-জন্মদিন, সভা, শ্রদ্ধাঞ্জলি ইত্যাদি আনুষ্ঠানিকতায় ফুল ব্যবহূত হইয়া থাকে। তবে জাতীয় দিবস ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলিতে ফুলের ব্যবহার বাড়িয়া যায়। শহরাঞ্চলের নাগরিকদের মাঝে ফুলের ব্যবহার দিনদিন বাড়িতেছে। অন্যদিকে ভারত, চীন ও মিয়ানমারের ন্যায় বাংলাদেশেও এলাচ চাষ শুরু হইয়াছে। খুব সম্প্রতি বেনাপোলে বাণিজ্যিকভাবে এই মসলাটির চাষ শুরু করিয়াছেন এক কৃষক। এইভাবে অপ্রচলিত কৃষির নানান দিগন্ত উন্মোচিত হইতেছে এবং বাংলাদেশের কৃষি খাত আগাইয়া যাইতেছে।
তবে এই নূতন কৃষিক্ষেত্রগুলিকে সরকারিভাবে যত্ন নিবার প্রয়োজন রহিয়াছে। এইসব ক্ষেত্রে সহজ শর্তে কৃষিঋণের বিষয়টি অগ্রাধিকারভাবে সব অঞ্চলের জন্য নিশ্চিত করিতে হইবে। ফুলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কখনো কখনো ফুলের দাম পড়িয়া যায়, ফলে ফুলচাষীরা ভিন্ন একটি কৃষিকাজ পাশাপাশি চালাইয়া যান। এই বিষয়গুলি কিভাবে নিষ্পত্তি করা যায়, তাহাও ভাবা যাইতে পারে। মোটের উপরে নিয়মিত কৃষি খাতের পাশাপাশি অপ্রচলিত কৃষির বিকাশ যাহাতে সম্ভব হয় তাহার পরিবেশ তৈরি করিতে হইবে। কারণ নূতন নূতন কৃষিখাত কেবল কৃষি অর্থনীতিকে সবল করে না, নূতন কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি করে। নূতন কৃষিখাতে নারীর অংশগ্রহণ কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, সেইদিকেও দৃষ্টি দিবার প্রয়োজন রহিয়াছে।
