[ রা জ নী তি ]

প্রধানমন্ত্রী তার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব থেকে সরে এলেন কি?

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৩, ২০:৫৩
গত ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদ নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনে এক ‘বাকযুদ্ধে’ অবতীর্ণ হন। তাদের ‘বাকযুদ্ধে’ অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে আগামী সংসদ নির্বাচকালীন সরকার পদ্ধতিটিও উঠে আসে। সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে খালেদা জিয়া আবারো ঘোষণা দেন বিএনপি কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। তিনি আরো বলেন, দেশের মানুষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। কিন্তু সরকার সেই পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। এই সংকট থাকা অবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বিরোধী দলের নির্দলীয় সরকারের দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন, কোনো অসাংবিধানিক সরকার নয়, সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনেই দেশে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আরো বলেন, পৃথিবীর অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে যেভাবে সংসদ নির্বাচন হয়, বাংলাদেশে আগামী সংসদ নির্বাচনও সেভাবেই হবে। জাতীয় সমস্যা সমাধানে আশার স্থল জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রধানদের উপর্যুক্ত বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে চলমান সংকট নিরসনের কোনো সম্ভাবনা এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের এই বিপরীতমুখী অবস্থানে নিরাশ হয়ে অন্যান্য দলের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ অনেকে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ অত্যন্ত বিপন্ন ও হুমকির মুখে। এখন দেখা যাক সংবিধানে সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে কি বলা আছে। সংবিধানে সর্বশেষ সংশোধনী আনা হয় বর্তমান সরকারের আমলে। ‘পঞ্চদশ সংশোধনী’ নামে বহুল আলোচিত এই সংশোধনীতে সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থাসহ নির্বাচনকালে সংসদ সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত সংবিধানে বলা হয়েছে, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী নব্বইদিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী নব্বইদিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে [অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)]। এদিকে সংবিধানের ৭২(৩) অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভেঙে না দিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে পাঁচ বছর অতিবাহিত হলে সংসদ ভেঙে যাবে। সে মোতাবেক বর্তমান সংসদের মেয়াদকাল আগামী ২৪ জানুয়ারি। এ তারিখের পূর্বে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ নিজ পদে বহাল থেকে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন, এবং তা হবে বিশ্বে সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। উল্লেখ্য, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর অব্যবহিত পূর্বে বিধান ছিল যে, মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী নব্বইদিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তা হলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিলুপ্তি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধাক সরকার গঠনের দাবিতে পঞ্চম সংসদ মেয়াদে বিএনপি সরকারের আমলে তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি এ আন্দোলনে যোগ দেয়। এ আন্দোলনের মুখে বিরোধী দল বর্জিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রতিষ্ঠা চলমান রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। এখন যে প্রশ্নটি উঠতে পারে তা হলো, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব থেকে সরে এলেন কি? নির্দলীয় সরকার পদ্ধতি বাতিলের ফলে সৃষ্ট সংকট নিরসনের উপায় হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালের ৩০ জুলাই লন্ডনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে নির্বাচনকালে বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভায় বিএনপিও অংশগ্রহণ করতে পারবে। নির্বাচনের সময় সরকার গঠনে বিরোধী দল যদি অংশীদারিত্ব চায় সেটা দিতে পারি। সবাই মিলে আমরা নির্বাচন করতে পারি। একটা ছোট মন্ত্রিসভা করে ইলেকশন করতে পারি।’ এজন্য সংসদে এসে প্রস্তাব দেয়ার জন্য তিনি বিএনপিকে অনুরোধ জানান।এরপর আওয়ামী লীগ মন্ত্রী ও নেতারা এ প্রস্তাবটি গ্রহণের জন্য বিএনপিকে অনুরোধ জানাতে থাকেন। বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবটিকে সুশীল সমাজ, আইনবিদসহ অনেকে ইতিবাচক মনে করেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক (যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হতে অনাপত্তি জানিয়েছিলেন এবং যার ওই পদে আসীনে বিএনপির সমর্থন ছিল) প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে যুক্তিযুক্ত বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং বিএনপির পক্ষ হতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা আসা উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন। বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের ওপর সরাসরি মতামত না দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা সম্পর্কে একটি প্রস্তাব দিতে এবং সেটি নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা নিতে সরকারকে অনুরোধ জানায়। গত মে মাসে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর বাংলাদেশ সফরকালে এরকম আলোচনার অনুকূল পরিবেশও সৃষ্টি হয়েছিল। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে তারানকো গত মে মাসের মাঝামাঝি চারদিন বাংলাদেশ সফর করেন। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। এছাড়া তিনি স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি প্রমুখের সঙ্গে সাক্ষাত্ ও আলোচনা করেন। আলোচনার ফলশ্রুতিতে সংলাপে বসতে রাজি হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে বিরোধী দলকে চিঠি দিতেও রাজি হয় সরকার। তারানকো চলে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের সংসদ সচিবালয়ে জমা দেয়া মুলতবি প্রস্তাবটি দলীয় প্রধানের নির্দেশে প্রত্যাহার করা হলে সরকার অসন্তুষ্ট হয়। ৭ জুন রাজধানীতে এক আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে আলোচনার আর কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধানে আলোচনার দরজা খোলা রাখতেই হবে। বিরোধী দলের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের যে প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন তা থেকে তার সরে যাওয়া উচিত হবে না। এ প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে মূল সমস্যা হলো কে হবেন অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান। ১৯৯৪ সালে তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দেয়া প্রস্তাবটি মূলত এ কারণেই সফলতার মুখ দেখেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তা স্মরণে রাখতে হবে এবং দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সাময়িকভাবে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। তিনি প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হবেন না—- এ মর্মে একটি ঘোষণা দিতে পারেন। অতঃপর নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য সরকার বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানাতে পারে। বিরোধী দল বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই সংসদে উপস্থিত থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা সংসদে অথবা সংসদের বাইরে হতে পারে। আলোচনার স্থান নিয়ে কোনো পক্ষেরই অনড় অবস্থান নেয়া সমীচীন হবে না। বিএনপি যদি আলোচনায় না আসে তার দায়-দায়িত্ব বিএনপিকেই বহন করতে হবে। এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সুনাম বাড়াবে বৈ কমাবে না। সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকার এবং বিরোধী দলকে প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। জাতীয় সংকট নিরসনে সমঝোতায় উপনীত হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে আমাদের নিকট অতীত ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলে দেবে ঘটনা কোনদিকে মোড় নিতে পারে। লেখক :সাবেক সচিব E-mail:[email protected]